চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে নগরীর পরিচিত কলেজগুলোতে তীব্র চাপ; অন্যদিকে মফস্বলের অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। বুধবার রাতে প্রকাশিত তালিকায় প্রথম ধাপে চট্টগ্রাম বোর্ডে আবেদন করেও আসন পায়নি ৫ হাজার ৯৫০ জন শিক্ষার্থী। বোর্ডের ৫ জেলার কলেজগুলোতে থাকা ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৪৯ আসনের বিপরীতে নির্বাচিত ৮০ হাজার ২৯০ শিক্ষার্থী। ৭১ হাজার ৩৫৯ আসনে কোনো শিক্ষার্থী নেই। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রথম ধাপের ফল বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রামে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থায় তীব্র বৈপরীত্য পাওয়া গেছে বলেও বোর্ডের কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।
সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রথম ধাপে আবেদন করেছেন ৮৬ হাজার ২৪০ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৮০ হাজার ২৯০ জন কোনো না কোনো কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথম ধাপে আবেদন করেও কলেজে আসন পাননি ৫ হাজার ৯৫০ জন। অন্যদিকে বোর্ডের একাদশ শ্রেণিতে মোট আসন রয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৪৯টি।
বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রথম ধাপে আবেদনকারীদের আসন দেওয়ার পরও বহু কলেজে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকবে। পরবর্তী ধাপের আবেদন, মাইগ্রেশন এবং ভর্তি কার্যক্রম শেষে কি পরিমাণ আসন খালি থাকবে তা নিশ্চিত হওয়া যাবে বলেও বোর্ড সূত্র জানায়। তবে বহু কলেজ যে শিক্ষার্থী সংকটে ভুগবে তা নিশ্চিত– এমনটা মন্তব্য করেন তারা। চলতি বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন। একাদশে ভর্তির জন্য বোর্ডের কলেজগুলোতে আসন ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৪৯টি। পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট আসনের তুলনায় ৭৪ হাজারের বেশি কম।
শিক্ষার্থী সংকটের মাঝে নগরীর কলেজগুলো ভালো অবস্থানে রয়েছে। জিপিএ–৫ পাওয়া এবং ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশের লক্ষ্য নগরীর সরকারি কলেজগুলো। কিন্তু এসব কলেজে আসন চাহিদার তুলনায় বেশ সীমিত। নগরীর আটটি সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে মোট আসন প্রায় ১০ হাজার ১০০টি। এর বিপরীতে শুধু চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডেই এবার জিপিএ–৫ পেয়েছেন ৯ হাজার ৬৯৮ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৫ পেয়েছেন ৮ হাজার ৩০২ জন। নগরীর আট সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের আসন মাত্র ৩ হাজার ৫৯০টি। এতে করে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশের জন্যও পছন্দের সরকারি কলেজে ভর্তির সুযোগ জুটছে না।
একাদশে ভর্তির আবেদনের দিক থেকে দেশের শীর্ষ ১০ কলেজের তালিকায় অষ্টম অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ। ২ হাজার ৩০০ আসনের বিপরীতে কলেজটিতে আবেদন পড়েছে ২০ হাজার ৮৫৫টি। প্রতি আসনের বিপরীতে গড়ে প্রায় নয়জন শিক্ষার্থী আবেদন করেছেন।
নগরীর সরকারি কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতা সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞান বিভাগে। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক–তিন বিভাগেই আসন রয়েছে। সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে একাদশে মোট আসন ১ হাজার ৭২৫টি। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ১ হাজার ৪০টি, সরকারি মহিলা কলেজে ১ হাজার ৪০০টি, বাকলিয়া সরকারি কলেজে ১ হাজার ৪৩৫টি, সরকারি কমার্স কলেজে ৯৭০টি, চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১ হাজার ৫০টি এবং চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৩০০টি।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম কলেজ ও সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের পছন্দ সরকারি কমার্স কলেজ। তুলনামূলক কম খরচ, দীর্ঘদিনের সুনাম, ভালো ফলাফল, অভিজ্ঞ শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে সরকারি কলেজগুলোর প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি বলেও বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এবার বোর্ডের মোট আসন গত বছরের তুলনায় ১৭ হাজার ৮৭৫টি কমানো হয়েছে। গত বছর একাদশে আসন ছিল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৪টি। এবার তা কমিয়ে ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৪৯টি করা হয়েছে। বোর্ড সূত্র জানায়, আগের বছরগুলোর ভর্তি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যেসব কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি কম হয়েছে অথবা শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে আসন পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এ বছর পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ জন। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন। গত কয়েক বছরের তুলনায় পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী সংকট প্রকট হয়ে উঠবে। বিশেষ করে মফস্বলের কলেজগুলোতে এ সংকট বেশি প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত বছরও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন পাঁচ জেলায় একাদশে ভর্তির জন্য বিপুলসংখ্যক আসন খালি ছিল।
এবারের প্রথম ধাপে সারা দেশে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন শিক্ষার্থী একাদশে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ জন প্রথম ধাপে কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানে আসন পেয়েছেন। কিন্তু ১৪ হাজার ৪১৫ জন আবেদন করেও কোনো প্রতিষ্ঠান পাননি। তাদের মধ্যে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থী রয়েছেন ২ হাজার ২০৫ জন।
চট্টগ্রাম বোর্ডেও ৫ হাজার ৯৫০জন শিক্ষার্থী আসন পাননি। তাদের অনেকেই পছন্দের কলেজের তালিকা সীমিত রাখায় প্রথম ধাপে কোনো প্রতিষ্ঠান পাননি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পরবর্তী ধাপে তাদের আবার আবেদনের সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডও একাধিক ধাপে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে বোর্ড সূত্র জানিয়েছে।
একাদশে ভর্তির এই প্রক্রিয়ায় কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল, শিক্ষার্থীর পছন্দক্রম এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোটা বিবেচনা করে কেন্দ্রীয়ভাবে কলেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী সর্বনিম্ন পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১০টি প্রতিষ্ঠান পছন্দক্রমে রাখতে পেরেছেন। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় নীতিমালা অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে।
বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের আজ ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার মধ্যে ভর্তি নিশ্চায়ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিশ্চায়ন না করলে নির্বাচন ও আবেদন বাতিল হয়ে যাবে। পছন্দক্রম অনুযায়ী মাইগ্রেশনের ফল প্রকাশ করা হবে আগামীকাল রাত ৮টায়। ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম চলবে। পবিত্র ফাতেহা–ই–ইয়াজদাহম উপলক্ষ্যে ২৩ সেপ্টেম্বর দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকায় একাদশের ক্লাস শুরু হবে ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে। যারা প্রথম ধাপে কলেজ পাননি কিংবা আবেদন করতে পারেননি, তাদের জন্য পরবর্তী ধাপে আবার আবেদনের সুযোগ থাকবে।













