ফ্যামিলি কার্ড : সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার

ড. নারায়ন বৈদ্য | বুধবার , ১৩ মে, ২০২৬ at ৭:৪৪ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের দরিদ্র সমাজ ব্যবস্থায় মাথাপিছু জাতীয় আয়ের পরিমাণ স্বল্প। এদেশের সমাজ ব্যবস্থায় একটি পরিবারের প্রধান (পুরুষ) এর হাতে থাকে আয়ের আলোকবর্তিকা। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় খুব অল্প পরিমাণ পরিবারের মহিলা বা স্ত্রী আয়ের সাথে জড়িত। এর বহুবিধ কারণ থাকতে পারে। প্রধানত পর্দানশীন সমাজ ব্যবস্থায় মহিলারা বিভিন্ন কারণে ঘরের বাহির হতে চায় না। তাছাড়া পরিবার প্রধান স্বামী বা ঘনিষ্ঠ আপনজন এতে রাজি হয় না। এদের প্রধান যুক্তি হচ্ছে, আগত প্রজন্ম ডটকমকে দেখাশোনা করা, খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিবারে নিয়োজিত থাকা, অথবা অন্যান্য আরো কারণ থাকতে পারে। এ অববস্থায় হিসাবের সুবিধার্থে বাংলাদেশে যদি পঞ্চাশ শতাংশ নারী মনে করা হয় তবে আঠার কোটি জনসংখ্যার মধ্যে বলা যায় আট কোটি হচ্ছে নারী আর আট কোটি জনসংখ্যা হচ্ছে পুরুষ। আবার পুরুষদের মধ্যে কর্মক্ষম নয় ও কর্মে নিয়োজিত নয় (বেকার) এমন পুরুষের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তাহলে অনুমান করে বলা যায়, প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি লোক বা ছয় কোটি লোক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থেকে আঠার কোটি লোককে খাওয়াচ্ছে। যদিও দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট নারী জনসংখ্যার মাত্র তিন শতাংশ কর্মে নিয়োজিত। অতএব বলা যায়, প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত না করে শুধুমাত্র সাড়ে পাঁচ কোটি বা ছয় কোটি লোক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থেকে এদেশের ভাগ্য পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।

একটি পরিবারের আর্থিক শক্তি হচ্ছে সবচেয়ে বড় শক্তি। গবেষণায় দেখা যায়, পরিবারের আর্থিক শক্তি যদি ঐ পরিবারের পুরুষের হাতে থাকে তবে যে কোন সিদ্ধান্ত দেয়ায় ক্ষমতা থাকে ঐ পরিবারের উক্ত পুরুষের। তাছাড়া ঐ সিদ্ধান্ত পরিবারের সবাই মেনে নেয়। আর যদি পরিবারের আর্থিক শক্তি উক্ত পরিবারের মহিলার হাতে থাকে তবে ঐ পরিবারের সকল সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা থাকে উক্ত মহিলার ওপর। এই সিদ্ধান্তও পরিবারের সবাই মেনে নেয়। সামাজিক জীবন ব্যবস্থায় আর্থিক শক্তি হচ্ছে এরূপ ক্ষমতাবান। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় বিগত দশক থেকে নারীর ক্ষমতায়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এই দেশে মায়ের হাত সবচেয়ে বেশি কাজ করে। কিন্তু সবচেয়ে কম স্বীকৃতি পায়। সূর্য উঠার আগে ভোরের আঁধারে যে হাত রান্না করে, সন্তানকে স্কুলে পাঠায়, সংসারের হিসাব মেলায়সেই হাতেই থাকে পরিবারের আসল ভার। পরিবার প্রধান কর্তৃক প্রদত্ত অর্থ ব্যয় করে মাসের শেষে যখন হাত ফাঁকা হয়ে আসে, যখন বাজারের থলে আর ভরে না, যখন সন্তানের বেতন দেয়ার জন্য হাতে কোনো টাকা থাকে নাতখন সেই মা একা একা হিসাব মেলাতে বসেন। আর এ সময়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়তো জন্ম নিয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে বর্তমান সরকার এই কর্মসূচি চালু করে। নির্বাচনের আগে দেয়া কর্মসূচি এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি এবং তা বাস্তবে রূপদানের মাঝখানে থাকে একটা দীর্ঘ পথ। সেই পথ মসৃণ নয়। এই দীর্ঘ পথে থাকে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা। থাকে অনেক অসাধু লোকের হাতের স্পর্শ।

