প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, আল্লাহর নবী নূর নবীজি “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” কে ভালোবাসুন, নবীজির পরিবারবর্গকে ভালোবাসুন, তাঁদের স্মরণ করুন। আল্লাহর পুণ্যাত্মা প্রিয় বান্দাদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করুন। তাঁদের অনুসৃত নীতি আদর্শ ও শিক্ষা গ্রহণ করুন।
ঐতিহাসকি ঘটনাবলী স্মরণ করার নির্দেশনা: আল্লাহর প্রেরিত নবী রাসূল আলাইহিমুস সালামদের জীবন কর্মের আলোচনা, নবীজির পরিবারবর্গ, আহলে বায়তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম আউলিয়ায়ে কেরামের জীবন কর্মের স্মৃতিচারণ করা, পৃথিবীতে সংঘটিত অতীত ঘটনাবলী স্মরণ করা, অতীতের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য স্থানে নির্দেশ করা হয়েছে, এর মাধ্যমে উপদেশ গ্রহণ, সর্বাবস্থায় সত্যের উপর অটল অবিচল থাকার শিক্ষা ও আল্লাহর নিয়ামতের চর্চা ও স্মরণ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, আপনি তাদেরকে আল্লাহর দিন সমূহ স্মরণ করিয়ে দিন। (সূরা: ইবরাহীম, আয়াত: ৫)
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু বর্ণনা করেন, আল্লাহর নিয়ামত সমূহ ও তাঁর ঐতিহাসিক ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিন। (তাফসীর তাবারী ১৬/৫৫৮)
কারবালার ঘটনার প্রসঙ্গে প্রখ্যাত তাফসীরকার আল্লামা ইবনে কসীর (রহ.) বলেন, হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ মর্মান্তিক ঘটনা। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৮/২২১)
আশুরা অর্থ: আশুরা শব্দটি একটি প্রসিদ্ধ ইসলামী পরিভাষা। আরবি, আশারা শব্দের অর্থ দশ। আশারা থেকে আশুরা গঠিত। প্রখ্যাত ভাষা বিজ্ঞানী ইবনে মনযুর বর্ণনা করেন, আশুরা হলো মহররমের দশম দিন। (লিসানুল আরব)
আশুরা শব্দটি ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থসহ অসংখ্য হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে, নিম্নে আশুরার গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হলো।
পূর্ববর্তী নবীগণ আশুরা দিবসে রোজা পালন করেছেন: হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এ মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। মহররম মাসকে আল্লাহর মাস বলা হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হল আল্লাহর মাস মহররমের রোযা। আর ফরজ নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো তাহাজ্জুদ নামায। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৩)
আশুরার রোজা গুনাহের কাফরারা: আশুরা দিবসে নবীজি রোজা পালন করেছেন উম্মতকেও উৎসাহিত করেছেন। সাহাবী হযরত আবু কাতাদা আনছারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি আশুরা দিবসের রোযা পূর্ববর্তী এক বছরের রোযার কাফফারা হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬২)
আশুরা উপলক্ষে তিনটি রোজা রাখার গুরুত্ব: সহীহ মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম নবভী হাদীসের ব্যাখ্যায় আশুরা উপলক্ষে তিনটি রোজা রাখার কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন, আশুরার রোযার তিনটি স্তর রয়েছে, সর্বনিম্ন স্তর শুধু দশম তারিখ রোজা রাখা, তার চেয়ে উত্তম হলো নবম ও দশম তারিখ দু’টি রোজা রাখা, আর সর্বোত্তম হলো নবম, দশম ও একাদশ তারিখ তিনটি রোজা রাখা। (শরহে সহীহ মুসলিম: ৮/১৩)
আশুরার রোযা প্রসঙ্গে আ’লা হযরত (রহ.)’র বর্ণনা: হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফাতওয়া গ্রন্থ ফতোওয়ায়ে রযভিয়্যায় আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা (রহ.) বর্ণনা করেন, মহররম দশ তারিখের সঙ্গে নবম তারিখও রোযা রাখা উত্তম। যদি না রাখা হয় এগার তারিখে রোযা মিলিয়ে নিবেন। শুধু দশ তারিখে রোযা মাকরূহ তানযীহি। (ফতোওয়ায়ে রযভিয়্যা, খন্ড:১০, পৃ: ৬৫৬৫)
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী’র বর্ণনা মতে ইহুদীদের সাথে সাদৃশ্যের কারণে শুধু দশম তারিখ রোযা এককভাবে রাখা মাকরূহ। ইহুদিদের বিরোধিতার জন্য এর সঙ্গে নবম তারিখ রোযা রাখা মুস্তাহাব। (ফতোওয়ায়ে শামী, খন্ড:২, পৃ: ৩৭৫–৩৭৬)
ফতোয়ায়ে আলমগীরিতে আছে, আশুরার রোযা পূর্ববর্তী একদিন অথবা পরবর্তী একদিনের সঙ্গে রাখা মুস্তাহাব। (আলমগীরি, খন্ড:১, পৃ:২০২)
আশুরা দিবসে সংঘটিত ঘটনাবলী:
