হতাশা নয়, এগিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার ইচ্ছেশক্তি

রিনিক মুন | মঙ্গলবার , ১২ মে, ২০২৬ at ৮:০০ পূর্বাহ্ণ

ইদানীং আমাদের চারপাশের বাতাসে একটা শব্দ খুব বেশি প্রতিধ্বনি হয়– ‘ডিপ্রেশন। শব্দটা এখন আর কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো গূঢ় বিষয় নয়, বরং আধুনিকতার এক বিষাক্ত অলঙ্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা খুব সহজে শব্দটাকে আপন করে নিয়েছি। কারো সাথে একটু মন কষাকষি হলোডিপ্রেশন; ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়ে পিছিয়ে পড়লামডিপ্রেশন; এমনকি প্রিয় কোনো স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেলআমরা সাথে সাথে তকমা লাগিয়ে দিই, ‘আসলে আমি ডিপ্রেশনে ভুগছি।’ বিষণ্নতা বা হতাশা মানুষের চিরন্তন সঙ্গী হলেও, এই আধুনিক যুগে ডিপ্রেশন যেন একটা ‘ফ্যাশন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা নিজেদের একাকীত্বের মোড়কে এমনভাবে বন্দি করে ফেলছি যে, ভুলেই গেছি আমাদের ভেতরেই এক অজেয় জাদুমন্ত্র লুকিয়ে আছে, যার নাম ইচ্ছেশক্তি।

আসলে জীবনটা কোনো সমান্তরাল সুতোয় গাঁথা মালা নয়। এখানে গিঁট থাকবেই, সুতো ছিঁড়ে যাবে বারবার। আমরা যখন সেই ছেঁড়া সুতো নিয়ে হাপিত্যেশ করি, তখন আমাদের চারপাশে অন্ধকারের দেয়ালটা আরও উঁচু হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু একবার বুকটা হাতড়ে দেখুন তো, আমরা কি আসলেই লড়াই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি? নাকি আমরা স্রেফ হাল ছেড়ে দেওয়াটাকে একটা আর্ট হিসেবে গ্রহণ করছি? আমরা আসলে হতাশার মেঘ দেখে ভয় পাই, কিন্তু ভুলে যাই যে সেই মেঘের ওপারেই সূর্যটা অমলিন থাকে। আমাদের আজকের এই ‘ডিপ্রেশন’ আক্রান্ত প্রজন্মের বড় অভাব হলো সেই আদিম জেদটার, যা দিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা হিংস্র বন্য জন্তুর সাথে লড়াই করে টিকে ছিল। ​আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার নীল আলোয় আমরা অন্যের সাজানো জীবনের স্ক্রিনশট দেখি আর নিজের বাস্তবতাকে তুচ্ছ মনে করি। এই যে অন্যের জীবনের সাথে নিজের অদৃশ্য তুলনাএটাই আমাদের বড় আধুনিক অসুখ। কারো বিদেশ ভ্রমণের ছবি দেখে আমাদের বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে, অথচ নিজের বারান্দায় ফুটে থাকা ছোট্ট বেলী ফুলটার দিকে তাকিয়ে হাসতে ভুলে যাই। এই যে কৃত্রিমতা, এই যে নাপাওয়ার তীব্র অতৃপ্তি, এটাই আমাদের হতাশার চোরাবালিতে ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু একবার ভাবুন তো, ওই যে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালকটি কিংবা রোদে পুড়ে ঘাম ঝরানো নির্মাণ শ্রমিকটি তাদের কি ডিপ্রেশনে ভোগার অবসর আছে? তাদের কাছে জীবন মানেই হলো একটা সংগ্রাম, আর সেই সংগ্রামের জ্বালানি হলো আগামীকালের বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছে। আমাদের অনেক কিছু আছে বলেই বোধহয় আমাদের নাপাওয়ার বেদনাটা এত বেশি তীব্র। ​ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা যখন আমাদের মনের দরজায় কড়া নাড়ে, আমরা তখন দরজাটা হাট করে খুলে দিই। তাকে যত্ন করে বসিয়ে রাখি আমাদের চিন্তার ড্রয়িংরুমে। কিন্তু ইচ্ছেশক্তি হলো সেই প্রহরী, যাকে সজাগ রাখলে কোনো অন্ধকারই আপনার ব্যক্তিত্বকে গ্রাস করতে পারবে না। আমি এমন অনেক মানুষকে জানি, যারা জীবন থেকে সব হারিয়েও কেবল মনের জোরে আবার শূন্য থেকে শুরু করেছেন। তাদের কি মন খারাপ হয় না? নিশ্চয়ই হয়। কিন্তু তারা মন খারাপটাকে বসতভিটা বানাতে দেন না। তারা জানেন, দুঃখ একটা ঋতুর মতো, যা আসবে এবং যাবে। আপনি যদি শীতের ভয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে পড়ে থাকেন, তবে কোনোদিন বসন্তের দেখা পাবেন না। এগিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার পিঠ থাপড়ে দেওয়ার মতো কোনো মানুষের প্রয়োজন নেই; আপনার প্রয়োজন নিজের ভেতরের সেই অবাধ্য সত্তাটাকে জাগিয়ে তোলা, যে সব হারানো শেষ হওয়ার পরও ফিসফিস করে বলে উঠবে– ‘খেলা এখনো বাকি আছে বন্ধু।’