ফ্যামিলি কার্ড একটি ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড। এই কার্ড পাবে পরিবারের নারীরা। ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড শব্দটির ভেতর লুকিয়ে আছে একটি বড় স্বপ্ন। প্রতিমাসে আড়াই হাজার টাকা সরাসরি পৌছে যাবে নারী প্রধানের হাতে। কোনো দফতরে ঘুরতে হবে না। কোনো দালালের পিছনে দৌড়াতে হবে না। সঙ্গে পাওয়া যাবে কম দামে চাল, ডাল, তেল, চিনি। ভূমিহীন মানুষ, গৃহহীন পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্যের সংসার, বেদে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষ প্রত্যেকে পাবে ফ্যামিলি কার্ড। যারা সমাজে দরিদ্র পীড়িত, যাদের দিনের বেলায় খাবার গ্রহণ করলেও রাত্রে খাবারের নিশ্চয়তা নেই, যেসব দরিদ্র জনগোষ্ঠী যারা এদেশের বৃহত্তর সমাজে খাদ্যের জোগানদার অথচ চির দরিদ্রতাদেরকে প্রথমে এ ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। গ্রাম বাংলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড হচ্ছে এক বিশাল আশার আলো। হয়তো আড়াই হাজার টাকা তাদের সংসারে আর্থিক সচ্ছলতাকে ফিরিয়ে আনবে না। তবুও এ কথা সত্য যে, চৈত্রের খাঁখাঁ রোদে ফেটে যাওয়া চৌচির মাটির মধ্যে এক বালতি পানিসেই তো অনেক কিছু। যাদের জীবন ব্যবস্থায়, খাদ্যের অনিশ্চয়তায়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন চোখ ঝলসানো রুটি, তাদের নিকট আড়াই হাজার টাকা সেই চাঁদের চোখ ঝলসানো রুটি।

এই ফ্যামিলি কার্ড একসাথে সমগ্র বাংলাদেশে চালু করা হবে না। তা সম্ভবও নয়। কারণ এ কার্ডের ধনাত্মক দিকগুলোকে খুবই সচেতনভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ঋণাত্মক দিকগুলোকে যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। এ কারণে প্রথম অবস্থায় চৌষটি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প দিয়ে শুরু করা হয়েছে। একটি প্রকল্পের শুরুতে অনেকগুলো ধনাত্মক দিক যেমন থাকে তেমনি ঋণাত্মক দিকও থাকে। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ঋণাত্মক দিকগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো পরিহার করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বহু ধরনের অভিজ্ঞতা আছে। দুর্নীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, একশত টাকার পণ্যকে দশ হাজার টাকা দেখাতেও দ্বিধাবোধ করেনি। এ কারণে বলা যায়, এদেশের মানুষ অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি দেখেছে। আবার সুন্দর ছবি ক্রমাগত ধূসর হয়ে যেতেও দেখেছে। সুতরাং এ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যেসব সমস্যাগুলো ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে সামনে আসতে পারে সেগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা যেতে পারে। ফ্যামিলি কার্ড কারা পাবে আর কারা পাবে না অর্থাৎ তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সজাগ থাকতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড কারা পাবে কারা পাবে না তা নির্ধারণ করে একটি পরিপূর্ণ তালিকা তৈরি করতে হবে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা যখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালিকা তৈরি করবেন তখন তাদেরকে রাজনীতির উর্ধ্বে থাকা বাঞ্চনীয়। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায়, সরকারি সুবিধার তালিকায় গণমানুষের চেয়ে নিজের মানুষের নাম যদি বেশি উঠে তবে তা হবে প্রশ্নবিদ্ধ। এই পুরোনো রোগ সারাতে না পারলে ফ্যামিলি কার্ড হবে ‘ফিশারম্যান কার্ড’ এর ন্যায়। সামাজিক সুরক্ষার হাতিয়ার হতে পারবে না।