বিভিন্ন প্রমাণ্য তাফসীর গ্রন্থ ও উল্লেখযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনার আলোকে জানা যায় আশুরা দিবসে পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা থেকে অসংখ্য ঘটনাবলী সংঘটিত হয়েছ, নিম্নে আংশিক উল্লেখ করা হলো:
আশুরা দিবসে আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম আলাইহিস সালাম’র তাওবা কবুল করেছেন। (তাফসীরে তাবারী, খন্ড:১, পৃ: ৫২১), হযরত নূহ (আ.)’র কিস্তি জুদী পাহাড়ে নোঙ্গর করে। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, নৌকাটি জুদী পর্বতের উপর স্থির হলো। (সূরা: হুদ, ৪৪, তাফসীর ইবনে কাসীর, খন্ড:৪, পৃ: ৩৩৬)
এদিনে হযরত ইবরাহীম (আ.) নমরুদের জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড থেকে পরিত্রাণ লাভ করেন। (তাফসীরে কুরতুবী, খন্ড: ১১, পৃ: ৩০১), আল্লাহ তা’আলা আশুরা দিবসে হযরত ইউনুস (আ.) কে মাছের পেট থেকে মুক্তি দান করেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, খন্ড:৫, পৃ: ৩৬১), হযরত আইয়ুব (আ.) কে দীর্ঘ ১৮ বৎসর পর জটিল কঠিন রোগ থেকে শিফা দান করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড:১, পৃ: ২২৩)- আশুরা দিবসে ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেয়েছেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড: ১, পৃ: ২১১)।
হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত: আশুরা দিবসে রাহমাতুল্লীল আলামীন সৈয়্যদুল মুরসালীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমামে আলী মকাম তাজেদারে কারবালা জান্নাতের যুবকদের সরদার, মা ফাতেমার কলিজার টুকরা হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সপরিবারে ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড: ৮, পৃ: ২২০–২২১)
মহররম মাস ও আশুরা দিবসে উত্তম আমল সমূহ: নফল রোযা রাখা, নফল নামায আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, দরুদ শরীফ পাঠ করা, তাওবা ইস্তিগফার করা, যিকির আযকার করা, দান সাদকা করা, ফকীর মিসকীন দরিদ্র মানুষকে খাদ্য দান করা, শরবত বিতরণ করা, ফাতেহাখানি করা, ঈসালে সওয়াব করা ইত্যাদি আমল করা মুস্তাহাব। গুণীয়াতুত তালেবীন, ২য় খন্ড, পৃ: ৫৪, আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড: ১, পৃ: ২৪৪, নুজহাতুল মাজালিস, খন্ড: ১, পৃ: ১৪৬)
সতর্কতা: আশুরা দিবসে শোক প্রকাশের নামে তাজিয়া মিছিল করা, শরীরের বিভিন্ন অংশ ও মুখ মন্ডলে আঘাত করা, বুক চাপড়ানো, শরীর রক্তাক্ত করা, এ দিনকে উৎসবের দিন মনে করা। গুনাহ ও অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়া, সম্পূর্ণরূপে নিষেধ।
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে মহররম ও আশুরার ফযীলত অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।
ইসলাম সম্পর্কিত পাঠকের প্রশ্নাবলি ও নানা জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি। আগ্রহীদের বিভাগের নাম উল্লেখ করে নিচের ইমেলে প্রশ্ন পাঠাতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
Email : azadieditorial@gmail.com
মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম
আন্দর কিল্লাহ, কোতোয়ালী, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: আশুরা দিবসে কারবালার শহীদদের স্মরণে গরীব মিসকীনদের খাদ্য ও শরবত বিতরণ করা হাপ্তদানা প্রস্তুত করা, ফাতেহাখানি করা শরীয়ত সম্মত কিনা?
উত্তর: মানুষকে খাওয়ানো একটি উত্তম আমল। কুরআন হাদীস ও ইসলামী ফিকহ শাস্ত্রের বর্ণনা মতে এর বৈধতা প্রমাণিত। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মিসকীন ইয়াতীম ও বন্দীদের খাদ্য দান করে। (সূরা: আল ইনসান, ৭৬:৮)- নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা সালামের প্রসার কর এবং মানুষকে খাদ্য দান কর। (তিরমিযী হাদীস ২৪৮৫)- হাদীস শরীফে উল্লেখ হয়েছে, যে ব্যক্তি তার পরিবারের জন্য আশুরা দিবসে উদারভাবে আয়োজন করবে আল্লাহ তার জন্য সারা বৎসর প্রশস্ততা দান করবেন। (মুনাভী, ফয়জুল কদীর ৬/২৩৫)-হাপ্তদানা (সাত প্রকার শষ্য বা খাদ্য দিয়ে প্রস্তত খাবার) তৈরী করা, শরবত বিতরণ করা, দান সাদকা করা, ঈসালে সওয়াব করা, খাদ্য সামনে রেখে কুরআন পড়া, দরুদ শরীফ পড়া, শহীদদের রুহে এবং মৃতদের রুহে সওয়াব পৌছানো নিঃসন্দেহে জায়েজ ও উত্তম। এ প্রসঙ্গে আ’লা হযরত (রহ.) বর্ণনা করেন, কোন ব্যক্তি নেক আমলের সওয়াব অন্যকে পৌঁছালে জীবিত বা মৃত্য উভয়েই তা দ্বারা উপকৃত হয়। (ফতোওয়ায়ে রযভিয়্যা, খন্ড: ৯, পৃ: ১৬৪, ফাতহুল কদীর, খন্ড ৩, পৃ: ১৪২–১৪৩, ফতোওয়ায়ে আলমগীরি, খন্ড: ১, পৃ: ৩৬৬)











