পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের নতুন সমীকরণ ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ | বৃহস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৪১ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক মোড় তৈরি হয়েছে সেপ্টেম্বর ২০২৬এর এই সময়ে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ আজ আর কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে লোহিত সাগর থেকে শুরু করে এডেন উপসাগরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে। ইরান ও মার্কিনইসরায়েল সংঘাতের জেরে গত মার্চ মাসে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের পুরো ভরকেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়েছিল লোহিত সাগর রুটে। কিন্তু সামপ্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা এক ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের সর্বশেষ সরকারি নিয়ন্ত্রিত শহর, মোখা, ধুবাব এবং প্রণালির ঠিক মুখে অবস্থিত কৌশলগত পেরিম দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধমনী এবং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ‘বাব আলমান্দেব’ প্রণালির একক নিয়ন্ত্রণ এখন হুথিদের হাতে। হরমুজ ও বাব আলমান্দেব এই দুই জলপথের ওপর ইরান ও তার প্রক্সি অক্ষের যুগপৎ চাপ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক অভূতপূর্ব ও প্রলয়ঙ্কারী সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিশিষ্ট ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক রিয়াদ কাহওয়াজি এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের জন্য একটি ‘অভূতপূর্ব এবং মারাত্মক হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, হরমুজের পর হুথিরা বাব আলমান্দেব ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় তেহরান এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুটি সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’ বা শ্বাসরোধকারী পয়েন্টের চাবিকাঠি নিজের হাতে পেয়ে গেছে। অক্সফোর্ডভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ সংস্থা ‘মোদাদ জিওপলিটিক্স’এর প্রতিষ্ঠাতা ফিরাস মোদাদ মন্তব্য করেছেন যে, এই আঞ্চলিক আধিপত্যের মাধ্যমে হুথিরা এখন নির্ধারণ করবে কোন জাহাজ লোহিত সাগর দিয়ে নিরাপদে পার হবে আর কোনটি হবে আক্রান্ত। হুথি নেতা আবদুল মালিক আলহুথি সমপ্রতি এক টেলিভিশন ভাষণে হুশিয়ারি দিয়েছেন, ‘তাদের আঙুল এখন ট্রিগারে রয়েছে’ এবং সঠিক সময়ে তারা বাব আলমান্দেব পুরোপুরি অবরুদ্ধ করতে দ্বিধা করবে না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর ইরানের একটি সুপরিকল্পিত তিনস্তর বিশিষ্ট চাপের অংশ, যা ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের চেয়েও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ইয়েমেনমিশরইরাকসৌদি আরবজর্দানবাহরাইনের নতুন সমীকরণ: লোহিত সাগরের এই নতুন সমীকরণে ওই অঞ্চলের প্রতিটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি দেশের বর্তমান অবস্থান এবং এই সংকটের প্রভাবে এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি : ইয়েমেনের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সৌদিসমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মারাত্মক কোণঠাসা। হুথিরা এখন কেবল পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং উপকূলীয় উচ্চভূমির ভৌগোলিক সুবিধা নিয়ে সরাসরি এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরের নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা সৌদি আরবের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের নীতি গ্রহণ করেছে, যাকে তারা বলছে “অবরোধের বদলে অবরোধ”।

বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এবং এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জিএর সামপ্রতিক পূর্বাভাসগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হরমুজ ও বাব আলমান্দেব উভয় পথ একসঙ্গে অবরুদ্ধ হওয়ার অর্থ হলো বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২৫ শতাংশ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর ফলে বিশ্ববাজারের অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির একটি রিয়েলটাইম ট্র্যাকার দেখাচ্ছে যে, এই যুদ্ধের কারণে কেবল আমেরিকানদেরই জ্বালানি তেলের পেছনে অতিরিক্ত ১০২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে।

বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এখন লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত অর্থাৎ ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এই বিকল্প রুটের কারণে প্রতিটি চালানের ট্রানজিট সময় ১০ থেকে ১৪ দিন বেড়ে গেছে, যা ফ্রেইট ও ইন্সুরেন্স বা বীমা খরচকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি প্রথমবারের মতো তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রক্ষেপণ সংশোধন করে জানিয়েছে যে, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদও মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন যুদ্ধপূর্বাবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।

সংকট উত্তরণের পন্থা ও কৌশলগত সুপারিশ : এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে গতানুগতিক সামরিক পন্থার বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত ও বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে: . উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কেবল সামরিক পাহারার ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। হরমুজ ও বাব আলমান্দেবের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পাইপলাইন নেটওয়ার্ক এবং স্থলপথের লজিস্টিক করিডোর দ্রুত সমপ্রসারণ করতে হবে। ওমানের সালালাহ বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের মতো পারস্য উপসাগরের বাইরের বন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সরাসরি ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে চোকপয়েন্টগুলোর কৌশলগত ব্ল্যাকমেইল করার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

. এই সংকটের মুখে ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে সৌদি আরব, মিশর, তুরস্ক এবং পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘রিয়াদ কোয়াড’ নামক একটি নব্য কূটনৈতিক ও সামরিক অক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় গঠিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’এর অধীনে সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সেক্রেটারিয়েট স্থাপন করা হয়েছে, যার প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল হয়েছেন একজন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা। এই জোটের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। পশ্চিমা শক্তির ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে এই আঞ্চলিক মধ্যমশক্তির সমন্বয়ে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি।

. ইরাকের অভ্যন্তরে সক্রিয় মিলিশিয়া গ্রুপগুলোকে নিয়ন্ত্রণে বাগদাদ সরকারকে বাধ্য করতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক কূটনীতি ব্যবহার করতে হবে। অন্যদিকে, ইয়েমেনে হুথিদের ওপর কেবল বিমান হামলা চালিয়ে যে তাদের দমানো যাবে না, তা গত কয়েক বছরের মার্কিন অভিযান ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। তাই হুথিদের সঙ্গে একটি টেকসই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতায় আসার জন্য ওমান বা অন্য কোনো নিরপেক্ষ দেশের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক চ্যানেল খোলা রাখতে হবে, যেখানে হুথিদের অর্থনৈতিক ছাড়ের বিনিময়ে সমুদ্রপথের নিরাপত্তার গ্যারান্টি আদায় করা সম্ভব।

পারস্য উপসাগরের যুদ্ধ আজ বাব আলমান্দেবের ঢেউয়ে আছড়ে পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির শ্বাসরোধ করতে উদ্যত। ইয়েমেন থেকে বাহরাইন পর্যন্ত বিস্তৃত এই সংকটের কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই। বিশ্বকে যদি একটি দীর্ঘস্থায়ী মন্দা এবং জ্বালানি হাহাকার থেকে বাঁচাতে হয়, তবে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে এখনই ‘রিয়াদ কোয়াড’এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে সামুদ্রিক করিডোরগুলোর যৌথ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করবে।

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাঠ প্রতিক্রিয়া : কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘আমাদের নেই কোনো ভয়’
পরবর্তী নিবন্ধডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কি আমাদের পরিবেশ দূষণের আরেক বিপদের নাম