চুক্তি শেষ, বন্ধ হলো লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার

মোহাম্মদ মারুফ, লোহাগাড়া | শনিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:২৮ পূর্বাহ্ণ

দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারের সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কেন্দ্রটির চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। এতে চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়কসহ আশপাশের এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীরা বিপাকে পড়েছেন।

জানা যায়, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগিতায় একটি প্রকল্পের আওতায় এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক ২০ শয্যার লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারটি চালু করা হয়। চালুর পর থেকে কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৬৭৭ জন রোগী এখান থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সেন্টারটিতে ৭ জন চিকিৎসক ও ১৫ জন সাপোর্টিং স্টাফ কর্মরত ছিলেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে ট্রমা সেন্টারটি বন্ধ রয়েছে। এতে একদিকে দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা দ্রুত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক কর্মরত স্টাফদের বেতনভাতাও বন্ধ হয়ে গেছে।

২০০৭ সালে লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১২ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। তিনতলা ভবন নির্মাণে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সেন্টারটি স্থায়ীভাবে চালুর জন্য চিকিৎসা কর্মকর্তা, জুনিয়র কনসালট্যান্ট, সহকারী সার্জন, নার্স ও টেকনোলজিস্টসহ মোট ২৭টি পদের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু এসব পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা হয়নি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটি চালু করা সম্ভব হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রমা সেন্টারে একেবারেই ভিন্ন এক চিত্র। যেখানে থাকার কথা আহত রোগীর স্বজনদের ছোটাছুটি, চিকিৎসকনার্সদের ব্যস্ততা আর জরুরি সেবার কর্মচাঞ্চল্য। কিন্তু, সেখানে চারপাশজুড়ে নেমে এসেছে নীরবতা। রোগীর অপেক্ষায় নেই কোনো স্বজন, নেই স্ট্রেচার নিয়ে ছোটাছুটি, নেই জরুরি বিভাগের চেনা ব্যস্ততা। ফাঁকা পড়ে আছে রোগী দেখার স্থান ও হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ। নির্জন পরিবেশে কয়েকজন স্টাফকে বসে থাকতে দেখা যায়। কাজের ব্যস্ততার পরিবর্তে যেন তাদের সময় কাটছে অনিশ্চয়তার মধ্যেকবে আবার খুলবে ট্রমা সেন্টারের দরজা, কবে ফিরবে রোগীদের ভিড়।

স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রামকঙবাজার মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ১৪৮ কিলোমিটার। সরু ও ব্যস্ত এই মহাসড়কটি দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। মহাসড়কের আশপাশে দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রের সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারটি চালুর পর এক বছর ধরে দুর্ঘটনায় আহত ও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন এমন রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারের চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বপালনকারী রিসিপশনিস্ট এইচ আর শহীদ জানান, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর নিয়মিত রোগীদের সেবা দেওয়া হয়েছে। এক বছরে বিপুলসংখ্যক রোগী এখান থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৫৬৪ জন এবং ২০২৬ সালে কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ৬ হাজার ১১৩ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। ব্যস্ত ও দুর্ঘটনাপ্রবণ চট্টগ্রামকঙবাজার মহাসড়কসহ আশপাশের সড়কে দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ট্রমা সেন্টারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল।

নিরাপদ সড়ক চাই লোহাগাড়া শাখার সাবেক সভাপতি মোজাহিদ হোসাইন সাগর জানান, ব্যস্ত চট্টগ্রামকঙবাজার মহাসড়কে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল ইফরান জানান, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ট্রমা সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রমা সেন্টারটি পুনরায় চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। বিএনপি নেতা নাজমুল মোস্তফা আমিন জানান, চট্টগ্রামকঙবাজার মহাসড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত ও দুর্ঘটনাপ্রবণ। এ মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রমা সেন্টারটি পরিদর্শন করে এর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হবে। পাশাপাশি দ্রুত সেখানে পুনরায় চিকিৎসাসেবা চালু করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধখাগড়াছড়িতে নিখোঁজ ইউপি সদস্যের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
পরবর্তী নিবন্ধলোডশেডিংয়ে উৎপাদন কমছে মীরসরাই বিসিক শিল্পনগরীর