সমকালের দর্পণ

আত্মহননে মগ্ন একটি জাতি

মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ৪ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কাঠামো একটি একক ভাষাভাষী, একই নৃতাত্ত্বিক জাতিগত পরিচয়ে, একই উত্তরাধিকারে ঋদ্ধ। সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া ধর্মীয় মূল্যবোধেও প্রায় সবাই একই ভাবধারায় উদ্ভাসিত। সাংস্কৃতিক বন্ধনেও অটুট একই বন্ধনে আবদ্ধ। এই পরিচয় দুনিয়ার দেশসমূহের খুব কম দেশেরই ভাগ্যে জুটেছে। এই উপমহাদেশের দেশগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলে বিষয়টি পাঠকের কাছে স্পষ্ট হবে।

বাংলাদেশের জনসমষ্টি তার ঐক্যে, সাম্যে, বোধে আর বিশ্বাসে সুদৃঢ় একটি ভিত্তির উপর ভর করে ভবিষ্যতের পানে মুখ রেখে স্বীয় জীবনমান উন্নয়নে অভিযাত্রী হওয়ার কথা। বর্তমানে এমনটি হচ্ছে না, বরং বোধ, বিশ্বাস আর ঐক্যের আশা ক্রমাগত অপসৃয়মাণ। এ অপসৃয়মাণতার লক্ষণ রাষ্ট্র, সমাজ সকল ক্ষেত্রে প্রকট রূপ ধারণ করেছে। মননশীল পাঠকসমাজ এ বিষয়টি সম্যকভাবে উপলব্ধি করছেন নিশ্চয়ই। এ লেখার শিরোনামকে যথার্থ প্রমাণের জন্য পাঠকদের সামনে নিম্নের আলোচনা প্রয়োজনীয় বলে আমার কাছে অনুভূত হয়েছে।

প্রথমত, আমি যেহেতু সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ সময় কর্মরত ছিলাম, জীবনের সোনালী সময় অনেকটুকুই সামরিক বাহিনীতে কাটিয়েছি, সে কারণে সামরিক বাহিনীর বিষয়টি সর্বাগ্রে আলোচনা করি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সামরিক বাহিনী সবচেয়ে বিতর্কিত হয়েছে, এটি কমবেশি পাঠকরা অবগত আছেন। এটার পিছনে মূল কারণ সামরিক বাহিনী দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে ছাউনিতে ফিরতে আগ্রহী ছিল, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কোনো মহল নির্বাচন অনুষ্ঠানে গড়িমসি করছিল। দ্বিতীয়ত, প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়ার বিষয়। বঙ্গভবনের আলোচনায় যেহেতু প্রফেসর ইউনূস তখনও মামলার আসামি, সেহেতু সেনাপ্রধান অন্য কাউকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করার অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। সম্ভবত এ দুটি বিষয়কে মাথায় রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের সেই সময়ের কিছু অনুরাগী ব্যক্তি সেনাপ্রধানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে গিয়ে পুরো সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস পান। এ অপপ্রয়াস নিয়ে স্বনামধন্য উপস্থাপিকা শারমিন চৌধুরীর অনুষ্ঠান ‘পালস অব পলিটিক্স’–এ ২০২৫–এর জুলাই মাসে আমি একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও প্রদান করেছিলাম। সে অনুষ্ঠানে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এ অপপ্রচারকে আমি বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করার অপচেষ্টা বলে মন্তব্য করেছিলাম। অপপ্রয়াসগুলোর ধরন কেমন ছিল, তা পাঠকদের যদিও মনে থাকার কথা, তবু আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। যেমন, জনৈক ব্যারিস্টার লক্ষ জনতা নিয়ে সেনানিবাস ঘেরাও এবং গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিলাষ ব্যক্ত করেন, আবার ঢাকা শহরে কেউ কেউ মিছিল করেন ‘হাসনাত না ওয়াকার’ স্লোগান দিয়ে, কেউ বলেন সেনাবাহিনীর মাথায় ঘিলু নাই, কেউ বিবৃতি বিলাসে বলেন সামরিক বাহিনীর লোকজন দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে যান, সেখান থেকে গুলি কিনে তা দেশের মানুষের মাথায় মারেন ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রশ্ন হচ্ছে, যারা এসব অপপ্রচারে দুঃসাহসী বা অতিউৎসাহী হয়েছেন, তারা কি একবারও বিবেচনায় নিয়েছেন যে সামরিক বাহিনী একটি জাতির ঐক্য এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক?

