ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কি আমাদের পরিবেশ দূষণের আরেক বিপদের নাম

অনুপ দাশগুপ্ত | বৃহস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ

আজ আমরা যখন কৃত্রিম মেধার সাহায্যে লিখছি, ছবি তৈরি করছি, তথ্য খুঁজছি, বা আরও দ্রুত ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহার করছি, তখন তার জন্য প্রয়োজনীয় পানি, বিদ্যুৎ, জমি ও পরিবেশগত খরচ বহন করছে কারা? প্রযুক্তিগত উন্নতির সুবিধা পাচ্ছে এক দল মানুষ, আর তার পরিবেশগত মূল্য দিতে বাধ্য হচ্ছে অন্য এক দল এই আশঙ্কাই আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে ডেটা সেন্টার নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কৃত্রিম মেধা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় এই ডেটা সেন্টারের প্রসঙ্গটি প্রায় অনুল্লিখিত থেকে যায়। বাইরে থেকে এগুলো বিশাল গুদামের মতো দেখালেও ভিতরে থাকে শত শত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার, ডেটা স্টোরেজ ডিভাইস, নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা এবং আরও নানা ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্র। কৃত্রিম মেধা, ইমেল, সমাজমাধ্যমসহ অসংখ্য ডিজিটাল পরিষেবা সচল রাখতে এই কেন্দ্রগুলিকে দিনরাত নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চালু রাখতে হয়। এই ডেটা সেন্টারগুলি সম্বন্ধে বৈশ্বিক সংশয় ও আপত্তির পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। এবং সেই আপত্তির কারণ প্রযুক্তিবিরোধী মনোভাব নয়, বরং যে সব দেশে কৃত্রিম মেধার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, সেখানেই তার পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সমপ্রতি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা সংস্থা গ্যালপএর এক রিপোর্ট জানাল, আমেরিকার ৭১% মানুষ নিজেদের এলাকায় নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধী। তাঁদের আশঙ্কা, কৃত্রিম মেধা যে সুবিধা এনে দেবে, তা স্থানীয় মানুষের উপরে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভাব্য দুর্ভোগের তুলনায় যথেষ্ট নয়।

ডেটা সেন্টারকে ঘিরে বিপদের আশঙ্কা কেন? প্রথম কারণ, পানি। কৃত্রিম মেধা পরিচালনার জন্য তৈরি ডেটা সেন্টার বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপাদন করে। সেই তাপ প্রশমিত করতে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ পানির। আয়তন অনুসারে একএকটি ডেটা সেন্টারের দৈনিক পানির চাহিদা ন’লক্ষ লিটার থেকে দেড় কোটি লিটার পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একটি মাঝারি শহরের দৈনিক ব্যবহারের সমান। এই পানি মূলত ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকেই তোলা হয়। ফলে আশপাশের অঞ্চলে দ্রুত পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং পানি সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

দ্বিতীয় কারণ, বিদ্যুৎ। ডেটা সেন্টারের আকার অনুযায়ী দশ মেগাওয়াট থেকে প্রায় এক গিগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের প্রয়োজন হতে পারে। স্থানীয় বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর উপরে তার চাপ পড়ে। কোথাও বিদ্যুতের ঘাটতি, কোথাও উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন, কোথাও আবার নতুন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়। এর খরচও শেষ পর্যন্ত সমাজকেই বহন করতে হয়। উপরন্তু, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই বিপুল বিদ্যুতের বড় অংশ এখনও কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ থেকেই আসে। ফলে ডেটা সেন্টারের কার্বন ফুটপ্রিন্টও ক্রমশ বাড়ছে।

সাধারণত কোনও বৃহৎ শিল্পপ্রকল্পের ফলে স্থানীয় মানুষ পরিবেশগত অসুবিধা মেনে নেন এই আশায় যে, সেখানে কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে সে সম্ভাবনাও ক্ষীণ। বহু হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে তৈরি একটি কেন্দ্র অনেক ক্ষেত্রেই মাত্র ত্রিশচল্লিশ জন স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করে। অর্থাৎ পানি, বিদ্যুৎ ও জমির ব্যবহার স্থানীয়; কিন্তু তার অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় মানুষের হাতে তেমন পৌঁছায় না। স্থানীয় মানুষ পানি হারাবেন, বিদ্যুতের উপরে চাপ বাড়বে, কৃষিজমি হারাবে উৎপাদনক্ষমতা, অথচ উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না এই সমীকরণই আজ ডেটা সেন্টারকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তের মধ্যে কঠিন কাজ করে দিলেও, এর সার্ভারগুলো মারাত্মক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেগুলোকে ঠাণ্ডা রাখতে প্রতি দিন বিপুল পরিমাণের পানির প্রয়োজন হয়। আবার এআইএর চিপ ও হার্ডওয়্যার তৈরির জোগান মেটাতে পৃথিবী জুড়ে মাটি খুঁড়ে বের করা হচ্ছে মূল্যবান খনিজ। এ যেন ‘যে রক্ষক, সেই ভক্ষক’ পরিস্থিতি। পাশাপাশি, নতুন প্রযুক্তির দ্রুত আগমনের ফলে পুরনো যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকছে না। ফলে ইলেকট্রনিক বর্জ্য পরিবেশের উপর এক নতুন বিপর্যয় ডেকে আনছে। সিসা, পারদ, লিথিয়ামের মতো বিপজ্জনক উপাদান মাটি ও পানিতে মিশে পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে। অথচ, উন্নত দেশগুলোর স্বাভাবিক প্রবণতা হল এই সমস্ত ক্ষতিকর বর্জ্য ও কারখানা নিজেদের দেশে না রেখে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে চালান করা। কারণ, সব দেশের যেখানেই এগুলি গড়ে তোলার উদ্যোগ করা হয়েছে, সেখানেই মানুষ এর ক্ষতিকর প্রভাবের কথা মাথায় রেখে আন্দোলনে নেমেছেন। তাঁদের স্লোগান হয়েছে ‘নট ইন মাই ব্যাকইয়ার্ড’ বা ‘আমার উঠোনে নয়’। সেদেশের জনগণ প্রবল শিক্ষিত ও সচেতন। তাই তাদেরকে ধোঁকা দেওয়া সম্ভব নয়।

