উপাচার্যের অপসারণের দাবির আন্দোলন সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ আন্দোলনকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের চক্রান্ত বলে উল্লেখ করার একদিনের মাথায় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য এল। এদিকে আমরণ অনশনে বসা এক শিক্ষার্থীর জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ঢাকায় ‘প্রতীকী অনশনে’ বসেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক। এছাড়া সংহতি জানিয়ে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের অপসারণ চেয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পাটি। হল প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিপেটার পর উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবি তুলে গতকাল সোমবার ষষ্ঠ দিনের মতো অনশন চলছে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রতিদিনের মতো গতকাল দুপুর ১টায় নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, আমাদের এই যৌক্তিক আন্দোলন সম্পর্কে, দায়িত্বশীল মহলে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর এবং অসত্য তথ্য, উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে করে আমাদের অহিংস আন্দোলনকে ঘিরে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হতে পারে।
আন্দোলন চলার মধ্যে গত শনিবার রাতে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকায় শাবির শিক্ষক প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী ‘এই আন্দোলনে শিক্ষক–শিক্ষার্থী ছাড়া আরও কেউ জড়িত বা ইন্ধন আছে কি–না’ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এর পর রোববার বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও এই আন্দোলনকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের কোনো হস্তক্ষপের বা ইন্ধনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অযোক্তিক এবং অমূলক বলে দাবি করেন। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৬ জানুয়ারি যে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছিল, তার প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি তুলে এবং এখন পর্যন্ত এ আন্দোলন সাধরণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলন। আন্দোলনে সাধরণ শিক্ষার্থীরা সবসমসয় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অনশনকারীদের ওয়াশরুম ব্যবহার, হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া ও আসার প্রক্রিয়াটা আমাদের স্বেচ্ছাসেবীরা সবসময় তাদের মুঠোফোনে ধারণ করে রাখছে। এমতাবস্থায় তাদের অনশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অপ্রত্যাশিত। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আমরা যা দেখছি, একটি পদ আমাদের সবার প্রাণের চেয়ে, আসলে ওই ভাইস চ্যান্সেলরের পদের দাম বেশি মনে হচ্ছে। যেহেতু গণঅনশনের ডাক দিয়েছি, আমরা এখন ওই দিকেই যাব এবং মারা গিয়ে এটি প্রমাণ করব যে, ওই চেয়ারটার দাম আমাদের প্রাণের চেয়ে বেশি! শিক্ষার্থীরা বলেন, যে গুলি চালায়, তাকে চাই না। এটি আমাদের যৌক্তিক দাবি। এ দাবিতে আমাদের শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন করছে।
এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বিকাল পৌনে ৫টায় বলেন, এখন আমাদের অনশনকারীদের মধ্যে হাসপাতালে আছে ১৪ জন; বাকি ১৪ জন আছে ভিসির বাসভবনের সামনে।
এক অনশনকারীর অস্ত্রোপচার : বিডিনিউজ সূত্রে জানা যায়, উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে আমরণ অনশনে বসা এক শিক্ষার্থীর জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহিন শাহিরিয়ার রাতুলের অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচার রোববার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্পন্ন হয়। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নুরুল কাইয়ুম মোহাম্মদ মোরসালিন গতকাল দুপুরে বলেন, রাতুল যখন হাসপাতালে আসেন, তখন মনে হয়েছিল তার অ্যাপেন্ডিসাইটিস। তার পেটের ডান দিকে ব্যথা ছিল, জ্বর ছিল। বেশকিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে আমরা নিশ্চিত হলাম এটা অ্যাপেন্ডিসাইটিস। তিনি বলেন, অ্যাপেন্ডিসাইটিসের লাস্ট স্টেজ ছিল তার। অপারেশন না করালে ব্লাস্ট হয়ে যেত। ব্লাস্ট হওয়ার আগ মুহূর্তে আমরা কেটে বের করেছি। এখন তাকে স্টেপ ডাউন ইউনিটে (এসডিইউ) রাখা হয়েছে। তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত বলা যায়।
সংহতি জানিয়ে ঢাবিতে শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতীকী অনশন : শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ঢাকায় ‘প্রতীকী অনশনে’ বসেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক। গতকাল দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের ব্যানারে অন্তত ১৮ জন শিক্ষক এ অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর একদল নেতা–কর্মীও শিক্ষকদের এই কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে সেখানে অবস্থান করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, আমরা শিক্ষক হিসেবে লজ্জিত। এই শীতের রাতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন পর্যন্ত ১১৬ ঘণ্টা অনশন করেছে, কিন্তু তাদের দাবি মানা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কালক্ষেপণের যে প্রক্রিয়া, এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের অসহিষ্ণু করে তোলার কৌশল নেওয়া হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি দ্রুত মেনে নিয়ে শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবে।
শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান ওয়ার্কার্স পার্টির : শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের অপসারণ চেয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি; একইসঙ্গে উপাচার্য নিয়োগ পদ্ধতি ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছে দলটি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক এই দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটব্যুরো গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের রবার বুলেট, লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড হামলা ছিল ‘অপ্রয়োজনীয়’। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে উপাচার্যসহ প্রশাসনের সার্বিক ব্যর্থতা বলেও বিবৃতি উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন থেকেই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তাই বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিৎ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের সময় উপাচার্যের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নৈতিক বোধ, প্রশাসনিক যোগ্যতা বিচারের চেয়ে রাজনৈতিক দলের আনুগত্যকে প্রাধান্য দেবার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার মান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে; শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের মনেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে, যার ফলশ্রুতিতে সামান্য কারণেই সহিংস ঘটনা ঘটছে। তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্য নিয়োগ পদ্ধতিকেও ঢেলে সাজানো উচিত।














