(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
তরুণী উবার ড্রাইভার আমাদেরকে নিয়ে বেশ ভালোয় গাড়ি চালাচ্ছিলেন। খুবই স্মোথ। অবশ্য, ভালো রাস্তায় গাড়ি এরূপ স্মোথই লাগে। প্রচুর গাড়ি রাস্তায়। কোনটি আমাদের ওভারটেক করে চলে যাচ্ছে, কোনটিকে আমরা। রকমারি গাড়ির হেডলাইটের আলোতে আলোকিত সিডনি শহর, ব্যাকলাইটের আলোতে বর্ণিল। ভবনগুলোতেও আলোর ঝলকানি, চারদিকে একটি উৎসবের আবহ। উইকঅ্যান্ডের রাতে এরা কী ঘুমায় না! এতো মানুষ রাস্তায়! কোথায় ছুটছে তারা, কোন আকর্ষনে এরা ঘর ছেড়ে রাস্তায় ছুটছে বুঝতে পারছিলাম না।
আমাদের হোটেলের সামনে পৌঁছে দিলেন তরুণী। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ভাড়া পরিশোধ করা হলো। ব্যাংকের পস মেশিনে সোয়াইব করে ভাড়া নিয়ে তিনি চলে গেলেন। আমি এবং লায়ন বিজয় শেখর দা রুমে চলে আসলাম। লায়ন ফজলে করিম ভাই এবং ডালিয়া ভাবীকে উইকঅ্যান্ডের রাতে খুবই মিস করেছি। এতোরাতে তারা নিশ্চয় জেগে নেই। তাই আর ফোন করলাম না। সকালে নাস্তার টেবিলে দেখা হলে বাড়িয়ে বাড়িয়ে গল্প বলে দিশেহারা করে ছাড়বো।
বিছানায় কাৎ হওয়ার পরই আমার ফোনটি বেজে উঠলো। এতোরাতে কে আবার ফোন করে! স্কিনে ভেসে উঠেছে আমার বন্ধু তারেক ভাইয়ের ছবি। তারেক ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। ওখানে সরকারের বেশ শীর্ষ পদে চাকরি করেন। দেশে না থাকলেও আমাদের বন্ধুত্বে কোনদিন ছিড় ধরেনি। আগে যেমন যোগাযোগ ছিল এখনো তেমনি রয়েছে। তারেক ভাই বললেন, আপনি কি আমাকে না দেখে অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরবেন? কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। তারেক ভাই থাকেন ক্যানবেরা। সিডনি থেকে অন্ততঃ ৩০০ কিলোমিটার দূরে। যেতে আসতে কমপক্ষে ৮ ঘন্টার ড্রাইভ। তাও ব্যক্তিগত ভালো গাড়িতে গেলে। বাস বা ট্রেনে যেতে হলে আরো বেশি সময় লাগবে। কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। তারেক ভাই বললেন, প্রয়োজনে দিনে এসে রাতে ফিরে যাবেন, তবুও দেখে যান। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী না দেখে ফিরে যাবেন! তারেক ভাইকে বললাম, আচ্ছা দেখি কি করা যায়। যদি না পারি তাহলে মাফ করে দিয়েন। ক্যানবেরা না দেখে ফিরলে আপনার অস্ট্রেলিয়া বেড়ানো অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে বলে আমাকে তিনি লোভ দেখালেন।
বিশাল এক মহাদেশ। পুরো দেশ কি দেখে যাওয়া সম্ভব! কিন্তু তারেক ভাইয়ের একটি কথা আমার ভিতরে তখন ভাংচুর শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা! আচ্ছা রাজধানী না দেখে ফেরা কি ঠিক হবে! লায়ন বিজয় দাকে কথাটি বললাম। তিনিও ক্যানবেরা বেড়াতে যেতে চান, কিন্তু যাওয়ার আসার উপায় কি! অচিন দেশ, পথ ঘাট চিনি না। কোথায় থেকে কোথায় যেতে হবে তাও বুঝতেছি না।
হঠাৎ মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেলো। আমার খুবই ঘনিষ্ট এক ছোটভাই থাকেন সিডনিতে। দেশে একই এ্যাপার্টমেন্টেই আমাদের বসবাস। সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ট। অস্ট্রেলিয়ায় এসেছি পর্যন্ত রুবেল সকাল–সন্ধ্যা ক্রমাগত ফোন করছে দেখা করার জন্য, কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ট্যুর প্রোগ্রাম আগে থেকে সেট থাকায় রুবেলকে সময় দেয়া সম্ভব হচ্ছিলো না।