ফ্যামিলি কার্ডে প্রতিটি পরিবার পাবে আড়াই হাজার টাকা। শহর বা গ্রামে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে এ আড়াই হাজার টাকা তেমন বেশি নয়। একটি সংসারে সর্বোচ্চ পাঁচ দিন চলবে। এক সপ্তাহও ঠিকমতো চলবে না। তবে এই সহায়তাটুকু যে একেবারে নগণ্য তা কিন্তু নয়। জ্বলন্ত আগুনে এক মুষ্ঠি পানি তো পড়বে। কিন্তু যে মা রাত জেগে হিসাব মিলান, তার কষ্ট লাঘব করতে আস্তে আস্তে সহায়তার পরিমাণ বাড়াতে হবে। নয়তো এ সহায়তা হবে একটি প্রতীক মাত্র, সমাধান নয়।

অপর সমস্যাটি হতে পারে পণ্য বিতরণ নিয়ে। ফ্যামিলি কার্ডে বলা হয়েছে ভর্তুকিমূল্যে চাল, ডাল ও তেল পাওয়ার কথা। গভীর গন্ডগ্রামের সেই দরিদ্র পরিবারটি ভর্তুকিমূল্যে চাল, ডাল ও তেল পাওয়ার কথা শুনে গভীরভাবে আনন্দিত হয়। কিন্তু এদেশে ভর্তুকির পণ্য কতটুকু প্রকৃত মানুষের কাছে পৌঁছায় আর কতটুকু মাঝপথে হারিয়ে যায়এই অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে তিক্ত। ডিলারের গুদামে পণ্য থাকে, কিন্তু কার্ডধারী এলে বলা হয়শেষ হয়ে গেছে। এ গল্পের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শুধু নীতিমালা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে কঠোর নজরদারি। জবাবদিহিতা থাকতে হবে সবসময়।

আরো একটি বিষয় ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এসে যায়। প্রতিটি পরিবারকে টাকা পাঠানো হবে ডিজিটালের মাধ্যমে বা ব্যাংকের মাধ্যমে। প্রত্যন্ত গ্রামের যে মায়ের সারাজীবন মোবাইল ব্যাংকিং সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকে না তিনি কি সহজে এই সুবিধা পেতে পারবেন? নাকি কোনো চতুর মানুষের খপ্পরে পড়বেন। গ্রাম গঞ্চে এরূপ অনেক টাউট বা চতুর ব্যক্তির আছে যারা এ সুবিধা নিয়ে দেবে বলে কিছু টাকা হাতিয়ে নেয়। বিশেষ করে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এ ব্যাপারটি সমাধান করতে হবে।

প্রশ্নগুলো কঠিন, কিন্তু প্রাসঙ্গিক। কারণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের উপরেই নির্ভর করছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। পাইলট প্রকল্পের চার মাস যদি সত্যিকার পরীক্ষা যাচাই হিসেবে নেয়া হয়, যদি কোথায় সমস্যা হচ্ছে তা সততার সঙ্গে চিহ্নিত করা হয় এবং যদি তা সংশোধনের জন্য গৃহীত হয় তবেই এই কর্মসূচি সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন আনতে পারবে। আর যদি সব ঠিকঠাক চলছে বলে দাবী করে সারাদেশে প্রকল্প চালু করা হয় তবে লক্ষ লক্ষ মায়ের হাতে পৌঁছাবে শুধু একটি কার্ডতার পিছনের প্রতিশ্রুতি নয়। এদেশের মায়েরা অনেক প্রতিশ্রুতি দেখেছেন।, অনেক প্রকারের স্বপ্নের জাল বুনেছেন। এখন তাঁরা চানশুধু সততা, নিষ্ঠা এবং বাস্তবতা। শুধু সেই ছোট্ট নিশ্চয়তাটুকু পেতে চান, যেখানে মাসের শেষে হাতটা আর একদম ফাঁকা থাকবে না। আর এটাই হবে সমাজ পরিবর্তনের একমাত্র হাতিয়ার।

লেখক : প্রাবন্ধিক; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ,

গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহি পানে
পরবর্তী নিবন্ধচাঁদ মামা বোকা