মসজিদ আল্লাহর ঘর, ইসলামি শিক্ষা, সভ্যতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাণকেন্দ্রও। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম মসজিদের মিম্বর থেকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। মিম্বরে বসেই যুদ্ধের পরিকল্পনা সাজানো হতো বিচারিক কার্যক্রমও পরিচালিত হতো এখান থেকে। সে যুগে নারী–পুরুষ, ছোট–বড় সবাই নির্ভয়ে মসজিদে আসতেন। নবীজির মুখনিঃসৃত মূল্যবান নসিহত থেকে নিজেদের জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করতেন। ইবাদত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি মসজিদ ছিল আলোকিত প্রজন্ম গঠনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণস্থল। নবী করিম (সা.) এর যুগে শিশুরা মসজিদে আসত, ঘুরে বেড়াত, ইবাদত শিখত এবং সাহাবিদের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করত। মসজিদ ছিল কচিকাঁচাদের ভালোবাসার জায়গা। কোনো ভয় বা নিষেধাজ্ঞার প্রতিবন্ধকতা ছিল না তাদের।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিশুরা মসজিদে এলে অনেকেই তাদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেন সামান্য দুষ্টুমিতেই ধমক দেন এমনকি কখনো তাড়িয়েও দেন। এতে করে অনেক অভিভাবকই নিজের সন্তানদের সহজে মসজিদে আনতে চান না। ফলে ধীরে ধীরে মসজিদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দূরত্ব তৈরি হয়। অথচ ভবিষ্যতে এই প্রজন্মই উম্মতের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাই তাদের মসজিদমুখী করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। মসজিদমুখী প্রজন্ম গড়তে এবং শিশুদের পদচারণায় মসজিদ মুখরিত রাখতে আমাদের হজরত রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মসজিদ ও নামাজে শিশুদের সঙ্গে তাঁর আচরণ কেমন ছিল তা জানতে হবে। হজরত কাতাদা (রা.) বর্ণিত তিনি বলেন একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের মধ্যে এলেন। হজরত উমামা বিনতে আবুল আস (হজরত জয়নব (রা.) এর মেয়ে) তখন তার কাঁধের ওপর। এই অবস্থায় তিনি নামাজ আরম্ভ করলেন। তিনি রুকুতে গেলে তাকে নামিয়ে রাখতেন আবার উঠে দাঁড়ানোর সময় তাকে তুলে নিতেন। হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) বর্ণিত তিনি বলেন একদিন এশার নামাজে সেজদারত অবস্থায় হজরত রাসুলুল্লাহর (সা.) নাতি হজরত হাসান (রা.) ও হজরত হোসাইন (রা.)এসে তাঁর পিঠে চড়ে বসে। কিন্তু তারা নেমে না যাওয়া পর্র্যন্ত তিনি নিজে তাদের সরাননি ফলে সেজদা দীর্ঘ করেন। নামাজ শেষে তার কাছে দীর্ঘ সেজদার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন আমার নাতিরা আমার পিঠে চড়ে বসেছিল। আমি তাদের বিরক্ত করতে চাইনি। ইসলামি স্কলাররা বলেন নবীযুগে শিশুরা মসজিদে আসত সেখানে তারা খেলত ও উল্লাস করত এবং নবী করিম (সা.) তাদের সঙ্গে শিশুসুলভ ও কোমল আচরণ করতেন। সর্বদা তাদের মসজিদের আসার প্রতি আশান্বিত থাকতেন ও গুরুত্ব দিতেন। কখনো তাদের প্রতি বিরূপ ও বিরক্তিভাব প্রকাশ করতেন না। হাদিসের উপরোক্ত বর্ণনা তারই প্রমাণ বহন করে। শিশুদের মসজিদমুখী করুন। কিছুটা বুঝতে শিখেছে এমন শিশুকে মসজিদে নিয়ে যাওয়া একটি প্রশংসনীয় কাজ। ছেলেবেলা থেকে মসজিদে যাওয়ার অভ্যাস শিশুমনে দারুণ প্রভাব ফেলে। শিশুদের সঠিকভাবে নামাজ শেখানো রাসূল (সা.) এর সুন্নাত। মা–বাবা, শিক্ষক কিংবা অন্য যে কেউ নামাজ পড়ার সময় শিশুদের তা শিখিয়ে দিতে পারেন। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করে বলেন এক রাতে আমি নবীজির পেছনে বাম পাশে নামাজে দাঁড়িয়েছিলাম। তিনি নামাজরত অবস্থায় আমাকে তাঁর হাত দিয়ে টেনে নিজের ডান পাশে দাঁড় করিয়ে দেন।
