চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যু দুটোই বাড়ছে। চলতি সেপ্টেম্বরের গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৯ জন মারা গেছেন। অথচ আগের ৮ মাসে মারা গেছেন ৫ জন। এছাড়া আগের ৮ মাসে মোট আক্রান্ত ছিল ২ হাজার ৩৬ জন। এই ১৭ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৪ জন। অর্থাৎ গড়ে ৬৯ জন করে। তবে আমাদের দেশে জুন–জুলাই থেকে ডেঙ্গু বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সেপ্টেম্বর–অক্টোবর থেকে ডেঙ্গু বাড়ার হার তুলনামূলকভাবে কমে আসতো। এবার জুন–জুলাইয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী খুব বেশি ছিল না। আগস্ট থেকে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকে। চলতি সেপ্টেম্বরে সেটি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এই ধারা অক্টোবরেও চলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন প্রায় থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া রয়েছে ভ্যাপসা গরম। এমন আবহাওয়া ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশার বংশবিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া যত্রতত্র ডাবের খোসা, গাড়ি টায়ার ও বাসা বাড়ির ছাদে ফুলের টবে পানি জমে সেখান থেকে মশার বংশবিস্তার হয়।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ২২০ জন। এছাড়া মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের। এদিকে গতকাল সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ৯৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত চিকিৎসা নিচ্ছেন। এরমধ্যে গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৭ জন, ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে ৭ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১২ জন, চট্টগ্রাম সিএমএইচ হাসপাতালে ৩ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৮ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৬ জন।
অপরদিকে চট্টগ্রামের উপজেলায় বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পার্শ্ববর্তী সীতাকুণ্ডের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। উপজেলার মোট ১ হাজার ৪৩০ জন ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে সীতাকুণ্ডে আক্রান্ত ৪২৭ জন। এরপরের অবস্থানে রয়েছে কর্ণফুলী। কর্ণফুলীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২১২ জন। এছাড়া বাঁশখালীতে ১০৭ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ১০৭ জন, রাউজানে ৭৮ জন, আনোয়ারায় ৭৫ জন, পটিয়ায় ৭১ জন, সাতকাানিয়ায় ৬৯ জন, লোহাগাড়ায় ৫৪ জন, বোয়ালখালীতে ৫৪ জন, মীরাসরাইয়ে ৪৫ জন, হাটহাজারীতে ৪৩ জন, চন্দনাইশে ৪১ জন, ফটিকছড়িতে ৩১ জন এবং সন্দ্বীপে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামে বর্তমানে কখনো মাঝারি ও কখনো থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিভিন্ন জায়গায় স্বচ্ছ পানি জমছে। বিশেষ করে ফুলের টব ও ডাবের খোসা, গাড়ির টায়ারসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত বস্তুতে পানি জমার কারণে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার প্রজননে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীও বাড়ছে। তাই সবাইকে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখাসহ কোথাও যাতে তিনদিনের বেশি পানি না জমে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এছাড়া দিনের বেলায়ও মশারি টানাতে হবে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর মূল চিকিৎসা হচ্ছে ফ্লুইড ম্যানেজম্যান্ট। অনেক অনেক রোগী এনএসওয়ান রিপোর্ট হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাচ্ছেন। এটির আসলে কোনো দরকার নাই। ডেঙ্গুর প্ল্যাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে তখন ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়। তখন ক্রিটিক্যাল কেয়ার ম্যানেজম্যান্টের প্রয়োজন পড়ে। আবার প্ল্যাটিলেট কমা শুরু হয় জ্বর কমে যাওয়ার পর পর। তখন শারীরিক কিছু অসুবিধা দেখা দেয়। ওই সময় হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্ল্যাটিলেট নিয়ে আতঙ্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আসলে প্ল্যাটিলেট যখন বাড়া শুরু হয় তখন দ্রুতই বাড়ে। কাজেই ডেঙ্গু জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, এখন প্রায় প্রতিদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হওয়ার কারণে পানি জমে যাচ্ছে। ফলে এসব পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মশক নিধনে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
উল্লেখ্য, গত বছর ২০২৫ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মারা যান ২৭ জন। এছাড়া ২০২৪ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা যান ৪৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৪ হাজার ৮৭ জন। এরমধ্যে মারা যান ১০৭ জন এবং ২০২২ সালে মোট আক্রান্ত ৫ হাজার ৪৪৫ জনের মধ্যে মারা যান ৪১ জন।













