পর্ব ২
১৯৬০ সালে যখন নায়ক উত্তমকুমারের অভিনয়জীবনের তুঙ্গ সময়, সে সময়েই তিনি দু’টি চরিত্রাভিনয়ে সাহসী হয়েছিলেন; মায়ামৃগ ও খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। দু’টিই ভৃত্যের চরিত্র। দু’টি চরিত্রেই সাবলীল অভিনয় ছিল তাঁর। ১৯৭০ ও ৮০’র দশকে তাঁর ‘অনায়ক’সুলভ চরিত্র যাকে ‘পার্শ্বচরিত্র’ বলতে আমরা অভ্যস্ত, সেরকম চরিত্রে অভিনীত কয়েকটি ছবি; কলঙ্কিত নায়ক, এখানে পিঞ্জর, ধন্যি মেয়ে, স্ত্রী, যদুবংশ, বিকালে ভোরের ফুল, মৌচাক, অগ্নীশ্বর, বহ্নিশিখা, সব্যসাচী, ভোলা ময়রা, সিস্টার, দুই পুরুষ, দেবদাস, শ্রীকান্তের উইল, দুই পৃথিবী, রাজাসাহেব। বলাবাহুল্য, পার্শ্বচরিত্র হলেও অভিনয়ের গুণে উত্তম অভিনীত চরিত্রটিই এসব ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ও ছবির ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটি ছবিতেই ছিল তাঁর ব্যাতিক্রমী অভিনয়।
এসব কিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, প্রযোজক–পরিচালক এবং খানিকটা দর্শকদের চাপে উত্তমকে গুরুত্বহীন নায়ক চরিত্রে বেশির ভাগ অভিনয় করে যেতে হয়েছে, যার ফলে তাঁর অভিনয় ক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারেনি। কিন্তু যেসব প্রযোজক–পরিচালক তাঁকে ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিয়ে ছবি তৈরি করেছেন, সেখানে তিনি তাঁদের সাহসের প্রতিদান দিয়েছেন অভিনয়ের শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। এবং দর্শকেরাও সেসব অভিনয় সাদরে গ্রহণ করেছেন।
‘ওয়ান ম্যান এ্যাকটর ও ইন্ডাস্ট্রি’র যে ক্রেজ পশ্চিমবঙ্গে উত্তমকুমারের ছিল সেই একই ক্রেজ দেখা গেছে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশেও। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সে উন্মাদনা বহমান ছিল। ১৯৬৫ সালের পর যখন বাংলাদেশে ভারতীয় ছবির প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়, তখন বাংলাদেশের দর্শকদের পক্ষে তাঁর ছবি দেখার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও, স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও ভিসিআর, ভিসিডি, ডিভিডি সহজলভ্য হবার পর সে সুযোগ আবার অবারিত হয়। তখন ১৯৬৫ পরবর্তী না দেখা ছবি এবং তার পূর্বে দেখা ছবিগুলির পুনর্দশন স্বভাবতই বৃদ্ধি পায়। বর্তমান প্রজন্মের কাছে উত্তমকুমারের ক্রেজ তেমন না থাকলেও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার কমতি নেই। এন্ড্রয়েড মোবাইল এবং ইউটিউব ও অন্যান্য অ্যাপসের কল্যাণে তারাও উত্তমকুমারের কোনও কোনও ছবি দেখেছে এবং দেখে। বিশেষ করে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত উত্তম অভিনীত ছবি দু’টি এবং শেষ দিকের কিছু ছবি। তাদের কাছে নায়ক উত্তমকুমারের চেয়ে অভিনেতা উত্তমকুমারের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
তবে অভিনেতা উত্তমকুমারের কাছে পরিচালক উত্তমকুমারের ভূমিকা অনেকটাই নিষ্প্রভ। চলচ্চিত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি অভিনয়ের মতো মুন্সিয়ানা দেখাতে সমর্থ হননি। এই ভূমিকায় তিনি যুক্ত না হলে তেমন কোনও ক্ষতি বিশেষ হতো বলে মনে হয় না। চলচ্চিত্রের অভিনয়ে অধিক ব্যস্ততার কারণে হয়তো পরিচালনায় তেমন মনোযোগী হয়ে উঠতে সক্ষম হননি। অবশ্য চলচ্চিত্র প্রযোজনায় তিনি বেশ সফল হয়েছেন, ছোটি সি মুলাকাৎ ছাড়া। হিন্দি এ ছবিটির নির্মাণের সময় তিনি যেমন নানারকম অপ্রত্যাশিত বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন, তেমনই ছবিটির মুক্তি ও পরিবেশনার বেলাতেও তাঁকে ভীষণ অসহযোগিতা ও অবাঞ্ছিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। বাংলা ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিটির হিন্দি রিমেক ছিল ‘ছোটি সি মুলাকাৎ’। উত্তমের বিশ্বাস ছিল ছবিটি ব্যবসা সফল হবে। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি চরমভাবে ফ্লপ করে। উত্তম সাংঘাতিকভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন তিনি। বোঝা যায় ঋণমুক্তির জন্যে এরপর বাধ্য হয়ে তাঁকে অকিঞ্চিৎকর অনেক ছবিতে কাজ করতে হয়েছে। তবে এই চরম হতাশা থেকে তিনি আর মুক্ত হতে পারেননি। যা তাঁর অকাল প্রয়াণের নেপথ্যের অনেক কারণের একটি। ছোটি সি মুলাকাতের পরিচালক ( আলো সরকার) নির্বাচনও সঠিক ছিল না। উত্তম সেটা পরে বুঝতে পেরেছিলেন।