এই যান্ত্রিক সভ্যতায় আমরা সম্পর্কের মায়ামমতাগুলোকেও কেন জানি ডিজিটাল করে ফেলেছি। এখন প্রিয় মানুষের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদার চেয়ে ইমোজিতে চোখের জল পাঠানো অনেক বেশি সহজ। এই যে নৈকট্যের অভাব, এই যে মায়ার টান কমে যাওয়াএটাই আমাদের একা করে দিচ্ছে। আর এই একাকীত্ব থেকেই জন্ম নেয় গভীর হতাশা। কিন্তু বিশ্বাস করুন, পৃথিবীটা এখনো পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি। এখনো বৃষ্টির দিনে মাটির সোঁদা গন্ধ বুক ভরে নেওয়া যায়, এখনো কোনো অচেনা শিশুর হাসিতে মন ভালো হয়ে যেতে পারে। আমাদের দরকার শুধু সেই ইচ্ছেটুকু, যা দিয়ে আমরা এই ছোট ছোট আনন্দগুলোকে কুড়িয়ে নেব। আমরা বড় বড় সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে জীবনের ছোট ছোট রঙিন মুহূর্তগুলোকে মাড়িয়ে চলে যাই। দিনশেষে সেই ছোট অপূর্ণতাগুলোই যখন পাহাড় সমান হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা তাকে নাম দিই ডিপ্রেশন।

আপনি কি জানেন আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি কোনটি? সেটি হলো আপনার ভেঙে পড়ার পরও আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। একটা চারাগাছ যখন পাথরের বুক চিরে উপরে উঠে আসে, তখন কি সে ভাবে যে পাথরটা কত শক্ত? না, সে শুধু তার নিজের বাড়ন্ত ইচ্ছেটুকুকে বিশ্বাস করে। আমাদের জীবনটাও তেমনি। আমাদের সামনে হাজারো বাধা আসবে, হাজারো লোক আপনার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। কিন্তু আপনি যদি নিজের ইচ্ছেশক্তির হাতটা শক্ত করে ধরতে পারেন, তবে পুরো মহাবিশ্ব আপনাকে পথ করে দিতে বাধ্য। ডিপ্রেশন আপনাকে স্থবির করে দেয়, আর ইচ্ছেশক্তি আপনাকে গতিময় করে। স্থবিরতা মানেই মৃত্যু, আর গতিশীলতাই হলো জীবনের নামান্তর।

মাঝে মাঝে নিজের সাথে কথা বলুন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সেই মানুষটাকে দেখুন যাকে আপনি বছরের পর বছর অবহেলা করেছেন। তাকে বলুন– ‘আমি জানি তুমি ক্লান্ত, আমি জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু আমি তোমাকে হারতে দেব না।এই মায়া, নিজের প্রতি এই মমতাটুকু যেদিন আপনি অনুভব করবেন, সেদিন থেকে হতাশার বিষ আপনার মনে কাজ করবে না। ডিপ্রেশনকে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে লালন করা বন্ধ করুন। একে জয় করার জন্য কোনো ওষুধের দোকানে যাওয়ার দরকার নেই, বরং আপনার ভেতরের সেই ঘুমিয়ে থাকা জেদটাকে একটু নাড়া দিন।

জীবনটা স্রেফ কয়েকটা বছরের সমষ্টি নয়, এটা হলো অনুভূতির এক বিশাল ক্যানভাস। সেখানে কালোর পাশাপাশি লাল, নীল, সবুজ সব রঙই থাকবে। কালো রঙটা আছে বলেই অন্য রঙগুলো এত উজ্জ্বল দেখায়। আপনার জীবনের এই কঠিন সময়টাকে সেই কালো রঙের আঁচড় হিসেবে মেনে নিন, যা আপনার আগামীর সোনালী দিনগুলোকে আরও বেশি অর্থবহ করে তুলবে। আমরা যারা স্বপ্ন দেখি, যারা ভালোবাসি, যারা এখনো মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখিআমাদের জন্য ডিপ্রেশন কোনো শেষ কথা হতে পারে না। আমাদের এগিয়ে যেতেই হবে। হয়তো পথটা খুব বন্ধুর, হয়তো পায়ে কাঁটা ফুটবে বারবার, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দ সেই সব কষ্টকে ভুলিয়ে দেবে।

একটা কথাই নিজের অন্তরের গভীর থেকে বলতে চাইজীবনটা আপনার নিজের অর্জিত সম্পদ, একে অন্যের কথায় বা পরিস্থিতির চাপে সস্তা হতে দেবেন না। ডিপ্রেশনকে কোনো অজুহাত বা ফ্যাশন হিসেবে গ্রহণ না করে, একে একটা লড়াই হিসেবে দেখুন। আপনার ইচ্ছেশক্তিই হোক আপনার জীবনের ধ্রুবতারা। যতক্ষণ আপনার হৃদয়ে একটা স্বপ্নের স্পন্দন বাকি আছে, ততক্ষণ আপনি অপরাজিত। আকাশের ওই অসীম নীলিমা যেমন সত্য, আপনার ভেতরের অজেয় শক্তিটাও তেমনি সত্য। হতাশার চাদর ছুড়ে ফেলে দিয়ে আজই একবার প্রাণভরে হাসুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কবি, শিক্ষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধছোটোবেলার বৈশাখীমেলা ও বলীখেলা
পরবর্তী নিবন্ধনদীর ধরন বিবেচনা করে খনন করলেই সফলতা আসবে