১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। তাই দেশজুড়ে এখন বাঁধনহারা উচ্ছ্বাস, উৎসব আর আনন্দের ঢেউ। কেউ গায়ে জড়িয়েছেন জাতীয় পতাকা, কেউ হাতে উড়িয়েছেন সেটি। অনেকের পরনে জাতীয় দলের জার্সি। বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে এমন উৎসবই তো স্বাভাবিক। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর পুরো স্পেনজুড়ে বইছে উল্লাসের স্রোত। আর দলটির তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের শৈশব কেটেছে যে রোকাফোন্দায়, সেই জনপদ এখন পরিণত হয়েছে উৎসবের অন্যতম কেন্দ্রে।
২০১০ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল স্পেন। ১৬ বছর পর আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো তারা। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দারুণ পারফরম্যান্স করেছেন ইয়ামাল। দুই বছর আগে ইউরো জেতা স্প্যানিশ সেনসেশন এবার পেলেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদও। তাই সবচেয়ে বেশি আনন্দ যেন তার জন্ম ও বেড়ে ওঠার জনপদ রোকাফোন্দায়। বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে মাতারোর উপকূলীয় শহর রোকাফোন্দা। শ্রমজীবী ও বহু সংস্কৃতির মানুষের বসবাস এই এলাকায়। তবে তাদের পরিচিতি অনেক সময় নাম দিয়ে নয়, ‘৩০৪’ সংখ্যা দিয়ে। কারণ এটি রোকাফোন্দার পোস্টাল কোড ০৮৩০৪।
বিস্মিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এটাও তো সত্যি, কখনও কখনও মানুষের নাম থাকে না, পরিচয়পত্র হয়ে ওঠে সংখ্যা। যেমন ক্রীতদাস, কিংবা কয়েদী নম্বর। হরহামেশাই মানুষ যেমন নাক সিঁটকে বলে ‘অমুক অঞ্চলের লোক’, বিষয়টা যে তেমনি। ইয়ামালও সেই গোত্রের, যাদের সে অর্থে নাম নেই কিংবা নামহীন; অঞ্চল দিয়ে চেনা হয় যাদের! এখন অবশ্য গল্পটা বদলেছে অনেক। বলা ভালো, বদলে দিয়েছেন ইয়ামাল। স্পেনের হতদরিদ্র জনপদ রোকাফোন্দাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরছেন তিনি। স্পেনের যে অঞ্চলে বেড়ে ওঠার পরিচয় দিতে মানুষ কুণ্ঠাবোধ করে, আড়ষ্ট থাকে। সেটাকেই সবার সামনে উঁচিয়ে ধরছেন এই ফরোয়ার্ড।
মরক্কান বাবা ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনির মায়ের ঘরে স্পেনে জন্ম নেওয়া ইয়ামাল নিজের শেকড় নিয়ে বরাবরই গর্বিত। গোল করার পর তার বিখ্যাত ‘৩০৪’ আঙুলের ইশারা সেই ভালোবাসারই প্রকাশ। এবারের বিশ্বকাপেও রোকাফোন্দা লেখা হেডব্যান্ড পরেছেন তিনি। বুটে ধারণ করেছেন বাবা–মায়ের জন্মভূমির পতাকা। বারবার বলেছেন, ফুটবল বর্ণ ও সামাজিক সমপ্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।
ছয় বছর বয়সে বার্সেলোনার একাডেমি লা মাসিয়ায় যোগ দেন ইয়ামাল। এখন তিনি কাতালান ক্লাবটির তো বটেই, স্পেনেরও অন্যতম বড় তারকা। নিজের শেকড় কখনো ভুলে যাননি তিনি। রোকাফোন্দার মানুষও তাকে এখনো নিজেদের একজন মনে করে। যে মাঠে ছোটবেলায় নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছিলেন ইয়ামাল, সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে তার বিশাল দেয়ালচিত্র। স্থানীয়দের কাছে তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, বরং স্বপ্নপূরণের প্রতীক।
স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ তাই রোকাফোন্দায় অন্য মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে ইয়ামালকে ঘিরেই উচ্ছ্বাস সবচেয়ে বেশি। কারণ এই তরুণই বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তাদের জনপদকে। শুধু রোকাফোন্দা নয়, রাজধানী মাদ্রিদেও নেমে আসে উৎসবের ঢেউ। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে স্পেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতেই হাজারো সমর্থক রাস্তায় নেমে আসেন। শহর থেকে শহরে শুরু হয় বিজয়োৎসব। লাল–সোনালি পতাকায় মোড়া সমর্থকেরা নেচে–গেয়ে মাতিয়ে রাখেন চারপাশ। একসঙ্গে ধ্বনি ওঠে ‘চ্যাম্পিয়ন! চ্যাম্পিয়ন!’ স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে লিখেছেন, আমরাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! আমাদের জাতীয় দল ছিল দুর্দান্ত। ধন্যবাদ, স্পেন!
বার্সেলোনাতেও ছিল একই উন্মাদনা। ইয়ামালসহ এবারের বিশ্বকাপ দলের অনেক খেলোয়াড়ই এই ক্লাবের। শহরটির রাতের আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে আতশবাজির ঝলকানিতে। সৈকতগুলোতে শুরু হয় উদযাপন, আনন্দে কাটে রাত। তবে উৎসবের মধ্যেও ঘটেছে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা। বিলবাওয়ে বড় পর্দায় ম্যাচ সমপ্রচার ব্যাহত করার চেষ্টা করা পাঁচজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ।
বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দের মাঝেই ঘটেছে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনাও। পশ্চিম স্পেনে জয় উদযাপনের সময় একটি ফোয়ারার অংশ ধসে পড়ে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও দুজন। স্থানীয় জরুরি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার ভোরে পর্তুগাল সীমান্তের কাছে সালামানকা প্রদেশের প্রায় ১২ হাজার জনসংখ্যার শহর সিউদাদ রদ্রিগোতে ঘটে দুর্ঘটনাটি। শহরের কেন্দ্রের একটি ফোয়ারার কাছে শত শত মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। তখন ফোয়ারার ওপরের অংশ ভেঙে পড়ে কয়েকজন আহত হন।