শুক্রবারের জুমা ছাড়া মসজিদে উল্লেখযোগ্য মুসল্লির দেখা মেলে না। মুসলিম সমাজের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও উদ্বেগের বিষয়। মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে শিশুসহ সব শ্রেণি–পেশার মানুষের মসজিদমুখী করতে নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার। এ ব্যাপারে মসজিদ কমিটি ও সাধারণ মুসল্লিদের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো একান্ত লক্ষণীয়। সাধারণত শিশুরা আনন্দপ্রবণ ও দুরন্ত প্রকৃতির হয়। এ জন্য মসজিদে তাদের দুরন্তপনা ও দুষ্টুমির বিষয়টি সহনশীলতার সঙ্গে নেওয়া। তাদের সঙ্গে এমন কোনো আচরণ না করা যাতে তারা মসজিদে আসতে নিরুৎসাহিত হয়। মসজিদে শিশুবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার কথা ভাবা মসজিদের সঙ্গে শিশুদের সম্পর্ক ধরে রাখতে ও সুদৃঢ় করতে মসজিদকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের আয়োজন করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে–কঠোরতা নয় সহজতা দূরে ঠেলা নয় কাছে টানা বাধা দেওয়া নয় সুযোগ দেওয়া অবহেলা নয় মূল্যায়ন করা নেতিবাচক নয় ইতিবাচক মনোভাবই আমাদের আদর্শ সমাজ উন্নত জাতি ও সমৃদ্ধ দেশ উপহার দিতে পারে। নবী করিম (সা.) এর যুগে শিশুরা মসজিদে আসত, ঘুরে বেড়াত, ইবাদত শিখত এবং সাহাবিদের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করত। মসজিদ ছিল কচিকাঁচাদের ভালোবাসার জায়গা। কোনো ভয় বা নিষেধাজ্ঞার প্রতিবন্ধকতা ছিল না তাদের। কিন্তু আজকের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিশুরা মসজিদে এলে অনেকেই তাদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেন, সামান্য দুষ্টুমিতেই ধমক দেন এমনকি কখনো তাড়িয়েও দেন। এতে করে অনেক অভিভাবকই নিজের সন্তানদের সহজে মসজিদে আনতে চান না। ফলে ধীরে ধীরে মসজিদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দূরত্ব তৈরি হয়। অথচ ভবিষ্যতে এই প্রজন্মই উম্মতের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাই তাদের মসজিদমুখী করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
বাইরের অনেক দেশে শিশুদের মসজিদে আসার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়। এমনকি শিশুদের জন্য মসজিদে খেলনাও রাখা হয়। খেলার ছলে হলেও যেন শিশুদের নামাজ ও কল্যাণকর কাজে অভ্যস্ত করে তোলা যায়। আমাদের দেশেও বেশ কিছু মসজিদে শিশুদের গমনে উৎসাহিত করতে বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে যা খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। প্রত্যেক মসজিদে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। শিশুরা মসজিদে আসুক। নামাজ শিখুক।
আমরা যদি চাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভালো, সচ্চরিত্রবান, নামাজি ও ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন হোক তাহলে তাদের জন্য মসজিদ উন্মুক্ত করে দিতে হবে। উৎসাহ, অভয়, ভালোবাসা দিয়ে ও নানা পরিকল্পনা করে তাদের মসজিদমুখী করতে হবে। তাহলেই গড়ে উঠবে আলোকিত প্রজন্ম।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।













