যুক্তরাষ্ট্রে দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশনের পরও বেঁচে গেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী

| শুক্রবার , ২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য প্রাণঘাতী বিষাক্ত ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল তার শরীরে। একবার নয়, পরপর দুই বার। তারপরও মৃত্যু হল না ৫০ বছর বয়সী নারী কয়েদি ক্রিস্টা পাইকের। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি রাজ্যে গত বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে ন্যাশভিলের ‘রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন’–এ এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পাইককে ‘পেন্টোবারবিটল’ নামের দুটি রাসায়নিক ইনজেকশন দেওয়ার পরও তার মৃত্যু হয়নি। পরে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পাইকের আইনজীবীরা মৃত্যুদণ্ড রদ করার জন্য জরুরি পিটিশন দাখিল করে জানিয়েছিলেন, ‘পাইক জ্ঞান হারিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার হৃৎস্পন্দন চলছে এবং তিনি সশব্দে নাক ডাকছেন।’ এরপরই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। টেনেসির গত ২০০ বছরের ইতিহাসে এটিই ছিল কোনও নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম উদ্যোগ। পাইকের আইনজীবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ডিস্ট্রিক্ট জাজ ক্লাইফটন এল কর্কার অবিলম্বে তাকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

পরে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে পাইকের আইনজীবীরা জানান, বর্তমানে হাসপাতালে তাকে জীবনরক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে পিটিয়ে ও নির্যাতন করে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন ক্রিস্টা পাইক। খবর বিডিনিউজের।

কারাকক্ষে বিশৃঙ্খলা ও তদন্তের নির্দেশ : বিবিসি জানায়, ইনজেকশন প্রয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি চরম বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়। পেন্টোবার্বিটালের দুটি ডোজ প্রয়োগের পরও ৪০ মিনিটের বেশি সময় ধরে পাইক স্পষ্ট নাক ডাকছিলেন। ইনজেকশন চলার একপর্যায়ে তিনি কারারক্ষীদের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, ইনজেকশন দিলে কি এমনই লাগে? এরপরই প্রত্যক্ষদর্শীদের কক্ষের পর্দা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সাংবাদিকদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়।

টেনেসির নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম দফায় বিষাক্ত ইনজেকশনে মৃত্যু না হলে দ্বিতীয় সেট ইনজেকশন প্রয়োগের নির্দেশ রয়েছে। তবে দ্বিতীয় দফার পরও বন্দি জীবিত থাকলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নিয়ম নেই। ঘটনার পর মার্কিন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে টেনেসির গভর্নর বিল লি জানান, এই ঘটনায় কী ঘটেছে তা খতিয়ে দেখতে তিনি এক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে চলতি বছর টেনেসিতে নির্ধারিত সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন তিনি।

চিকিৎসকদের শঙ্কা ও আইনি নাটকীয়তা : পাইকের আইনি দলের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ড. জোয়েল জিভোট জানান, পাইকের রক্তে পেন্টোবার্বিটালের প্রয়োজনীয় মাত্রা না পৌঁছানোয় তার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ (অ্যাপনিয়া) বা হৃদযন্ত্র বিকল (কার্ডিওভাসকুলার ফেইলিওর) হয়নি। তবে পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়া শুরু হতে দেরি থাকায় তার মস্তিষ্ক স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

এর আগে বুধবার গভীর রাতে সুপ্রিম কোর্ট আপিল আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশ তুলে নিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেয়। তবে সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারক সোনিয়া সোতোমায়র, এলেনা কাগান ও কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন এই আদেশের বিরোধিতা করেন। বিচারক সোতোমায়র বলেন, আদালতের এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত পাইকের আইনি যুক্তির সুষ্ঠু বিবেচনার পথ অহেতুক রুদ্ধ করেছে।

আইনজীবীরা জানান, ছোটবেলায় তীব্র যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে ১৯৯৬ সালে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এতদিন রাজ্য সরকার এই অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ দাবি করে এলেও সামপ্রতিক শুনানিতে তারা সত্যতা মেনে নেয়। কিন্তু গভর্নর লি চলতি সপ্তাহে পাইকের প্রাণভিক্ষার আবেদন খারিজ করে দেন।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঠিক আগে নিজের আত্মিক উপদেষ্টাকে কবি এডগার অ্যালান পোর একটি কবিতার হাতে লেখা লাইন পাঠিয়েছিলেন পাইক। আর এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, আমি মরতে ভয় পাই না, কেবল পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত (নার্ভাস)। এছাড়া তার প্রাণভিক্ষার আবেদনে লেখা ছিল, তখন আমি মানসিক ভারসাম্যহীন ১৮ বছরের এক কিশোরী ছিলাম। আমি স্লেমারকে কেবল মারধর করতে চেয়েছিলাম, খুন করতে নয়; কিন্তু আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারিনি। আমি যে কত বড় অপরাধ করেছি, তা অনুধাবন করতে আমার বহু বছর লেগেছে।

জাতিসংঘের ক্ষোভ ও ৩০ বছর আগের সেই হত্যাকাণ্ড : পাইকের সাজা মওকুফের জন্য সমপ্রতি জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও আহ্বান জানিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মগত মস্তিষ্কের ক্ষতি, পিটিএসডি ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভোগা পাইককে দীর্ঘ তিন দশক ডেথ রো–তে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা এক ধরনের বেআইনি নির্যাতন।

১৯৯৫ সালে সমস্যাগ্রস্ত তরুণদের এক প্রশিক্ষণ শিবিরে কলিন স্লেমারের সঙ্গে পরিচয় হয় তৎকালীন ১৮ বছর বয়সী ক্রিস্টা পাইকের। প্রেমঘটিত বিরোধ ও অপমানের জেরে পাইক ও তার প্রেমিক তাদারিল শিপ মিলে টেনেসির নঙভিলে স্লেমারকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। স্লেমায়ারের বুকে একটি উল্টো ‘পেন্টাগ্রাম’ (শয়তান উপাসকদের প্রতীক) খোদাই করা পাওয়া যায়। শিবিরের অন্য বাসিন্দারা আদালতে জানান, পাইক হত্যার আগে ও পরে এটি নিয়ে বড়াই করেছিলেন এবং স্লেমারের মাথার খুলির একটি টুকরো তাদের দেখিয়েছিলেন।

বিচারে পাইকের প্রেমিকের বয়স ১৭ বছর থাকায় সেসময় তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পান, তবে ২০ বছর বয়সে সাজা পাওয়া পাইক হয়ে যান মার্কিন ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদি।

বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নারী বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ১৯৭৬ সালে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে ১,৬৬৩ জন পুরুষের বিপরীতে মাত্র ১৮ জন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট মৃত্যুদণ্ডের মাত্র ১ শতাংশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইরানের আশপাশে তিনটি রণতরী ও ২ উভচর সেনাদল পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
পরবর্তী নিবন্ধকর্ণফুলীতে দক্ষিণ জেলা বিএনপি দলীয় এমপিদের সমাবেশ