শনিবার সকাল সাড়ে ৯টা। নগরের বহদ্দারহাট মোড় পুলিশ ফাঁড়ির সামনে চকবাজারমুখী সড়ক। রাস্তার পাশে মানুষের জটলা। কেউ কর্মস্থলে যাবেন, কেউ জরুরি প্রয়োজনে ছুটছেন। গন্তব্য আলাদা, প্রয়োজন আলাদা। তবে সবার অপেক্ষার কারণ এক, গাড়ি। অথচ সড়কে নেই কাঙ্ক্ষিত যানবাহন।
৬–৭ মিনিট অপেক্ষা করার পর রাস্তার মাথা থেকে পরপর দুটি টেম্পো এসে দাঁড়াল। টেম্পোর যাত্রীর নামার আগেই অপেক্ষমাণ যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে উঠে পড়লেন। আর তখনই চালক বললেন, ‘ওঠানামা ১০।’ অর্থাৎ স্বল্প দূরত্ব হলেও ভাড়া গুনতে হবে ১০ টাকা। টেম্পো থেকে নামা দুই যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছ, স্বাভাবিক ভাড়ার তুলনায় তাদের কাছ থেকেও নেওয়া হয়েছে দ্বিগুণ ভাড়া। এর মধ্যে রাস্তার মাথা থেকে আসা যাত্রী শোয়াইব বলেন, ‘১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা নিয়েছে।’ মিতু নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘বাস টার্মিনাল থেকে এসেছি। ৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা দিতে হলো।’
বহদ্দারহাটের এই দৃশ্য শুধু একটি মোড়ের চিত্র নয়, গ্যাস সংকটে নগরজুড়ে তৈরি হওয়া পরিবহন সংকট এবং ভাড়া নৈরাজ্যেরই যেন প্রতিচ্ছবি। গতকাল দিনভর শহরের বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখা গেছে, কর্মব্যস্ত নগর। গন্তব্যে পৌঁছাতে মানুষের তাড়া, কিন্তু সড়কের মোড়ে মোড়ে অপেক্ষার দীর্ঘ সারি। গ্যাস সংকটে কমে গেছে সিএনজিচালিত যানবাহন। পেট্রোল–ডিজেলচালিত গাড়ি চলাচল করলেও তাতে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না যাত্রীর চাপ। আর এই সংকটের সুযোগে কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে বাড়তি ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য। এককথায় গ্যাস সংকটে সিএনজিচালিত গাড়ি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন সড়কে অপেক্ষা বেড়েছে যাত্রীদের। সেই সুযোগে কোথাও কোথাও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও বাড়ছে। সেটা গ্যাসচালিত সব পরিবহনেই।
অবশ্য চালকেরা বলছেন, গ্যাস নিতে গিয়ে বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের। এতে নষ্ট হচ্ছে সময়। ফলে আগে দিনে যে পরিমাণ সময় গাড়ি চালানোর সুযোগ মিলত তা এখন কমে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে তারা অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন।
চালকদের এ বক্তব্য শুনে যাত্রীরা প্রশ্ন তুলছেন, তাদের (চালক) সিএনজি স্টেশনে নষ্ট হওয়া সময়ের মাশুল যাত্রী কেন দেবেন? অবশ্য এ প্রশ্নের উত্তর নেই কারো কাছে।
জানা গেছে, মহেশখালীতে এঙিলারেট পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে বয়লার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বৈদ্যুতিক তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে সামিট টার্মিনালও বন্ধ হয়ে যায়। এতে সংকট তৈরি হয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন সেক্টরেও।এই সংকট ঘিরে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ভাড়া নিয়ে। কিছু গণপরিবহনে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ভাড়া চাওয়ার পাশাপাশি সিএনজিচালিত টেঙিচালকরাও নিচ্ছেন মনগড়া ও অস্বাভাবিক ভাড়া। স্বল্প দূরত্বের যাত্রায়ও ১৫০ টাকা বা তার বেশি দাবি করার অভিযোগ রয়েছে সিএনজি চালকদের বিরুদ্ধে।
আজিম নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী গতকাল সন্ধ্যায় আজাদীকে বলেন, মুরাদপুর থেকে চেরাগী পাহাড় মোড়। এ পথের সিএনজি ভাড়া ৮০ থেকে ১০০ টাকা। কিন্তু আজ ১৮০ টাকা দিয়ে আসতে বাধ্য হলাম। বহদ্দারহাট থেকে বিমানবন্দর যাওয়া নজরুল নামে এক যাত্রী বলেন, ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা ভাড়া নেয় অন্য সময়। আজ ৭০০ টাকা দিলাম।
প্রবর্তক মোড় থেকে সিএনজি টেঙি করে নিউ মার্কেট আসা সেলিম নামে এক যাত্রী বলেন, ১০০ টাকার ভাড়া ১৫০ টাকা নিয়েছে। এটা কোনোভাবে মানা যায় না।
গতকাল আন্দরকিল্লা মোড়ে মুন্না নামে এক যাত্রী বলেন, মদুনাঘাট থেকে রাস্তার মাথা এসেছি লোকাল সিএনজিতে। ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা নিয়েছে। রাস্তার মাথা থেকে ৬ টাকার বাস ভাড়া নিয়েছে ১০ টাকা। বহদ্দারহাট থেকে টেম্পোতে করে আন্দরকিল্লা এসেছি ৮ টাকার ভাড়া ২০ টাকা দিয়ে।
ভাড়া নৈরাজ্যে ভুক্তভোগী নগরবাসী বলছেন, জ্বালানি বা গ্যাস সংকট এ মুহূর্তের বাস্তবতা। কিন্তু সেটাকে অজুহাত করে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় উচিত নয়। গ্যাস সংকটকালে পরিবহন ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে নজরদারি জরুরি।
শাকিল নামে এক ব্যাংকার আজাদীকে বলেন, সংকটকালে পরিবহন ব্যবস্থাপনা সচল রাখার পাশাপাশি ভাড়ার তালিকা মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করতে হবে।