এত গেল সামরিক বাহিনীকে বাইরে থেকে হেয় করার অপচেষ্টা। ভিতর থেকেও সামরিক বাহিনীকে কীভাবে ছোট বা অপদস্থ করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, এবার সে প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর বেশ কিছু কর্মকর্তা অবসরোত্তর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা কর্ম উপলক্ষে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে মুষ্টিমেয় দু–একজন প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ে প্রায়ই মন্তব্য করে যাচ্ছেন। এটি সামরিক বাহিনীর জন্য মোটেও অনুকূল কিছু বয়ে আনছে না। এর বাইরে অতীতে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার অতি উৎসাহী কোনো কোনো সদস্যের কর্মকাণ্ডও সামরিক বাহিনীর সুনামের দিক থেকে ইতিবাচক ছিল না। বাহিনীপ্রধানদের কর্মকাণ্ড এঁদের কেউ নিজের অধস্তনের বিরুদ্ধে আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, কেউ কেউ নানা অপকর্মের অভিযোগের শিকার হচ্ছেন। নৈতিকতার মানদণ্ডে এগুলো সামরিক বাহিনীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে যাচ্ছে কেবল।

২৪–এর ৫ আগস্ট ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি পোড়ানো হয়। এই বাড়িটিই আবার ২৫–এর ফেব্রুয়ারি ৫–৬ তারিখে বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হয়। সম্ভবত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সন্ধ্যার সময় যখন বাড়িটি কিছু লোকজন ভাঙায় উন্মত্ত, তখন একদল সেনাসদস্য বেশ কিছু সময় সারিবদ্ধ থেকে সে দৃশ্য অবলোকন করে। এই সেনাসদস্যরা সেদিন সেখানে কার আদেশে কেন গিয়েছিলেন, আবার কেনই বা কার আদেশে ফিরে গিয়েছিলেন, সেটি ভবিষ্যৎ ইতিহাসে হয়তো উন্মোচিত হবে। তবে এই ঘটনার দৃশ্যপট বাহিনীর মনোবল তথা নৈতিকতায় ইতিবাচক কিছুই যোগ করতে পারেনি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি খারাপ দৃষ্টান্ত রেখে গেছে।

রাজনৈতিক অসহনশীলতা : রাজনৈতিক সহনশীলতার চরম এবং অপূর্ব বাক্যটি ব্যক্ত করে গেছেন ফরাসি বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী ভল্টেয়ার। তাঁর কথা “I do not agree with what you have to say, but I will defend to the death your right to say it.” এই বাক্য আসলে ইংরেজ সাহিত্যিক এভলিন বিট্রিস হল–এর। তবে বাক্যটি ফরাসি বিপ্লবে ভল্টেয়ারের মুখে উচ্চারিত হবার পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাক্যটির সরল অর্থ, “তোমার মতের সাথে আমার মিল নাও হতে পারে, তবুও তোমার মতকে তুলে ধরতে আমি জীবনপাত করতেও দ্বিধা করব না।” এ বাক্যের অন্তর্নিহিত অর্থ বিবেচনায় নিলে আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা, অন্তঃসারশূন্যতা উলঙ্গভাবে ফুটে ওঠে। আমাদের রাজনীতিতে বর্তমানে এক ধরনের চরম অসহিষ্ণুতা বিদ্যমান। অতীতে এটা হয়েছে ভোটে অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা বা বিরত রাখার মাধ্যমে। বর্তমানে এটা প্রকট রূপ ধারণ করেছে, ফ্যাসিস্ট আখ্যা প্রদানের মাধ্যমে বাছবিচারহীনভাবে গণহারে হত্যা মামলার আসামি করা, গণগ্রেফতার, ভোটে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা, এলাকাছাড়া করা, চাঁদাবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে। রাজনীতিতে এই অসহিষ্ণুতা বাঙালি জাতিকে একেবারে ভিতর থেকে দুর্বল করে বিপন্নতার এক ভবিষ্যৎ পথে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। একদল আরেক দলের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণতা মহাত্মা গান্ধীর সেই বিখ্যাত উক্তিটিই মনে করিয়ে দেয় “An eye for an eye will only leave the whole world blind.” অর্থ হলো, ‘এক চোখের বদলা নিতে আরেক চোখ উৎপাটন করা হলে অবশেষে দেখা যাবে পুরো পৃথিবীই অন্ধে ভরে গেছে।’ বাংলাদেশের বর্তমান চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে আমার ভয়, এই প্রতিশোধের রাজনীতি আমাদের কি অন্ধত্বের দিকে ধাবিত করে নিয়ে যাচ্ছে?

