ক্যাপ্টেন ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরী স্মরণে

মুহাম্মদ মহসীন চৌধুরী | সোমবার , ২৭ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ

ক্যাপ্টেন ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরী। চট্টগ্রামের রাউজান থানাধীন সুলতানপুর গ্রামে ১৯১৪ সালে তাঁর জন্ম । অসাধারণ মেধাবী এই কৃতী শিক্ষার্থী ম্যাট্রিক পাশ করার পর কলকাতার কারমাইকেল মেডিকেল স্কুলে (বর্তমান আর. জি. কর মেডিকেল কলেজ) ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এল এম এফ পাশ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে এসে নিজ গ্রামের পার্শ্ববর্তী গহিরা গ্রামে চিকিৎসা কার্যক্রম আরম্ভ করেন। তাঁর উন্নত প্রণালীর চিকিৎসা এবং দরিদ্র জনসাধারণের প্রতি তাঁর মানবিক আচরণের কারণে তিনি অল্পদিনেই গ্রামবাসীর মন জয় করতে সমর্থ হন। কিছুদিন পর আন্দরকিল্লা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল সংলগ্ন চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুলে প্যাথলজি বিভাগের শিক্ষক পদে তিনি যোগদান করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে তিনি যুদ্ধে যোগদান করেন এবং সামরিক চিকিৎসক হিসেবে বিভিন্ন স্থানে যেমন মিশর, ইতালী এবং সিরিয়ায় বহু প্রখ্যাত চিকিৎসকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। যুদ্ধ শেষে তিনি ক্যাপ্টেন হিসেবে সামরিক চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুলের পূর্ব পদে ফিরে আসেন। চট্টগ্রাম শহরের সিরাজদ্দৌলা রোডে একটি প্যাথলজিক্যাল ল্যাব খুলেন তিনি, সে সময়ে মানসম্মত প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্যে মানুষ তাদের নিজ নিজ চিকিৎসকের পরামর্শে ডা. কামরুজ্জামান এর ক্লিনিকে ছুটে আসত। অর্থ উপার্জন ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরীর মূল লক্ষ্য ছিল না, আর্তমানবতার সেবাই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে সিরাজদ্দৌলা রোডের পার্শ্ববর্তী ফতে আলী মাতবর লেনে তিনি একটি পাকা দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। ঐ বাড়িতেই তিনি সপরিবারে বাস করতেন। অসামপ্রদায়িক নিরহঙ্কার এই মানবদরদী লোকটি মহল্লার আপামর জনসাধারণের শ্রদ্ধা সম্মান আকর্ষণ করতে পেরেছেন।

ডা. ক্যাপ্টেন কামরুজ্জামান চৌধুরী রাজনীতিতেও ছিলেন একজন সক্রিয় কর্মী। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম এম. . আজিজ আহমদ চৌধুরীর সাথে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর একজন বিশ্বস্ত কর্মী হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল সর্বত্র।

দেশের সামাজিক কাজকর্মেও ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। স্থানীয় কদম মোবারক এতিমখানা এবং দারুল উলুম মাদ্রাসার কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবেও তাঁর গঠনমূলক ভূমিকা সর্বজনবিদিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একজন সংগঠক হিসেবেও তিনি দুর্লভ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। কালুরঘাট থেকে তদানীন্তন রেডিও স্টেশনটি মোহরাতে সরিয়ে নেওয়ার অন্যতম কাণ্ডারী মোহরার জনাব হারুনঅররশিদ এবং চক্ষুবিশেষজ্ঞ ডা. আবু জাফর সাহেবকে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন চার পুত্র এবং পাঁচ কন্যা সন্তানের জনক। এদের প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত এবং দেশে বিদেশে স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। এদের মাঝে তাঁর তৃতীয় পুত্র সন্তান অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বিশ্বে বহুল সম্মানিত ‘ইমেরিটাস অধ্যাপক’ উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উপাধিতে ভূষিত প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তাঁর অসাধারণ নেতৃত্ব, কৃতিত্ব, অর্জন ও অবদান স্বীকৃতিস্বরূপ অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের এই ইমেরিটাস অধ্যাপক উপাধি দেওয়া হয়। ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিশ্লেষণ এবং উন্নয়ন অধ্যয়ন’ বিষয়ে দুই যুগের বেশি সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ ও নেতৃস্থানীয় দায়িত্ব পালন করেছেন আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা কামরুন্নেসার বিয়ে হয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত নাট্যকার, বরেণ্য অভিনেতা ও ভাষাসৈনিক শিক্ষাবিদ স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ এর সাথে। জনদরদী চিকিৎসক এবং সমাজসেবী ডা. ক্যাপ্টেন কামরুজ্জামান এর সাথে আমাদের সান্নিধ্যের স্মৃতি সুমধুর ও শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনগরজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদার করা হোক
পরবর্তী নিবন্ধভেষজ চিকিৎসা ও ঔষধি গাছ