উপমহাদেশে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস এক দীর্ঘ উত্থান–পতনের কাহিনি। প্রাচীন নালন্দা মহাবিহার ধ্বংসের পর যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তার বহু পরে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে নতুন করে বৌদ্ধ জাগরণ শুরু হয়। এই পুনরুত্থান পর্বে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি (১৮৮৭) যেমন প্রথম সংগঠিত প্রয়াস, তেমনি চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘চিন্তামণি লাইব্রেরি’ ছিল জ্ঞানচর্চার এক অগ্রদূত প্রতিষ্ঠান। কোলকাতার গুণালংকার লাইব্রেরি বা মহাবোধির ধর্মব্রাজিক লাইব্রেরির মতো উদ্যোগগুলো পরে এলেও চিন্তামণি লাইব্রেরি ছিল এই ধারার প্রাথমিক আলোকবর্তিকা।
এই লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা অগ্রমহাপণ্ডিত ধর্মবংশ মহাথের (১৮৭২–১৯৩৯) কেবল একজন ধর্মগুরু নন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির সভাপতি, চট্টগ্রাম কলেজের পালি বিভাগের অধ্যাপক জ্ঞানসাধক এবং কৃতজ্ঞতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে লাইব্রেরিটি ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হতে থাকে। চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের একটি কক্ষে শুরু হওয়া এই সংগ্রহশালা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ধীরে ধীরে একটি বিস্তৃত গ্রন্থভাণ্ডারে রূপ নেয়। এখানে আনুমানিক সাত হাজারেরও বেশি গ্রন্থ সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো বিভিন্ন দেশের হরফে লিখিত ত্রিপিটক বর্মী, থাই, শ্রীলঙ্কান ও নাগরিক লিপিতে রচিত ধর্মগ্রন্থসমূহ। পাশাপাশি গীতা, বাইবেল, কোরআনের মতো অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের উপস্থিতি এই লাইব্রেরির অসামপ্রদায়িক ও উদার জ্ঞানচর্চার পরিচয় বহন করে।
চিন্তামণি লাইব্রেরির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ। তালপাতা, ভোজপত্র ও কাঠফলকে লিখিত প্রাচীন পুঁথি ও কম্মবাচা এই লাইব্রেরিকে এক অনন্য ঐতিহ্যের ধারক করে তুলেছে। এ ধরনের সংগ্রহ শুধু ঐতিহাসিক মূল্যই বহন করে না, বরং আন্তর্জাতিক গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দেশ–বিদেশের বহু গবেষক এই লাইব্রেরি ব্যবহার করে তাঁদের গবেষণাকর্ম সমৃদ্ধ করেছেন।
এই ধারার ধারক হিসেবে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাথের–এর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি শুধু লাইব্রেরির রক্ষণাবেক্ষণই করেননি, বরং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ঐতিহ্য রক্ষা করেছেন। তাঁর দূরদর্শিতার ফলেই লাইব্রেরির কিছু দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য মাইক্রোফিল্ম আকারে সংরক্ষণ করা হয়, যা আজও গবেষণার অমূল্য সম্পদ।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এত সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অধিকারী এই লাইব্রেরি বর্তমানে অনেকটাই অবহেলিত। নিয়মিত ব্যবহার, গবেষণা কার্যক্রম বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে এটি যেন ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে। যে প্রতিষ্ঠান একসময় জ্ঞানসাধনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, আজ তা সাধারণ পাঠক ও গবেষকদের নাগালের বাইরে।
চিন্তামণি লাইব্রেরি কেবল একটি গ্রন্থাগার নয়–এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জ্ঞানচর্চার এক অনন্য প্রতীক। এর অতীত যেমন গৌরবময়, তেমনি ভবিষ্যৎও হতে পারে উজ্জ্বল–যদি আমরা যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করি।










