হাইকোর্টের স্টাফ পরিচয়ে চট্টগ্রামের আদালত থেকে রায় হওয়া একটি মামলার নথি চুরির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে দুইজন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নগরীর কোতোয়ালী থানায় অজ্ঞাত ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আদালতটির বেঞ্চ সহকারী মোরশেদ রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ৪র্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা আদালতের স্টেনোগ্রাফারের কক্ষ থেকে মামলার নথি চুরির এ ঘটনাটি ঘটে। তবে গতকাল সকালে বিষয়টি জানাজানি হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৯ টায় ১ম যুগ্ম মহানগর দায়রা আদালতের স্টেনোগ্রাফার আমজাদ হোসেনের কক্ষে দুইজন অজ্ঞাত ব্যক্তি এসে নিজেদেরকে হাইকোর্ট বিভাগের পি. এ. হিসেবে পরিচয় দেন। তারা ১ম যুগ্ম মহানগর দায়রা আদালতের দায়রা–৫৫২৮/২০২৪ নং মামলার রায় বিষয়ে তথ্য জানতে চান। স্টেনোগ্রাফার আমজাদ হোসেন বিষয়টি একই আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোশারফ হোসেনকে জানালে তিনি অজ্ঞাত ব্যক্তিদের দেয়া তথ্য মতে আদালতের দৈনিক কার্যতালিকা যাচাই করে উক্ত মামলা ১ম যুগ্ম মহানগর দায়রা আদালতে নেই বলে জানান। পরবর্তীতে অজ্ঞাত ওই দুই ব্যক্তি মোবাইল ফোনে কথা বলে জানান যে, মামলা নম্বর ৫৫২৯/২০২৪ এবং তা ৪র্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা আদালতে বিগত ১ সেপ্টেম্বর রায় প্রচার হয়েছে। সে মতে স্টেনোগ্রাফার আমজাদ হোসেন তাদেরকে ৪র্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোরশেদ রহমানের কাছে নিয়ে যান।
এজাহারে বাদী মোরশেদ রহমান বলেন, ওই দুই ব্যক্তি উল্লিখিত মামলার আসামি তাদের আত্মীয় উল্লেখ করে রায়ের ফটোকপি নেয়ার অনুরোধ করেন। আমি তাদেরকে ফটোকপি দেয়ার আইনি বিধান নেই মর্মে জানিয়ে দিলে তারা উল্লিখিত মামলার নথিটি দেখার অনুরোধ করেন। তখন আমি তাদের জানাই মামলার নথিটি বর্তমানে নকল সরবরাহের জন্য অত্র আদালতের স্টেনোগ্রাফার আলী হোসেনের হেফাজতে আছে। সেই অনুযায়ী তারা স্টেনোগ্রাফার আলী হোসেনের কক্ষে যান এবং তাদের সাথে ১ম যুগ্ম মহানগর দায়রা আদালতের স্টেনোগ্রাফার মো আমজাদ হোসেনও যান। তারা সেখানে নথি দেখার অনুরোধ করলে স্টেনোগ্রাফার আলী হোসেন নথিটি বের করে মামলাটি সাজা হয়েছে এবং আসামি পলাতক আছে বিধায় নথি দেখানো যাবে না মর্মে জানালে তারা কক্ষটি থেকে বের হয়ে যান। তখন আলী হোসেন নথিটি যথা স্থানে রেখে ওয়াশরুমে গেলে উক্ত নথি চুরির ঘটনাটি ঘটে উল্লেখ করে এজাহারে বলা হয়, আলী হোসেন ফিরে এসে নকল প্রস্তুত করার জন্য উক্ত মামলার নথিটি খোঁজাখুঁজি করলে দেখা যায়– নথিটি যথাস্থানে নেই। তখন তিনি বিষয়টি বেঞ্চ
সহকারী মোরশেদ রহমানকে জানান। একপর্যায়ে তারা উভয়ই নথিটি খোঁজাখুঁজি করে ব্যর্থ হন এবং বুঝতে পারেন যে, অজ্ঞাত ওই দুই ব্যক্তি স্টেনোগ্রাফার আলী হোসেনের অনুপস্থিতির সুযোগে তার কক্ষ থেকে ওইদিন সকাল ৯ টা ৪০ থেকে ১০ টার মধ্যবর্তী সময়ে দায়রা ৫৫২৯/২০২৪ নং মামলার নথিটি চুরি করে নিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে বিষয়টি তারা সংশ্লিষ্ট আদালতের দায়িত্বরত বিচারককে জানালে তিনি কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে মামলা করার নির্দেশ দেন বলেও এজাহারে বলা হয়।
জড়িত একজন গ্রেপ্তার ও দায় স্বীকার, অপরজনের বিষয়েও মিলেছে তথ্য : আদালত সূত্র জানায়, মামলা দায়ের পরবর্তী কোতোয়ালী থানা পুলিশ ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তও করা হয়। একপর্যায়ে গত শনিবার দুপুরে ঢাকার ডেমরা থানাধীন মাওতাল বাদশাহ মিয়া রোড এলাকার ভাড়া বাসা থেকে ঘটনায় জড়িত একজনকে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। তার নাম রাশেদুল হাসান নাঈম (৪০)। তিনি পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার নুরাইনপুর এলাকার মো. আবু জাফরের ছেলে। পরবর্তীতে তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয় এবং গতকাল বিকেলে তাকে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদের আদালতে সোপর্দ করলে সেখানে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, মামলার নথি চুরি করে দৌঁড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছেন রাশেদুল হাসান নাঈম ও তার সহযোগী রাসেল মৃধা–বিষয়টি আদালতের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। রাশেদুলের মোবাইলের সিডিআর পর্যালোচনায়ও স্পষ্ট হয়েছে যে, ঘটনায় সময় তিনি কোর্টহিলেই ছিলেন। তার সাথে থাকা লোক যে রাসেল মৃধা সে তথ্যও তিনি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, আসামি রাশেদুল একজন পেশাদার চোর ও প্রতারক। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন কোর্টে তদবির করে আসছিলেন। নিজেকে কখনো আইনজীবী, কখনো মুহুরী, আবার কখনো হাইকোর্টের বিচারপতির পি.এ পরিচয় দিতন।
প্রথমে কঙবাজার এরপর ফের চট্টগ্রামে এসে বিমানে ঢাকায় চলে যান : মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহ আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, নথি চুরির পরপর দুই আসামি প্রথমে কঙবাজার চলে যান। সেখান থেকে ফের তারা চট্টগ্রামে আসেন। এরপর শাহ আমানত বিমান বন্দরে গিয়ে বিমানে করে ঢাকায় যান। চুরি হওয়া মামলার নথির জন্য আসামির কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে তারা কাজ করেছেন জানিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তবে কত টাকার লেনদেন হয়েছে–সে বিষয়ে এখনো জানা যায়নি। তদন্ত চলমান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা অপর আসামি রাসেল মৃধাকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। অভিযান চলমান।
নগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, আসামি রাশেদুল হাসান নাঈম ঘটনার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় আদালত তা রেকর্ড করেন এবং পরবর্তীতে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।