আমি রুবেলকে ফোন করলাম। সে যেনো আমার ফোনেরই অপেক্ষা করছিলো। এক রিংয়ে ফোন ধরে বললো, ভাইয়া আসবো, কোথাও যাবেন! বললাম, এতো রাতে আসতে হবে না। কাল সকালে আমাকে ক্যানবেরা নিয়ে যেতে পারবে? রাতেই ফিরে আসবো। এক সেকেন্ড চিন্তা না করেই রুবেল বললো, পারবো, কোন সমস্যা নেই। তবে ৮/১০ ঘন্টা যদি আপনি গাড়িতে বসে থাকতে পারেন তাহলে আমার কোন সমস্যা হবে না। বিজয় দাকে বললাম, সকালে ক্যানবেরা যাচ্ছি, অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী দেখে আসবো। ট্যুর গ্রুপের সাথে আমরা বের হবো না। নাস্তা করে আমরা ক্যানবেরা চলে যাবো। ফজলে করিম ভাই এবং ডালিয়া ভাবী গেলে ওনাদেরও সাথে নেবো। রুবেলের গাড়ির ছবি দেখেছি, সেভেন সিটার, সুতরাং সমস্যা হবে না।
বেশ খোশদিলে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে বিজয় দা ধাক্কাধাক্কি করে ঘুম ভাঙ্গালেন। বললেন, করিম ভাই রেস্টুরেন্টে বসে আছেন, চলেন। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করতে রেস্টুরেন্টে গেলাম। লায়ন ফজলে করিম ভাই এবং ডালিয়া ভাবী একটি টেবিল নিয়ে বসে আছেন। ব্যুফে ব্রেকফাস্ট। আমরা চারজনে মিলে নাস্তা করতে শুরু করলাম। ফজলে করিম ভাইকে ক্যানবেরা যাওয়ার কথা বলতেই উনি মন খারাপ করে ফেললেন। বললেন, আমার অতি ঘনিষ্ঠ একজনের সাথে দুপুরে লাঞ্চ করার প্রোগ্রাম সেট করেছি। আপনারাও থাকবেন। তাহলে এখন ক্যানবেরা যাবো কেমনে? ক্যানবেরা এবং সিডনিতে উভয়মুখী প্রোগ্রাম করে ফেলার কথা জানার পর করিম ভাই আবারো মন খারাপ করলেন। শেষতক সিদ্ধান্ত হলো যে, আমি এবং বিজয় দা ক্যানবেরা যাবো, করিম ভাই ওনার স্বজনের সাথে সিডনিতে লাঞ্চ করবেন। আমাদের চারজনের কেউই আজ ট্যুর গ্রুপের প্রোগ্রামে যাবো না।
নাস্তা শেষ করে দ্বিতীয় মগ কফি খাচ্ছিলাম। ফোন করলো রুবেল। জানালো যে, সে বাসা থেকে বের হয়েছে। হোটেলের সামনে পৌঁছাতে ঠিক দশ মিনিট লাগবে। আমি এবং বিজয় দা দ্রুত রুমে গিয়ে তৈরি হয়ে নিচে নেমে আসলাম। অল্পক্ষনের মধ্যেই রুবেল বিশাল এক মার্সিডিস জিপ নিয়ে হাজির হলো।
রুবেল নিজে ড্রাইভ করছে। আমাকে বসতে হলে ফ্রন্ট সিটে, পেছনে পুরো গাড়ি দখল করে বিজয় শেখর দাশ। আমাদের নিয়ে রুবেল ক্যানবেরার পথে যাত্রা করলো। আমার ভিতরে খুশী যেনো চমকে চমকে বয়ে বেড়াচ্ছিলো। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী দেখতে যাচ্ছি। বহুদিন পর দেখা হবে অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু তারেক ভাইয়ের সাথে।
সিডনির হোটেলের সামনে থেকে গাড়ি দক্ষিণ–পশ্চিম দিকে এগোতে শুরু করে। বিশাল রাস্তা, শত শত গাড়ি। রাস্তার দুইপাশে উঁচু উঁচু ভবন, ব্যস্ত ফ্লাইওভার, ট্রাফিকের সুশৃঙ্খল গতি। রুবেল খুবই মনযোগ সহকারে গাড়ি চালাচ্ছিলো। আমি চালাবো কিনা জানতে চাইলো। ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেও আমি গাড়ি চালানোর সাহস করলাম না। মনে হচ্ছিলো, কোন একটি ঝামেলায় জড়িয়ে গেলে ক্যানবেরা দেখা মিস হয়ে যাবে।
