আমার গল্পের কুকুরটার কোনো নাম ছিলনা। রাস্তার কুকুরদের কোনো নাম হয় না। তবে গ্রাম অঞ্চলে মেয়ে কুকুরদের খেঁকি বলেই সম্বোধন করা হয়। পৃথিবী যখন স্বল্প জনসংখ্যা নিয়ে আবর্তিত হত, তখন বোধহয় এই কুকুরদের নিজস্ব বসতিপূর্ণ নিদিষ্ট এলাকা ছিল, খাদ্যশৃঙ্খল ছিল। কিন্তু ক্রমে ক্রমে আমাদের পূর্বপুরুষ সমস্ত ভূখণ্ড দখল করে এদের প্রজাতিকে যাযাবর করে ছেড়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় আমার গল্পের খেঁকিটাও গ্রামে যাযাবরের মতো বাস করত। আশ্বিন পেরোতেই খেঁকিটা একগাদা বাচ্চা পেটে টো টো করে ঘুরে বেড়াত। তার খাদ্যের কোনো নিদিষ্ট যোগান ছিলনা। বেওয়ারিশ তাড়া খাওয়া খেঁকি খাবারের সন্ধানে সারাদিন কাটে। কেউ দয়া করে সামান্য উচ্ছিষ্ট পর্যন্ত দেয় না। নিরুপায় পশু ক্ষুধার আগুন পেটে মানুষের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে কখনো কখনো বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। মানুষের ভাষায় এটা চুরি। দিনের আলোয় যা অসম্ভব, রাতে ঘুমন্ত ঘরে ঢুকে পড়া সহজ। কিন্তু রাতের বেলা সবাই খাবার নিরাপদে রেখেই ঘুমায়। তারই ভেতর দিয়ে খেঁকিটা লড়ে যায়। নিজেরটুকুই মেলা ভার, সেখানে এখন কিছু আপদ এসে জুটেছে পেটে। সে রোজ সকালে রাস্তার মোড়ে বড় মুদি দোকানটার সামনে মুখ উঁচু করে বসে থাকে। কতশত মানুষ কতকিছু খায়। ফ্যালফ্যাল চাহনিতে নীরব ধৈর্যে সে বসে রয়। প্রত্যেকটা বিস্কুটের প্যাকেট যখন মানুষ ফেলে দেয়, প্রত্যেকবার সেটা মুখে নিয়ে খেঁকিটা একটু দূরে যেয়ে দাঁড়ায়। নিরন্তর কিছু একটা খুঁজে যায়, কিন্তু পায় না। তবুও সে দিনের পর দিন বিশ্বাস করে যায় প্রত্যেকটা মানুষকে, প্রত্যেকটা খালি প্যাকেটকে। দিন গড়ায়, খেঁকিটার পেট আরও বড় হয়। আরো ক্ষিদে বেড়ে যায়। আচমকা গ্রামে কারো বিয়ের মহাভোজ আরম্ভ হয়। সব বাড়ির হাঁড়ির খবর ওর জানা থাকে। অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকেই শুরু হয় রান্নার তোড়জোড়। সবাই আসার আগেই সে মুখ নিচু করে চলে আসে। নিরাপদ একটা জায়গা বুঝে বসে পড়ে। শতশত মানুষ ভিড় করে। ঈশ্বরের নামে আহার গ্রহণ শুরু হয় অতিসত্ত্বর। তরকারির কড়া ঘ্রাণে ম ম করে ক্ষুধার্ত বাতাস। গোটা দুটো বড় ড্রাম ভরে যায় মাছের কাঁটা আর মাংসের হাড়ে। চোখভরা ক্ষিধে নিয়ে খেঁকিটা অপলক তাকিয়ে থাকে ড্রামের দিকে। সাহস করে পেট নাড়তে–নাড়তে খানিকটা এগিয়েও আসে। কেউ একজন সপাটে দুম করে বাড়ি বসিয়ে দেয় খেঁকিটার মাজায়। কাউ–কাউ করে যন্ত্রণায় ধনুকের মতো কুঁকড়ে ওঠে শরীর। গোঙাতে গোঙাতে আরও নিরাপদ জায়গা খুঁজে নেয় সে। অনুষ্ঠানের মাঙ্গলিক শঙ্খধ্বনির ঝাঁঝালো সুরে সে গোঙানির শব্দ মিশে যায় আর্শীবাদের বাতাসে। সবকিছু শেষ হয়ে যায়। কয়েকজন মানুষ উচ্ছিষ্টের ড্রাম ঘাড়ে নিয়ে চলে যায় নদীর পাড়ে। পেছনে পেছনে