উত্তমকুমার পরিচালনা করেছেন তিনটি ছবি ; শুধু একটি বছর (১৯৬৬), বনপলাশীর পদাবলী (১৯৭৩) এবং কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী (১৯৮১)। ছবি তিনটির পরিচালনার মধ্যবর্তী বিরতি বেশ দীর্ঘ। কিন্তু তেমন দক্ষতা নেই এ ক্ষেত্রে। রমাপদ চৌধুরীর এপিকধর্মী উপন্যাসের চিত্ররূপ–বনপলাশীর পদাবলী নির্মাণের পেছনে অবশ্য শিল্পী কলাকুশলীদের একটি সমিতি ‘শিল্পী সংসদ’–এর তহবিল সংগ্রহ ছিল মূল লক্ষ্য। এ সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন উত্তমকুমার নিজে। অন্য সমিতিটি ছিল ‘অভিনেতা সঙ্ঘ’, যেটির নেতৃত্ব দিতেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বনপলাশীর পদাবলীতে অনেক চরিত্র, গান এবং কাহিনীর অনেক বাঁক। শিল্পী কলাকুশলীদের সকলে সমবায় ভিত্তিতে কাজ করেছিলেন এ ছবিতে। ছবিটি বিশাল ক্যানভাসের হলেও চিত্রনাট্য সুগ্রথিত ছিল না। পরিচালনায় ব্যস্ততার কারণে উত্তমের নিজের অভিনয়ও অনেকাংশে সাদামাটা। বিশেষ করে তাঁর কস্টিউম ও গেটআপ ধীবরযুবার সাদৃশ্যবর্জিত। বলতে গেলে শতভাগ স্টারসুলভ। উত্তম পরিচালিত বাকি দু’টি ছবি নিতান্তই অতিসাধারণ মানের।
ফিরে যাই সত্যজিৎ রায়ের কথার সূত্রে। তিনি যে বলেছিলেন, ‘উত্তমের মত উত্তম অভিনেতা আর হবে না’, কথাটি আজ স্বত:সিদ্ধতায় প্রমাণিত। উত্তমকুমারের সমসাময়িক বা ঈষৎ পরবর্তী শক্তিশালী অভিনেতাদের কথা স্মরণে রেখেও বলা যায়, অভিনয় দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, দায়িত্বশীলতা, অভিভাবকত্ব (নিজ পরিবার ও বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প)-সব মিলিয়ে উত্তমকুমারের মতো উত্তম অভিনয়শিল্পী আর আসেননি বাংলা চলচ্চিত্রে। উত্তমকুমারের আগেও ম্যাটিনি আইডল দু’য়েকজন ছিলেন। কিন্তু তাঁরা আজ বিস্মৃত। মৃত্যুর ৪৬ (১৯৮০–২০২৬) বছর পরেও এখনও উত্তম ম্যাটিনি আইডল। কিংবদন্তী। প্রবাদ প্রতিম। বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনয় জগতের প্রথম ও প্রধান পুরুষ। ‘উত্তম’ শব্দটি বাংলা অভিধানে ‘প্রথম পুরুষ’ ও ‘শ্রেষ্ঠ’ এই দুই আক্ষরিক অর্থেই সম্বোধিত হয়। উত্তমকুমার এই দুই আক্ষরিক অর্থেই বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনয় সাম্রাজ্যের সম্রাট, শতবর্ষেও যার আসন অটল–অটুট।
১৯৬৮ সালে সত্যজিৎ রায় যে মূল্যায়ন উত্তমকুমার সম্পর্কে করেছিলেন, তার প্রতিটি পঙ্ক্তি অনেক অর্থ বহন করে। সত্যজিতের এই অনুধাবনের পরে আরও ১২ বছর উত্তম অভিনয় করে গেছেন। আরও পরিণত হয়েছেন। কিন্তু সত্যজিতের জহুরী চোখ উত্তমকে অনেক আগেই চিনে নিয়েছিল। তিনি যদিও বলেছিলেন, ‘উত্তমকুমার কোনও পরিচালকের ব্যক্তিগত সার্টিফিকেটের অপেক্ষা রাখেন না,’ কিন্তু বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকারের এই মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে উত্তমকুমারের একটি যথার্থ অভিজ্ঞান। সত্যজিৎ রায় বলেছেন, ‘উত্তমকুমারের অর্জন বরাত জোরে হয়নি’। সত্যিই তাই। দীর্ঘ স্থৈর্য, ধৈর্য, অধ্যবসায়, অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিরন্তর অনুশীলনের বিনিময়ে, অনেক অপমান, বিদ্বেষ, প্রতারণা, উপেক্ষা সহ্য করে এই শীর্ষস্থান তাঁকে অর্জন করতে হয়েছে। এভাবেই তিনি ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ থেকে ‘হিট মাস্টার জেনারেল’ হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সত্যজিৎ রায়ের কথা ঋণ করেই বলি, ‘উত্তমের মত স্টার আর হবে না। আশ্চর্য অভিনয় দক্ষতা। উত্তমের মত কোনও নায়ক নেই, কেউ হবে না।’ বাংলা সিনেমার ‘এভারগ্রিন স্টার’, ‘ম্যাটিনি আইডল’, ‘প্রাইম ডন’– উত্তমকুমার। শতবর্ষেও যিনি সমুন্নত, সমুজ্জ্বল, অবিনশ্বর, সদর্থে ও সর্বার্থে বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক। যতদিন বাংলা চলচ্চিত্র সংস্কৃতি স্রোতস্বিনী থাকবে, ততদিন কিংবদন্তীর আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে থাকবেন।










