নদীর ধরন বিবেচনা করে খনন করলেই সফলতা আসবে

রেজাউল করিম স্বপন | মঙ্গলবার , ১২ মে, ২০২৬ at ৮:০১ পূর্বাহ্ণ

বেশ কয়েক বছর আগে মিসর গিয়েছিলাম। ইসলামিক ঐতিহ্যের দেশ মিসর মরুভূমি ব্যষ্টিত। শত শত কিলোমিটার মরুভূমি। সেই মরুভূমির বুক চিরে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে প্রবাহিত হয়েছে নীলনদ। যা বিশ্বের দীর্ঘতম নদী, দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৬৯৫ কিলোমিটার। এটি হোয়াইট নীল ও ব্লু নীলএই দুই প্রধান ধারার মিলনে সৃষ্ট হয়ে ১১টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা এই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে এবং একে মিশরের প্রাণ বলা হয়। এটি রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, কঙ্গো, উগান্ডা, তাঞ্জানিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া পার হয়ে মিশরে প্রবেশ করেছে এবং ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পতিত হয়েছে। এই নদের উর্বর পলি মাটির কারণে মিশরের মত মরুভূমিতে কৃষি ও সভ্যতা বিকাশ লাভ করেছে। এটি পানীয় জল, সেচ, পরিবহন এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস। এই নদীর সাথে যুক্ত করে মিসর হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন করেছে। যার ফলশ্রুতিতে কৃষি উৎপাদনে মিসর আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ, বিশেষ করে এই নদীর পানি ব্যবহারের ফলে যে ফল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়, তা রপ্তানি করে কোটি কোটি ডলার আয় করে। নীলনদের বিষয়টি অবতারণার উদ্দেশ্য হলো বর্তমান বিএনপি সরকার দীর্ঘদিন পর নতুন করে আবার দেশের খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি কৃষিজমিতে সেচসুবিধা বাড়াতে ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের অঙ্গীকার করেছিল। জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে। সরকারের তিন মন্ত্রণালয়ের চারটি সংস্থা প্রথম ধাপে ১,২০৪ কিলোমিটার খাল খনন করবে। এ কাজ করা হবে বিদ্যমান প্রকল্পের আওতায়। পাশাপাশি নতুন প্রকল্প নেওয়ার কাজ চলছে। দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলায় সাহাপাড়া খাল খননের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সময়ে দেশের ৫৪টি জেলায় এই কর্মসূচি শুরু হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী ও হাজার হাজার খালের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সেচব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে।

তবে দুঃখজনক বিষয় হলো দেশে মোট খালের সংখ্যা ও দৈর্ঘ্য কততার কোন হিসাব সরকারের কোন দপ্তরের কাছে নেই। কত খাল ভরাট হয়ে গেছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্রও নেই। তবে বিএডিসি গত ২৫ বছরে ১৪,৬২০ কিলোমিটার খাল খনন করেছে। এর মধ্যে ৯,৩৭০ কিলোমিটার খাল প্রায় ভরাট এবং পুরো ভরাট হয়ে গেছে। বাকি ৫,২৫০ কিলোমিটার সচল আছে। খাল খনন টেকসই করতে হলে খালের উৎস ও শেষ অংশের মধ্যে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং চারটি সংস্থা খাল খননের যে পরিকল্পনা নিয়েছে,তাতে দ্বৈততা পরিহার করতে হবে। জানা যায়, চলমান প্রকল্পের অধীন ৭,৪০২ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। নতুন প্রকল্প নিয়ে খনন করা হবে ১২,৫৯৮ কিলোমিটার খাল। খাল শুধু খননযন্ত্র বা এক্সক্যাভেটর দিয়ে নয়, স্থানীয় মানুষের মাধ্যমে খনন করতে হবে, যাতে কর্মসংস্থান বাড়ে। জানা যায়, খনন করা খালের দুই পাশে ফল গাছ রোপণ করা এবং খনন করা মাটি যাতে আবার খালে না পড়ে, তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের নির্দেশ রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, খাল খনন একটি টেকনিক্যাল (কারিগরি) বিষয়। এটার ডিজাইন (নকশা) দরকার। ডিজাইন করা ছাড়া করলে তা টেকসই হবে না। তাদের অভিমত, মূল বিষয়টা হচ্ছে এখানে অবজেক্টিভসটা (লক্ষ্য, উদ্দেশ্য) কী, সেটা ক্লিয়ার (পরিষ্কার) করা। খননই উদ্দেশ্য, নাকি উপায়। উপায় যদি হয়, তাহলে কী অর্জন করতে চাচ্ছি, সেটা পরিষ্কার করতে হবে। উদ্দেশ্যটা ঠিক করতে পারলে খনন, পুনঃখননটা কাজে আসবে। তবে অতীতে দেখা গেছে নদী কিংবা খাল খননের ক্ষেত্রে ন্যূনতম নদীবান্ধব কাজ করা হয়নি। কারা কীভাবে কাজ করবে ও কোন কোন ক্ষেত্রে খনন কল্যাণের বদলে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়এগুলো ভাবা উচিত।