আমাদের দেশে বিশাল সংখ্যক মানুষের মধ্যে এখনও প্রয়োজনীয় বিজ্ঞানচেতনা গড়ে ওঠেনি। ফলে কোথায় কীভাবে প্রতিবাদ করতে হবে, তা আমরা সঠিক ভাবে শিখিনি। এতে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এখানকার সিংহভাগ জনগণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ক্ষতিকর প্রভাবের সামনে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন। বড় বড় বহুজাতিক সংস্থা কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের লোভ দেখিয়ে এখানে ঢুকে, পানি, বিদ্যুতের মতো সম্পদে ভাগ বসাতে চাইছে, যার প্রয়োজন এখানকার মানুষের সবচেয়ে বেশি। ভয়ের কথা হল, দেশের অধিকাংশ মানুষ যেখানে এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত নন, সেখানে এর মারাত্মক কুফলগুলো তাঁদের মাথার উপর বিষাক্ত তরবারির মতো ঝুলছে। এটিই অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তের মধ্যে সব উত্তর ও তথ্য এনে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এই প্রক্রিয়া কি আদৌ মানবজাতির সমস্যার সমাধান করছে, না কি আরও বড় কোনও সঙ্কটকে ডেকে আনছে তা আজ সকলের গভীর ভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে। আসলে দূরদর্শী খারাপ ফলের দিকে আমাদের কোনো নজর নেই। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরী করতে হবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের পাশাপাশি প্রকৃতি যাতে বিনষ্ট না হয় এবং পানি ও বায়ু যাতে এই অঞ্চলে মানুষের কাজে লাগে তা নিশ্চিত করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারকে কেবল প্রযুক্তিগত বিপ্লব হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে অর্থনীতি, সমাজ, শিক্ষা, শ্রমবাজার, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাপনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। একটি প্রযুক্তি কত দ্রুত কাজ করতে পারে, কত কম সময়ে কত বেশি তথ্য দিতে পারে, কিংবা কত কোটি টাকা আয় করতে পারে উন্নয়নের মূল্যায়নে এসব প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পাশাপাশি আরও কিছু প্রশ্ন রয়েছে, যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেই প্রযুক্তি ব্যবহারে কতখানি পানি ব্যয় হচ্ছে? কতখানি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হচ্ছে? তার উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলে কতটা কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে? পুরনো যন্ত্রপাতি কোথায় যাচ্ছে? খনিজ আহরণের ফলে কোন অঞ্চলের মানুষ, নদী, বন ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্যই তৈরি। কিন্তু সেই প্রযুক্তির সুবিধা যদি এক শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছায়, আর তার পরিবেশগত মূল্য দিতে হয় অন্য শ্রেণির মানুষকে, তবে তাকে নিছক উন্নয়ন বলা যায় না। উন্নয়নের সুফল ও ক্ষতির মধ্যে ন্যায্য ভারসাম্য থাকা জরুরি। যে শহরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশাল ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে, সেখানকার মানুষের পানির অধিকার যদি সংকুচিত হয়, কৃষকের সেচের পানি যদি কমে যায়, কিংবা স্থানীয় পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ে, তাহলে সেই উন্নয়নের সামাজিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে কোনো জাদুকরী শক্তি নয়। এর পেছনে রয়েছে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং ক্ষমতা, সার্ভার, চিপ, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, শীতলীকরণ প্রযুক্তি এবং খনিজসম্পদের দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খল। আমরা যখন একটি প্রশ্ন লিখে মুহূর্তের মধ্যে উত্তর পাই, তখন সেই উত্তরের পেছনে থাকা অবকাঠামোটি সাধারণত আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। অথচ সেই অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য প্রকৃতি থেকে সম্পদ আহরণ করতে হয়। প্রযুক্তির অদৃশ্য পর্দার আড়ালে তাই দৃশ্যমান পৃথিবীর ওপর একটি বাস্তব চাপ তৈরি হয়।

বিশেষ করে ডেটা সেন্টারের শীতলীকরণব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা বাড়ছে। উচ্চক্ষমতার সার্ভার একটানা কাজ করলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন ধরনের কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। কোথাও পানিনির্ভর শীতলীকরণ ব্যবস্থা, কোথাও বায়ুনির্ভর প্রযুক্তি, আবার কোথাও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সব প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব এক নয়। একটি অঞ্চলে যে পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, অন্য অঞ্চলে সেটিই পানিসংকট তৈরি করতে পারে। তাই ডেটা সেন্টার নির্মাণের আগে স্থানীয় জলসম্পদ, আবহাওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বিবেচনা করা আবশ্যক।

আমাদের মতো জলবায়ুঝুঁকিপূর্ণ দেশে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে নদী, খাল, জলাভূমি ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর মানুষের জীবন ও জীবিকা বহুলাংশে নির্ভরশীল। কৃষি, মৎস্য, শিল্প, গৃহস্থালি এবং জনস্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই পানির প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে কোনো বৃহৎ প্রযুক্তি অবকাঠামো যদি বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করে, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি কারখানা বা একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পানির নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের নতুন সমীকরণ ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট
পরবর্তী নিবন্ধবাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচ আজ কম গোল হজমের লক্ষ্য মেয়েদের