এই অন্ধত্বের দিকেই যদি ধাবিত না হয়, তবে রাজনীতিবিদরা রাজনীতিকে স্ব স্ব কর্মসূচির বাইরে নিয়ে পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণুতার যাঁতাকলে নিজেরা নিজেদের পিষতেন না। উদাহরণ হিসেবে গত সপ্তাহের উদাহরণ টানা যায়। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অফিস ঘেরাও এবং তিনশর উপরে নেতাকর্মী গ্রেফতার। তাদের ট্যাগ লাগানো হয় তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সদস্য। পরে দেখা গেল, তারা প্রকৃত অর্থে জাসদ নেতাকর্মী। চট্টগ্রামের জাসদ নেতা জসীমউদ্দিন বাবুলের ঘটনাস্থলে উপস্থিতি এবং পুলিশের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে দেওয়া বয়ান তাই প্রমাণ করে। তবে মূল বিষয়, জাসদের ত্যাগী এবং বর্ষীয়ান নেতাদের সেদিন যেভাবে হেনস্তা/অপদস্থ হওয়ার (কিল–ঘুষি) শিকারে পরিণত হতে দেখা গেছে, তা একেবারে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। এই একই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন ক্ষমতায়, তখন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে হয়েছে, আবার আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়, তখন বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এটা কি রাজনৈতিক নেতারা আশা করেন?

এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত এই উপদেশটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য প্রযোজ্য বলে মনে হয় “Therefore whatsoever ye would that men should do unto you, do ye even so unto them.” আরো সরল করে বাইবেলের এই বাক্যটিকে উপস্থাপন করলে দাঁড়ায় “Treat people the way you want them to treat you.” অর্থাৎ তুমি অপরের সাথে এমন আচরণ কর, যেভাবে তুমি প্রত্যাশা কর।

এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিনাবিচারে অনেক ক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণ ছাড়া, এমনকি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কারাগারে আটক রাখার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা যায়। বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তাঁর লেখা ‘যে আদালত জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়’ যা ৩০ সেপ্টেম্বর ২৬ দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ্য, এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে লেখা। তাঁর লেখায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘যে কোনো উপযুক্ত ভিত্তি ছাড়া দায়ের করা মামলাগুলো আরো বেশি ক্ষতিকর। এগুলো অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য চরম অন্যায়, তেমনি বৈধ মামলাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকেও নষ্ট করে।’ প্রসঙ্গক্রমে তিনি আরো উল্লেখ করেছেন,‘ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন করে অনেক অভিযুক্তকে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই এক বছরের বেশি সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছে।’

মূলত এই যে ভিত্তি ছাড়া, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়া দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে রাখা এসব পর্যবেক্ষণ/পর্যালোচনা করে ডেভিড বার্গম্যান তাঁর লেখায় এও উল্লেখ করেছেন,‘সংবিধানের ৪৭(৩) ও ৪৭(ক) অনুচ্ছেদ বাতিল করলেই যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়ে যাবে তা নয়’ কারণ বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনীতিকরণ অত্যন্ত গভীর। উল্লেখ্য, সংবিধানের ৪৭(৩) ও ৪৭(ক) অনুচ্ছেদ নাগরিকের মৌলিক সুরক্ষা কেড়ে নিয়েছে।

ভয় এইখানে। আইনের মাধ্যমে মৌলিক অধিকার হরণ। বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনীতিকরণ অত্যন্ত গভীরতর হওয়া। এসব রাজনীতিবিদদের দ্বারা রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত বা প্রয়োগ হচ্ছে। আখেরে এসবই বাঙালি জাতির বিভক্তিকে গভীরতর করবে এবং আত্মহননের দুর্বিষহ পথকে আরো প্রশস্ত করবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধরোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর
পরবর্তী নিবন্ধরিয়াদে আরামকোর স্থাপনার কাছে আগুন, ধোঁয়া