আনোয়ারার এক কৃষিবিজ্ঞানী কামাল উদ্দিন

ছাবের আহমদ চৌধুরী | সোমবার , ১১ মে, ২০২৬ at ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ

এএসএম কামাল উদ্দিন। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার খাসখামা গ্রামের প্রসিদ্ধ মৌলভী বাড়িতে তাঁর জন্ম ১৯২১ সালের পহেলা মার্চ। পুরা নাম ছিল আবু সাঈদ মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন। পিতার নাম নজুমুদ্দিন কাজিমী ও মাতার নাম আমেনা খাতুন। তিনি ১৯৩৭ সালে আনোয়ারা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় হইতে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৩৯ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৪১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বিএসসি (এগ্রিকালচার) পাস করেন। বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট, ঢাকা থেকে ১৯৪৩ সালে বিএজি ডিগ্রি লাভ করেন। কামাল উদ্দিন ১৯৪৩ সালের পহেলা মে ঢাকা কৃষি অধিদপ্তরে গবেষণা কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সালে ১ লা মার্চ রংপুর জেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৪৫ সালে ‘শস্যামড়ক’ বিষয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেন। তিনি ১৯৭২ সালে সুগার কেইন টেকনিক্যাল কমিটি ও প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে কৃষি নির্ভর শিল্প বিষয়ে রাশিয়া থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসোসিয়েট প্রফেসর ছিলেন।

তিনি জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে অনেক পুরস্কার লাঝ করেন। তিনি কৃষিবিষয়ে অনেক বই প্রকাশনা করেছেন। সুগার কেইন ব্রিডিং ইন হাওয়াই, সবজী চাষ, ফলের চাষ, আমের চাষ, গোলাপের চাষ, বাড়ির আঙ্গিনায় ফলের চাষ, বাড়ির আঙ্গিনায় সবজী চাষ। মরিশাস সুগার ইন্ডাস্ট্রি নামের স্টাডি রিপোর্ট প্রকাশনা করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ ফিলিপাইন, জাপান, ব্যাঙ্কক, পাকিস্তান, ভারত, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, রেঙ্গুন, সাউদি আরব ভ্রমন করেন। তিনি একজন পণ্ডিত কৃষিবিজ্ঞানী ছিলেন, অত্যন্ত সৎ ও দক্ষ প্রশাসক ছিলেন। নিজের নার্সারিতে মধু পোকার চাষ করে মালিদেরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি টেনিস ও ব্যাডমিন্টন খেলায় পারদর্শী ছিলেন। বাছাই করা, লালন করা, সংগ্রহ করা ও প্রবৃদ্ধি এই সব বিষয়ে চর্চা করাই হলো তাহার দৃষ্টিতে বড় গবেষণার কাজ। তিনি সবসময় বলতেন শিখতে হবে, ছোটবড় সবার কাছে শিখতে হবে, তাতে লজ্জার কিছু নেই, শিক্ষার কোনও বয়স নেই। নিজেকে নিজে কখনো মনে করিও না, আমার সব শিখা হয়ে গেছে। কর্মপ্রিয় এই মানুষটি বিশ্বাস করতেন, এ দেশের মাটি সোনা ফলানোর উপাদানে সমৃদ্ধ। তার চিন্তা ছিলফল, ফুল, শাকসবজি অর্থকরী ভিত্তিতে চাষ করে ছোট কৃষকের আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবেদেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে হবেবিদেশে রফতানি যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। মালি তৈরি করে, নার্সারি ব্যবসায়ের প্রসার ঘটিয়ে, সরকারি ফার্মের কর্মতৎপরতা বাড়িয়ে, এই উদ্দেশ্য সফল করতে হবে। ফল, ফুল তরিতরকারীর ভালো জাত সংগ্রহ করেপ্রচুর পরিমানে চারা তৈরি করে বীজ তৈরি করে চাষীর নাগালে পৌছে দেয়ার সরকারি যে কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল তার রচয়িতা ছিলেন জনাব এএসএম কামাল উদ্দিন। কৃষকের লাভক্ষতি সেই সাথে দেশের লাভক্ষতির সহজ অঙ্ক তার মাথায় ঘুরতো। দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়ে তিনি বাংলাদেশের জল মাটির উপযোগী ইক্ষুর জাত উদ্ভাবন করেন। বাংলাদেশের যেকোনো এলাকায় সাগর কলা চাষ হতে পারে এই ধারণাটির জন্ম দেন এএসএম কামালউদ্দিন। ঢাকা কৃষি ফার্মে এবং ঈশ্বরদী আখ ফার্মে সাগর কলার সফল চাষ করে ধারণাটির সত্যতা প্রমাণ করেন। নারকেল চাষের উপর কামালউদ্দিন সাহেব গভীর অধ্যায়ন করেছিলেন। তার চিন্তা ছিল থাইল্যান্ড শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন থেকে ‘পুরু’ শাশের নারকেল চারা আনিয়ে বাংলাদেশে চাষ করবেন, কিন্তু এ ব্যাপারে কোনও মহল থেকে আর্থিক সাহায্য পাননি। তার এক ভাতিজা আবু তাহের ঐ নার্সারীর ব্যবসা গুলো দেখার পুরো দায়িত্বে ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং ১৯৯৯সালের ২২ শে নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচিন্তামণি লাইব্রেরি : গৌরবময় ঐতিহ্য থেকে অবহেলার অন্ধকারে-কেন?
পরবর্তী নিবন্ধপথচারীদের জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত করা হোক