সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থায় জনসাধারণের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও ঝুঁকিমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। গণপরিবহণে ব্যবহৃত প্রতিটি মোটরযানের নির্মাণ, বডি, উচ্চতা, প্রস্থ, দৈর্ঘ্য, আসন বিন্যাস, হুইলবেইজ, ওভারহ্যাং, ভারসাম্য, ব্রেকিং ব্যবস্থা এবং অন্যান্য কারিগরি বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত মানদণ্ড ও টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা যাত্রী ও অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীর জীবন নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। রেজিস্ট্রেশনের সময় মোটরযানটি যে অবস্থা, বডি, আসন বিন্যাস ও কারিগরি বৈশিষ্টসহ বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট মোটরযান পরিদর্শকের সরেজমিন পরিদর্শন ও সুপারিশের ভিত্তিতে যে বৈশিষ্ট্যের ওপর মোটরযানটি নিবন্ধিত হয়, পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত সেই মোটরযানের কাঠামোগত বা কারিগরি বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সমপ্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোনো কোনো মালিক, আমদানিকারক ও বডি সংযোজনকারী বা গণপরিবহণ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর বাণিজ্যিক সুবিধা, অধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহণ বা অধিক আয় অর্জনের উদ্দেশ্যে অনুমোদিত নকশা ও কারিগরি বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তে নিজস্ব উদ্যোগে মোটরযানের বডি পরিবর্তন, উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত তলা সংযোজন, আসন সংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তন এবং অন্যান্য অননুমোদিত কাঠামোগত পরিবর্তন করে সড়কে গণপরিবহণ পরিচালনা করছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮–এর ধারা ২০(১)(গ) অনুযায়ী রেজিস্ট্রিকৃত মোটরযানের কোনো কারিগরি, অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক পরিবর্তনের সময় মোটরযান কর্তৃপক্ষের নিকট প্রদর্শন করতে হয়। একই আইনের ধারা ৩২(৩) অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত কারিগরী বিনির্দেশ বা টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মোটরযানের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, আসন বিন্যাস, হুইলবেইজ, রিয়ার ওভারহ্যাং, ফ্রন্ট ওভারহ্যাং, সাইড ওভারহ্যাং, চাকার আকৃতি, প্রকৃতি বা অবস্থা, ব্রেক, স্টিয়ারিং গিয়ার, নিরাপত্তা কাচ, সংকেত প্রদানকারী লাইট ও রিফ্লেক্টরসহ নির্ধারিত অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা যায় না।
এছাড়া ধারা ৩২(৪) অনুযায়ী রেজিস্ট্রিকৃত মোটরযানের কোনো কারিগরি, অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনুমোদন গ্রহণ করা আবশ্যক। উক্ত আইনের ধারা ৪০–এর বিধান এবং সংশ্লিষ্ট দণ্ডবিধান অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত মোটরযানের কারিগরি বিনির্দেশ অমান্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে, বিআরটিএর নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বাসসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির মোটরযানের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারক বিআরটিএ কর্তৃক অনুমোদিত বডি ও আসন ব্যবস্থার স্পেসিফিকেশন সম্বলিত ড্রয়িং দাখিলের বিধান রয়েছে। অতএব নিবন্ধনের সময় অনুমোদিত বডি ও আসন বিন্যাস পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। কোনো রেজিস্ট্রেশনকৃত মোটরযানের মূল বডি, উচ্চতা, প্রস্থ, দৈর্ঘ্য, আসন বিন্যাস, হুইলবেইজ, ওভারহ্যাং, চ্যাসিস বা অন্যান্য কারিগরি বৈশিষ্ট্য কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ব্যতীত পরিবর্তন করা যাবে না। কোনো মোটরযানের বডি বা কারিগরি বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন প্রয়োজন হলে পরিবর্তনের পূর্বেই সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ সার্কেলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সরেজমিন পরিদর্শন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তিত অবস্থায় মোটরযানটি সড়কে চালানো যাবে না।
বাণিজ্যিক স্বার্থ, অধিক যাত্রী পরিবহন, অধিক আয় বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার অজুহাতে অনুমোদিত কারিগরি স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন করা যাবে না। বডি সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ কোনো মোটরযানে বিআরটিএ কর্তৃক অনুমোদিত নকশা ও স্পেসিফিকেশনের বাইরে কোনো বডি, অতিরিক্ত তলা, আসন বা কাঠামো সংযোজন করলে তার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও মোটরযানের মালিক উভয়ের ওপর বর্তাবে।
জনসাধারণের জীবন ও নিরাপত্তা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি মোটরযানকে যে কারিগরি মান, নকশা, বডি, উচ্চতা, আসন বিন্যাস ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে রেজিস্ট্রেশন ও চলাচলের উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, পরবর্তীতে ব্যক্তিগত ইচ্ছা, ব্যবসায়িক সুবিধা বা অধিক যাত্রী পরিবহণের উদ্দেশ্যে তার মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করে সড়কে পরিচালনা করা শুধু আইন ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার পরিপন্থী নয়, এটি সড়ক ব্যবহারকারীদের জীবনকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়ার শামিল।













