যে কষ্টের শেষ নেই। যারপর নেই চেষ্টা করে– আমরা ভাই–বোন এগার জনকে সুশিক্ষা দিয়ে মানুষ করেছেন। আমাদের সবার ছোট বোনের বয়স এখন চল্লিশের কোটায়। ছেলেবেলায় বাবাকে হারানোর ব্যথা বুঝতে না দেয়া ‘বড় ভাই’ সমপ্রতি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। যেদিন বাবা মারা গেলেন– তখন আমি ৯ বছরের কিশোর। যদ্দূর মনে পড়ে– সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি ছিল। কালো মেঘে ভরা– অঝোর বৃষ্টিতে টিনচালা ঘরে মনে হয়েছিল, আকাশ আমার বাবার জন্য কাঁদছিল। বাবাকে কবর দিয়ে আসার পর –মায়ের আঁচল ধরে আমরা সবাই বসেছিলাম। বাবা মারা যাওয়ার বত্রিশ বছর মায়ের ছায়ায়–গভীর মমতায় বড় হতে থাকি। আমার মায়ের শিক্ষা কোডগুলো –এখনো আমার জীবন চলার পাথেয়। মা বলতেন– ১. মানুষকে ভালোবাসতে শিখ ২. যে যতটুকুন পানিতে নামবে, ততটুকুন ভিজবে ৩. রাগ আসলে মাটির দিকে তাকাবে– ধৈর্য ধারণের সত্যবাণী ৪. বাল্যশিক্ষার প্রথমপাঠ ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। মায়ের তেমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও জ্ঞানগর্ভ কথাগুলো এখনো–কানে বাজে। কী এক অমর সত্য বাণীগুলো সুদূর প্রবাস জীবনেও এক্টিভলি কাজ করছে। কোন বছর মনে নেই। মা‘কে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে মায়ের চোখে–মুখে আকাশ ভেঙে পড়ার কালো ছায়া দেখতে পেলাম। তারপর অনেক্ষণ মায়ের চোখ গড়িয়ে নুনতা জল আমার মুখের ওপর। স্মৃতিচারণ ঐদিন আর হয়নি। কে যেন বাসায় ঢুকলো– চোখ মুছে, মা তাঁদের মেহমানদারীতে লেগে গেলেন। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। নাছোড় বান্দা। তার কদিন পর স্কুল থেকে ফেরার পর আবারও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ গল্প শুনতে মাকে আবদার করলাম। মা বললেন– তোরা দুজনকে আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছে। জিজ্ঞাস করলাম ‘দুজন কারা’। মা বললেন– কেশু আর তুই। তখন কমবেশি দুজন’ই ৩ বছরের শিশু। তোর বাবার অফিস কলিগ এক হিন্দু ভদ্রলোকের পরিবারকে আমরা আশ্রয় দিয়েছিলাম। সেদিন পাকবাহিনী চট্টগ্রাম শহরের নানা জায়গায় গোলাগুলি করেছিল। শুনে, আমরা একদিনেই বাড়ির পেছনে গর্ত খুঁড়ে দুজনকে বাংকারে লুকিয়ে রাখতাম। এভাবে একমাস পাহারা দিয়ে রাখি। অন্যদের বাড়ির পাশে স্কুল এবং আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। দেশ স্বাধীনের পর এ পরিবারটি ভারতে চলে যান। শিশুকালের বাংকার বন্ধুর সাথে আমার আর দেখা হয়নি। মা বললেন– তোর বাবা আসাম–বেঙ্গল রেলওয়ে চাকরি করতেন। ঘরের বড় ছেলে হওয়াতে তোর বাবাকে ৬ জন ভাই–বোনকে মানুষ করতে হয়েছিল। সে সময় নিজে (বাবা) ম্যাট্টিকুলেশন পাশ করার পর চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। এ ঘরের বড় বউ হিসেবে আমাকে (মা) সবার দায়িত্বের বোঝা নিতে হয়েছিল। তারপর সে থেকে জীবদ্দশার ৬৩ বছর তোদের এগার জনকে নিয়ে জীবনের ঘানি টেনেছি। ৭১ নিয়ে মা–কেন জানি নীরবে বোবা কান্না কাঁদতেন। দীর্ঘদিন পর আবারও মাকে খোঁচালাম– মা তুমি ডিসেম্বর আসলে কাঁদো কেন। মা বললেন– তুই এখন অনেক বড় হয়েছিস–শুন, তোর নানার কথা কি মনে আছে। আমি বললাম, আবছা। তোর নানা স্রেফ একজন প্রাকট্টেসিং মুসলিম ছিলেন। তাঁকে ১৭ ডিসেম্বর ৭১ সালে রাতের আঁধারে কে বা কারা –বাড়ির উঠোনে ব্যানেট খুচিয়ে মেরে ফেলে চলে যায়। সে থেকে ডিসেম্বর আসলে– বাবার করুণ মৃত্যু আমাকে (মা) কাঁদায়। প্রবাস জীবনের একযুগ পরও ক্যালেন্ডারের পাতায় ডিসেম্বর মাস দেখলে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। কী এক বিষ্ময়কর ব্যাপার–সবাইকে কাঁদিয়ে ঠিক ১৬ ডিসেম্বর ২০১০ সালে আমার ‘মা’ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে ওপারে চলে গেলেন। মা, মা..দেখা হবে জান্নাতে!