ছুটে যায় সেও। ঝপাৎ শব্দে উচ্ছিষ্টগুলো ছুঁড়ে দেয় নদীর জোয়ারে। সেও নেমে পড়ে খরস্রোতে। বৃথা চেষ্টা একসময় ঠিকই থেমে যায়। স্রোতের দিকে নির্বাক তাকিয়ে রয় সে। ওপারের জঙ্গলকে অজানা কারণে ভীষণ ভয় পায় সে। তারপর নীরবতা ভেঙে ফিরে যায় রোজকার ঘরের আনাচে–কানাচে। আরও দিন যায়। সময় ঘনায় দুঃস্বপ্নের। বাচ্চা প্রসবের সময় হয়ে আসে। দিনরাত সে খুঁজে ফেরে একটা নিরাপদ জায়গা। যেখানে অন্তত বৃষ্টির ফোঁটা পড়বে না। কারই বা এমন মুনাফাহীন ঘরের কোনটুকু এই আপদের জন্য ফেলে রাখার অবকাশ আছে! তবুও শেষ পর্যন্ত একটা জায়গা সে খুঁজে নেয়ই। তারপর একদিন কোনো এক বিষন্ন রাতে পাঁচ–সাতটা আপদের জন্ম হয়। জন্মের পরপরই বাচ্চার মমতা রেখে সে বেরিয়ে পড়ে খাবারের খোঁজে। দোকানের সামনে নতুন একটা চেহারা নিয়ে মুখ পাতে। পিঠে লাঠির বাড়ি খায়। গোঙানির শব্দ রোজ মিশে যায় প্রহরে–প্রহরে। বাচ্চাগুলো একটু একটু করে অনাদরে বেড়ে ওঠে। রোজ বাচ্চাগুলো ছোট্ট ঘরের নিরাপদ ফাঁক দিয়ে বাইরের অনিরাপদ পথের দিকে ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। চাহনি প্রায়ই দীর্ঘ হয়। কিছুদিন পর পেট আর দুধে ভরতে চায় না। তারপর খেঁকিটার পেছনে পেছনে জনজীবনের অভিশাপ হয়ে দুর্ভিক্ষের কাকের মতো রাস্তায় ঘুরতে থাকে বাচ্চাগুলো। তারাও ছোট্ট ছোট্ট মুখ নিয়ে দাঁড়ায় দোকানের সামনে। মানুষের সন্তানেরা রোজ টিফিনে ভিড় জমায়। হরেক রকম বিস্কুট, ক্যাটবেরি, চকলেটের খালি প্যাকেটে ভরে ওঠে দোকানের বারান্দা। খালি বিস্কুটের প্যাকেট চাটতে চাটতে অসীম ধৈর্য্য তৈরি হয় ওদের। সারাদিন ওরা পৃথিবী দেখে। আকাশ–বাতাস, নদীর পাড়, রাস্তা,বাড়ি, মানুষ, খালি বিস্কুটের প্যাকেট। দিন শেষ খেঁকিটার শুকনো দুধের বোঁটা ক্ষিপ্ত গতিতে চুষতে থাকে। ভাগ্যিস পাঁজরের রক্ত দুধের বোঁটা দিয়ে বেরোতে পারে না। এমন দুর্বিষহ সময়ে বাচ্চাগুলো যখন অন্ধকারঘেরা খিদের রাজ্যে সময় গোনে, তখন খেঁকিটা কোথা থেকে মরা–পচাগলা একটা প্রাণীর দেহ সামনে এনে ফেলে। বাচ্চারা সেটা খুবলে খুবলে খায়। তারপর ভরা পেটে খানিকটা সময় খেলা করে বেড়ায়। পরদিন আবার শুরু হয় মরা–পচাগলা দেহের খোঁজ। এর মধ্যে কিছু ভদ্র সুশীল মানুষ আসে। ভালো রং আর ভরাট স্বাস্থ্যবান একটা বাচ্চা বেছে নেয়। পেছনের পা দুটো বাম হাত দিয়ে উঁচু করে ধরে। মদ্দা বাচ্চা পেলে মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে গলায় শেকল পরায়। খেঁকিটা বিনা বাধায় শেষবার ওদের মুখগুলো দেখে নেয়। এভাবেই কিছু আপদ বিদেয় হয়। পড়ে থাকে খেঁকিগুলো। খেঁকিটা সেগুলো আগলে রাখতে চায়। প্রায়ই মন্দিরে ঢাকের শব্দে সে বাচ্চা সমেত জড়ো হয় প্রসাদের লোভে। অবশ্য মন্দিরে ওঠা কঠোর নিষেধ। মন্দিরে ধুনুচির ধোঁয়ায় ঘোলাটে হয়ে ওঠে প্রসাদের থালা। পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণ হয়।