আমরা শহরের বাইরে চলে আসলাম। আশেপাশের দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করে। রাস্তার দুই পাশে উঁচু ভবনের পরিবর্তে শুরু হয় সবুজ উপশহর, গাছপালায় ঘেরা আবাসিক এলাকা, মাঝে মাঝে ছোট শপিং কমপ্লেক্স আর সার্ভিস স্টেশন।
কিছু দূর যাওয়ার পর রুবেল একটি সার্ভিস স্টেশনে প্রবেশ করলো। সার্ভিস স্টেশনে গাড়ির তেল কেনা থেকে কফি খাওয়া পর্যন্ত সবই আছে। ভারী খাবার দাবারের ব্যবস্থাও। রুবেল গাড়িতে তেল ভরে নিলো। সে নিজে গিয়ে তিনটি বেশ বড় সাইজের মগ ভর্তি করে কফি নিয়ে আসলো। নিজেরটা গাড়ির হোল্ডারে রেখে আমাদেরকে দুইটি হাতে দিল। চুক চুক করে কফিতে চুমুক দিতে দিতে রুবেল আবার গাড়ি টান দিল।
অস্ট্রেলিয়ার রাস্তা সবগুলোই সুন্দর, মসৃন, উন্নত। তবে সিডনি–ক্যানবেরা সড়কটি মনে হচ্ছিলো বেশি মসৃন। কোথাও ৬ লেন, কোথাও ৪ লেনের রাস্তা। রুবেল ১২০/১৩০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাচ্ছিলো। কিন্তু গাড়িতে কোন শব্দ ছিলো না। ছিল না কোন নড়াছড়া। আমরা খুবই আয়েশি ভঙ্গিতে কফিতে চুমুক দিচ্ছিলাম। রাস্তার প্রতিটি লেন পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত, কিছুক্ষন পরপরই রাস্তার উপর সাইনবোর্ড, রয়েছে দিক নির্দেশনা। দূরত্বও লিখে দেয়া হয়েছে। কোন জরুরি কারনে থামার জন্য রাস্তার পাশে রয়েছে আলাদা শোল্ডার।
আমরা দক্ষিণে যাচ্ছিলাম। প্রকৃতি যেনো অনেকটা নাটকীয়ভাবে পাল্টে যাচ্ছিলো। দূরে নীলাভ পাহাড়ের রেখা। কী দুর্দান্ত লাগছিল দূরের পাহাড়গুলোকে। কোথাও রাস্তার পাশে বিশাল খোলা মাঠ। মাঠে চরছে গরু–ভেড়া, পাশেই খামার। কখনও রাস্তার দুই পাশে সারি সারি ইউক্যালিপটাস গাছ, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ তৃণভূমি যেন সবুজ কার্পেটে মোড়া।
বিপুল বেগে ছুটছিল আমাদের গাড়ি। রুবেল দেশেও ভালো গাড়ি চালায়, অস্ট্রেলিয়ার এমন চমৎকার রাস্তায় তার হাতে যেনো জাদু খেলা করছিল। আমাদের কফি শেষ হয়েছে বেশ আগেই। মগগুলো রুবেল গাড়িতেই জমা করে রেখেছে। রুবেল বললো, আমরা অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়েছি। আরো অর্ধেক পথ সামনে আছে। মাঝপথে গোলবার্ণ নামের ছোট একটি শহরে সে গাড়ি থামালো। বললো, সিডনি ক্যানবেরা যাতায়তকালে এই শহরে থামা অনেকটা ফরজ কাজের মতো। সব মানুষই এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে, কফি নেয়। তারপর আবারো যাত্রা করে। আমাদের চট্টগ্রাম–ঢাকা রোডের চৌদ্দগ্রামের মতো। কথাটি বলে রুবেল নিজেই শব্দ করে হেসে উঠলো। কোথায় চৌদ্দগ্রাম, আর কোথায় গোলবার্ন!! গোলবার্ণ অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ঐতিহাসিক আঞ্চলিক শহর। এখানে ক্যাফে, পেট্রোল স্টেশন ও হোটেল রেস্টুরেন্ট সবই রয়েছে। শহরে ঢোকার আগেই দূর থেকে বিশাল বিগ ম্যারিনো ভাস্কর্য দেখা যাচ্ছিলো। একটি বিশাল ভেড়ার প্রতীক, যা স্থানীয় পশম শিল্পের স্মারক বলেও রুবেল জানালো। আমি ভাস্কর্যটিকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।













