জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়, বরং সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা আর যৌথ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জলবায়ু কার্যক্রমকে একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখি। আমরা সকলে মিলে একটি সবুজ, নিরাপদ, টেকসই এবং ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ গড়তে পারি।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে চীনের দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ুর নেতৃত্ব’ শিরোনামের অধিবেশন প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। জলবায়ু সহনশীলতা রাখতে তিনটি অগ্রাধিকারের বিষয় তুলে ধরেন অধিবেশনের প্রধান বক্তা তারেক রহমান। জলবায়ু সহনশীলতা কোনো দেশ একা গড়ে তুলতে পারে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর জন্য প্রয়োজন অংশীদারত্ব, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং যৌথ অঙ্গীকার। কপ–৩১ ও কপ–৩২ এর দিকে তাকিয়ে আমরা তিনটি অগ্রাধিকারের ওপর জোর দিতে চাই। প্রথমত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য সহায়তাসহ ক্ষয়ক্ষতি তহবিলকে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়নকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আরো সহজলভ্য, সহজসাধ্য এবং চাহিদা–সাপেক্ষ হতে হবে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও ত্বরান্বিত হওয়া উচিত। এ লক্ষ্যে আমাদের ‘সবুজ জলবায়ু তহবিল’ (জিসিএফ) সংহত করা ও কার্যকরী করা প্রয়োজন। খবর বিডিনিউজের।
তৃতীয় অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি প্রশমনের পাশাপাশি অভিযোজনও অপরিহার্য। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন কোনো নীতিগত বিকল্প নয়, এটি একটি অপরিহার্য বিষয়। ইউএনসিটিএডির মতে, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন সম্মিলিত লক্ষ্যমাত্রা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রশমন ও অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা পূরণে অপর্যাপ্ত।
চীনের দালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই অধিবেশনে ৯০টির বেশি দেশের প্রায় ১ হাজার ৭০০ প্রতিনিধি অংশ নেন। এবারের সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থনীতি, শিল্পকাঠামোর পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উদীয়মান প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ, চীনের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, তারুণদের কর্মসংস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনায় উঠে আসছে।
বাংলাদেশ সরকারপ্রধান বলেন, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার একটি অগ্রণী জলবায়ু–সহনশীল জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরিবেশ সুরক্ষা, টেকসই উন্নয়ন এবং সবুজ প্রবৃদ্ধি এখন আমাদের জাতি গঠন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে এটি এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে আমি গভীরভাবে ভাবি এবং যার জন্য সচেষ্ট থাকি। এটি জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার বিষয়।
বাংলাদেশের জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে আমরা আগামী ৫ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন করার পরিকল্পনা করেছি। আমরা পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কৃষিকে সহায়তা করতে এবং জলবায়ুগত অভিঘাত মোকাবেলার লক্ষ্যে আমাদের প্রধান নদীর উপর পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে যাচ্ছি। একটি ব্যাপক মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ব্যারেজকেও আধুনিক করছি। আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণের অঙ্গীকার করেছি।
বনাঞ্চল সম্প্রসারণে বাংলাদেশ সরকারের গাছ লাগানোর কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সরকার বন, জলাভূমি, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করছে। গ্রামীণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য বিনিয়োগ করছি এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ চালু করছি। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সৌর, বায়ু, বর্জ্য থেকে শক্তি এবং অন্যান্য সমাধানের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বাংলাদেশের অন্তত ২০% বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আমরা পাটজাত পণ্য এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনসহ পরিবেশবান্ধব পরিবহনের মতো সবুজ শিল্পকেও উৎসাহিত করি।
দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রীর কর্মব্যস্ত দিন : বাসস জানায়, সরকারপ্রধান হিসেবে বিদেশে কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রথম অংশগ্রহণ করে কর্মব্যস্ত দিন কাটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল চীনের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় শহর দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত সম্মেলনে বিভিন্ন আয়োজনে যোগ দিয়েছেন তিনি। স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে দালিয়ানে সরকারপ্রধানের প্রথম দিনের কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস সিঙ্গি। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার কীভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে, দেশের মানুষকে অগ্রযাত্রার পথে ধাবিত করতে পারবে, সেগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রশংসা করা হয়েছে।
সন্ধ্যায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক সেশনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তার উপদেষ্টা মাহ্দী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে নির্বাচিত সরকার কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে, প্রশংসিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি কর্মসূচিগুলো বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করেন।
এরপর দালিয়ানের ‘সামার দাভোসে’ অংশ নেওয়া সরকারপ্রধানদের সম্মানে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের দেওয়া নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন–সিওক, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম–ওসোরিন উচরাল, গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু ওউরি বাহ, মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোজকো স্পাজিচ, কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকটেনভ ভোজসভায় অংশ নেন। তিনি বলেন, এটি ছিল সাত দেশের সরকারপ্রধানের একসঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভোজ, যেখানে উন্মুক্ত আলাপচারিতার সুযোগ ছিল। দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোসে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের বেস্ট প্র্যাকটিস গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতাকে আরো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করছে।
আজ বুধবার সকালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অন্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় দালিয়ান থেকে হাই স্পিড ট্রেনে প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সুজন মাহমুদ, শাহাদাত স্বাধীনসহ প্রেস দপ্তরের কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।












