গ্যাস সংকটে রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) উৎপাদন টানা পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এই ইউরিয়া সার কারখানা। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির এক হাজারের বেশি শ্রমিক–কর্মচারীর জীবন–জীবিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের অভাবে বারবার কারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া কারখানাটির মূল্যবান যন্ত্রপাতিও অকেজো হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে কারখানাটি চালু করা না গেলে দেশে ইউরিয়া সারের সরবরাহ ও মজুতেও চাপ পড়তে পারে। প্রয়োজন মেটাতে সরকারকে ব্যয়বহুল আমদানির ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।
টানা ৫ মাস ১২ দিন উৎপাদন বন্ধ : গ্যাস সংকটের কারণে ৪ মার্চ থেকে সিইউএফএলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত টানা ৫ মাস ১২ দিন কারখানাটি বন্ধ। কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সিইউএফএল চালু রাখতে দৈনিক প্রায় ৪৫ এমএমসিএফডি গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় উৎপাদন চালু রাখা যাচ্ছে না।
গত অর্থবছরে ক্ষতি ৫০০ কোটি টাকা : গ্যাস সংকটের কারণে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দফায় দফায় বন্ধ ছিল সিইউএফএল। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) ওই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির জন্য নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন সম্ভব হয়েছে বলে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
চলতি অর্থবছরে এখনো উৎপাদন শূন্য : ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বিসিআইসি সিইউএফএলের জন্য ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ থাকায় চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত এক মেট্রিক টন সারও উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কবে নাগাদ কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়েও কোনো তথ্য নেই। ফলে চলতি অর্থবছরের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
কারখানা কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, পুরো অর্থবছর উৎপাদন ব্যাহত হলে সিইউএফএলের আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে দেশে ইউরিয়ার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বেশি দামে বিদেশ থেকে সার আমদানির প্রয়োজন হতে পারে।
বন্ধ কারখানায় মাসে খরচ ১০ কোটি টাকা : বর্তমানে সিইউএফএলে কর্মকর্তা পদে প্রায় ২২০ জন, শ্রমিক প্রায় ৩৫০ জন এবং দৈনিকভিত্তিক ও অস্থায়ী কর্মচারীসহ মোট এক হাজারের বেশি জনবল রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অন্যান্য খরচসহ বন্ধ কারখানায় মাসিক ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এক দশকের বেশি সময় ধরে গ্যাস সংকটের কারণে প্রতি বছর দীর্ঘ সময় কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট ক্রমে প্রকট হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে শ্রমিক–কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন–ভাতা প্রদান নিয়েও সংকট তৈরি হতে পারে।
গ্যাস না পেলে শ্রমিক–কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ হুমকিতে : সিইউএফএলের কর্মকর্তা একিউএম সেলিম রেজা চৌধুরী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিইউএফএল দীর্ঘদিনের পুরনো হওয়ায় প্রতি বছর যন্ত্রপাতি মেরামতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। এর ওপর গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় বছরের দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, সরকার দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না করলে কারখানায় কর্মরত এক হাজারের বেশি শ্রমিক–কর্মচারীর ভবিষ্যৎ হুমকিতে পড়বে। আমরা দ্রুত কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের দাবি জানাচ্ছি।
পুরো বছর বন্ধ থাকলে ক্ষতি হতে পারে ১২০০ কোটি টাকা : সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় কারখানা বন্ধ থাকায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বিসিআইসির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ থাকায় এখন পর্যন্ত এক মেট্রিক টন সারও উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। পুরো অর্থবছর কারখানা চালু করা না গেলে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে প্রতিষ্ঠানটি। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও প্রতি মাসে বেতন–ভাতা বাবদ প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকাসহ মোট প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকলে এই ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে রাঙ্গাদিয়া এলাকায় জাপানের কারিগরি সহায়তায় নির্মিত সিইউএফএল ১৯৮৭ সালের ২৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের কৃষি ও সার সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত প্রয়োজনীয় গ্যাস দিয়ে সিইউএফএলকে উৎপাদনে ফেরানো জরুরি।