আসলে নদী বা প্রাকৃতিক খাল কখনো অভিন্ন প্রস্থ বজায় রেখে চলে না। কোথাও সংকুচিত আবার কোথাও প্রশস্ত হয়। কিন্তু নদীখাল খননের প্রকল্প যখন গ্রহণ করা হয়, তখন সিএস, এসএ এবং বর্তমান অবস্থা আমলে নিয়ে সীমানা চিহ্নিত করা হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে নদীখাল ছোট করে খনন করা হয়, প্রকৃত প্রস্থ বিবেচনায় খনন করা হয় না। এতে খাল ও নদী প্রকৃত প্রস্থের চেয়ে অনেক সরু হয়। ফলে নদীর দখলদারেরা প্রশ্রয় পায়। তবে বর্তমানে সরকারিভাবে কোন কোন নদীখাল খনন করার প্রয়োজনীয়তা আছে তার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং এরই মধ্যে খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে তাহলো. নদীখাল খননের আগে সিএস রেকর্ড অনুযায়ী সীমানা চিহ্নিত করতে হবে। যদি কেউ নদীখালের জায়গা ব্যক্তি নামে রেকর্ড করেও থাকে, তবু সেই ব্যক্তির মালিকানা অবৈধ। কারণ নদীখালবিলজলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তনের আইনগত ভিত্তি কারো নেই। এসব সম্পত্তির মালিক যেহেতু জনগণ, তাই এগুলো কোনো ব্যক্তির নামে দান কিংবা অন্য কোনো সূত্রে ব্যক্তিকে দেওয়া যায় না। যদি কোনো প্রবাহ রেকর্ড না হয়ে থাকে, জলপ্রবাহ হলে কেউ ব্যক্তিগত হিসেবে দাবি করতে পারবে না। এক্ষেত্রে দিয়ারা জরিপের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক এসব প্রবাহকে নদী ঘোষণা করতে পারেন। ২. খননকৃত মাটি অবশ্যই নদীর পাড়ে ফেলা যাবে না। নদীখালের পাড়ে খননকৃত মাটি ফেললে প্রাকৃতিক রূপ থাকে না। বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে না। খনন প্রকল্প গ্রহণ করার সময় খননকৃত মাটি ব্যবস্থাপনা কী হবে তা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. নদীকে কখনো খাল হিসেবে উল্লেখ করা যাবে না। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদীর একটি সংজ্ঞা দিয়েছে। যে প্রবাহগুলো সংজ্ঞা অনুযায়ী নদী হিসেবে বিবেচিত, সেগুলোকে নদী হিসেবেই উল্লেখ করতে হবে। অতীতে যেসব নদীকে খাল নাম দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর নাম পরিবর্তন করতে হবে। ৪. নদী খননে অধিকাংশ সময়ে এক্সক্যাভেটর দিয়ে একবার মাটি তুলে এক পাশে ফেলা হয়, আরেকবার মাটি তুলে অপর পাশে ফেলা হয়। সিঙ্গেল শিফটিংয়ের মাধ্যমে নদীখাল খননের প্রবণতা বেশি। নদীখাল খননে শিফটিংকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রস্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। ৫. নদীখাল খননে স্থানীয় ও উপজেলাজেলাবিভাগ ভিত্তিক সমন্বয় কমিটি করতে হবে। ৬. যেসব নদীখালের উৎসমুখ বন্ধ করা হয়েছে, সেগুলো উন্মুক্ত করতে হবে। ৭. অতি জরুরি ভিত্তিতে কাপ্তাই লেক খননের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কাপ্তাই লেক ভরাট হয়ে গেলে পার্বত্য এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হবে, জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে ও কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবে। ৮. জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীখাল খননের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে,যাতে প্রতিষ্ঠানটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে।

এরপরও নদীর ধরন বিবেচনায় বাস্তবসম্মতভাবে যেন নদীখাল খনন হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। কত হাজার কিলোমিটার নদীখাল খনন করা হয়েছে, তা বিবেচ্য বিষয় নয়। কৃষি তথা জীববৈচিত্র্য যাতে সুরক্ষা পায়, খননের উদ্দেশ্য যাতে সফল হয়, সেব কথাও ভাবতে হবে। আর তখনই খাল খনন কর্মসূচির সফলতা জনগণের দোড় গোড়ায় পৌঁছে যাবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহতাশা নয়, এগিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার ইচ্ছেশক্তি
পরবর্তী নিবন্ধশিশু যখন অমনোযোগী ও ডানপিটে