অস্তিত্বের লড়াই

তৈয়বা জহির আরশি | সোমবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ

সকাল ন‘টায় ঘুম ভাঙলো রত্নার। ঘড়িতে চোখ পড়তেই ধপ্‌ করে উঠে পড়লো সে। কাজের খালা দাঁড়িয়ে আছে চায়ের ট্রে হাতে। দ্রুত বেড–টি খেয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো। কল খুলতেই গরমজল বেরিয়ে এলো। গোসল সেরে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিল সে। আজ পরেছে হালকা নীল রঙা জরির পাড়ের ঢাকাই শাড়ি। একজন বেশ যত্ন করে চুল বেঁধে দিল। খোপার মাঝখানে রুপোর কাঁটা। চোখে কাজল পড়িয়ে দিলো একজনা। গাঢ় লাল লিপিস্টকে অপূর্ব লাগছে তাকে। কী যেন বাদ পড়ে গেল! হুম! একটা নীল রঙা টিপ হলে মন্দ হয় না। মোবাইল ফোন বেজে উঠলে রিসিভ করে কথা বলতে বলতে এসে দাঁড়ালো বারান্দায়। সূর্যের কিরণ মুখে এসে পড়তেই হিরের দুল থেকে আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগলো। তাকে এতোই সুন্দর লাগছে যেন মনে হচ্ছে স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো অপ্সরী। হাতের ঘড়িতে চোখ পড়তেই ইশারা করলো পলাশকে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল পলাশ। দ্রুত নিচে নেমে ক‘জনকে কিছু বললো পলাশ। ফোনে কথা বলতে বলতে ডাইনিং এর দিকে এগিয়ে এলো রত্না। টেবিল ভর্তি খাবার। মৌসুমি ফল সাজানো আছে পাঁচ পদের। মিষ্টি আছে তিন পদের। পলাশ পাশে দাঁড়িয়ে। রত্নার দিকে বাড়িয়ে দিল একখানা লাল রঙা ফাইল। মোবাইল ফোনটি পলাশের হাতে দিয়ে ফাইলে চোখ বুলোতে লাগলো। কাজের খালা পাউরুটিতে মাখন মাখিয়ে রত্নার সামনে একটি প্লেটে রাখলো। সঙ্গে দুটি ডিম সেদ্ধ। মাখন মাখানো পাউরুটি মুখে দেবে.. প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভূত হতে লাগলো রত্নার। চোখ বড় বড় করে তাকালো সে। কেউ একজন তার পেটের ওপর দানবের মত বসে, এক হাত দিয়ে মেয়েটির দুটি হাত শক্ত করে আবদ্ধ করে রেখেছে। আর অপর হাত দিয়ে চেপে ধরলো রত্নার মুখ। অন্ধকার রাত্রি। নিস্তব্ধ শহর। মাঝে মধ্যে সাঁ সাঁ করে দ্রুতগতিতে ছুটে চলছে একদুটো যানবাহন। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মেয়েটির। পা জোড়া প্রচন্ড বেগে ফুটপাতের ওপর ছুঁড়তে লাগলো। এই মুহূর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মনে হতে লাগলো অষ্টাদশী রত্নার। নিয়ন আলোয় দিনমজুর আবুল হোসেনের মুখটি পরিষ্কার দেখতে পেল সে। হায়েনার কুৎসিত ঠোঁট জোড়া এগিয়ে আসছে তার দিকে। দমবন্ধ হয়ে আছে তার। নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে অসহায় রত্না। নিজেকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে ক্লান্ত রত্নার হঠাৎ কী হলো, শরীরের সকল শক্তি এক করে আবুল হোসেনের দুই উরুর মধ্যদেশে মারলো সজোরে লাথি। কলাগাছের মত নেতিয়ে পড়লো পঞ্চাশোর্ধ্ব মাতাল আবুল হোসেন। নিজেকে সরিয়ে নিয়ে উঠে বসলো মেয়েটি। সারা শরীর ধুলোমাখা। এবড়ো থেবড়ো চুল।শেষ সম্বল পড়নের জোড়াতালি দেয়া জামার ছেঁড়া অংশ বাহুবন্ধনী দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। অসম্ভব কাঁপছে আর তীব্র গতিতে নিশ্বাস পড়ছে। অস্তিত্ব বাঁচানোর নিত্য লড়াই করা সদ্য যৌবনা রত্নার বিস্ফারিত চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরুতে চায়। মেয়েটি আবিষ্কার করলো আগুন জ্বলছে তার পেটে। গতদুদিন মুড়িজল খেয়ে থাকলেও গেলো রাতে সেটুকুও জোটেনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকিসের এত বড়াই আমাদের
পরবর্তী নিবন্ধশিক্ষার অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জর্জরিত জাতি