খেঁকিটা বাচ্চাগুলো নিয়ে এগিয়ে যায়। মুখের উপর প্রায়ই প্রসাদের বদলে লাথি এসে পড়ে। বাচ্চাগুলো আস্তে আস্তে চিনে নেয় মানুষ নামের এই প্রজাতিকে। হয়তো ঈশ্বরকেও। তবুও সে নির্বিঘ্নে বিশ্বাস করে যায়।
দিন গড়ায়। খেঁকিটা আজকাল ভরা বর্ষায় খাবার মিলাতে পারে না। চোখ ফেটে ক্ষুধা ঝরে পড়ে। অথচ এখানো সে বিনয়ের সাথে মাথা নিচু করে সাহায্য প্রত্যাশা করে যায়। মৃতপ্রায় চোখের নিস্প্রভ আলো দিয়ে মানুষের মুখোমুখি দাঁড়ায়। আশ্চর্যভাবে খেঁকিটার চোখে কেউ চোখ রাখার সাহস পায় না।
যদি কোনো পাঠক কখনো ভুল করেও চোখে চোখ রেখে বসে, তবে বোধকরি তার আর এ জীবনে সুখী হওয়া হলো না। সেই চোখ সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে। সমাজে মানুষের অবস্থানটা স্থির জলছবি হয়ে, খেঁকিটার ক্ষুধার্ত চোখের তারায় তারায় ফুটে ওঠে। সেই ক্ষুধার নীরব তীব্রতা আস্তে আস্তে খেঁকিটার মস্তিষ্ককেও গিলে ফেলে। ক্ষুধার যে অনেক ক্ষমতা। হন্যে হয়ে যায় খেঁকিটা। ভয়–লজ্জার বাঁধ ভেঙে মানুষের রান্নাঘরের হাড়িতে ভাগ বসায়। ছাগল, গরুর মাংসে কামড় বসায়। কেউ কেউ মেরে ফেলার তাগিদে লাঠি ছোঁড়ে, দা–কুড়াল দিয়ে কোপ মারে নইলে ইট দিয়ে মুখ–মাথা–পা থেঁতলে দেয়। খেঁকিটা তখনও খেতে চায়। বাচ্চাগুলো এগিয়ে আসে, গলায় গলা বুলায়। জীবনের প্রথম ওদের মায়ের ভিন্ন চেহারা দেখে আঁতকে ওঠে। তবু মমতা উছলে পড়তে চায়। গ্রামে এক মুহুর্তে সাড়া পড়ে যায়। হন্যে হন্যে রব ওঠে। চারদিক থেকে লাঠি, শাবল, সাঁড়াসি হাতে মানুষ জড়ো হয়। হিংস্র থেকে হিংস্রতর উল্লাসে খেঁকিটার তরতাজা রক্তের ছোপ ধরে তাড়াতে থাকে। খেঁকিটা তবু খেতে চায়, বাঁচতে চায়। রক্তাক্ত পা টেনে টেনে সে দৌড়াতে থাকে রুদ্ধশ্বাসে। এতদিনের যত চেনা পথ, সব পার হয়ে যায়। সবশেষে এসে পড়ে নদীর ঘাটে। এতদিন যে নদীর ওপারে দৃশ্যমান জঙ্গলকে ভয় পেয়ে এসেছে, আজ সে সেটাকেই আশ্রয় করে লাফ দেয় নদীর স্রোতে। কিন্তু হায়! পা তো চলে না। তীব্র উন্মাদনায় পৈচাশিক অদ্ভুত উল্লাসে আচমকা মানুষেরা লাঠি–শাবল হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে খেঁকিটার উপর। পাড়ের ওপরে খেঁকিটার বাচ্চাগুলো দিক্বিদিকশূন্য হয়ে ছুটতে থাকে এদিক– ওদিক। ঝপাৎ–ঝপাৎ শব্দে উত্তাল হয়ে ওঠে নদীর লাল টগবগে জল। জলের মধ্যে খেঁকিটার থেঁতলে যাওয়া মৃতপ্রায় বিভৎস মাংসের দলা থেকে শেষবারের মতো আবহমান গোঙানির শব্দ তীক্ষ্ম থেকে তীক্ষ্মতর হয়ে মুহুর্তেই ভেঙে দেয় মনুষ্যত্বের প্রাচীন খোলস। সন্ধ্যা নামে মন্দিরে। জয়ঘন্টার ঢং ঢং শব্দে মদিরার নেশায় চুর হওয়া ঈশ্বর নামক পাথরের সামনে মন্ত্র জপতে থাকে অবিরাম-“যত্র জীব, তত্র শিব”। ধুনুচির আলগা আঁধারে ঢাকের সেই আদিম ধ্বনিতে উন্মত্ত হয়ে নৃত্য করতে থাকে দ’ুপা আর দু’হাতওয়ালা কতগুলো লোমশ জন্তু।













