বোলতার কামড়

মোহছেনা ঝর্ণা | শুক্রবার , ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:০২ পূর্বাহ্ণ

আবারও একই গ্যাঁড়াকলে আটকে গেল শাহরিয়ার। একই সুর। একই তাল। একই লয়। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকতেই দেখে তার ম্যাসেঞ্জারে শ’য়ে শ’য়ে ম্যাসেজ আর নোটিফিকেশন। সে ম্যাসেজ, নোটিফিকেশন চেক করার আগে নিউজফিডে স্ক্রল করতে গিয়ে দেখে অনেকের আইডিতে তার ছবি ঝুলছে। ঘটনা কি তখনও বোঝেনি শাহরিয়ার। কারণ তার চোখে চশমা ছিল না। চশমাটা বোধহয় রাতে পড়ার টেবিলেই রেখে চলে এসেছিল শুতে। বিছানা থেকে নেমে পড়ার টেবিল থেকে চশমাটা তুলে চোখে দিয়ে আবার ফেসবুকে ঢুকে তার মনে হলো তার মাথায় ঠাডা পড়েছে।

শাহরিয়ার নামে যেখানেই যে কোনো আকাম কুকামের সাথে প্রতিবার তার ছবিটাই কেন ভাইরাল হয় কিছুতেই সে রহস্যের জাল উদঘাটন করতে পারে না। এর আগে একটা মেয়ে ফেসবুকে এসে লাইভ করে বলছে তার পেটে শাহরিয়ারের বাচ্চা। শাহরিয়ার তাকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছে, তাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়েছে, দেশেবিদেশে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে নিয়ে গিয়েছে। রাত কাটিয়েছে তার সাথে। দিন কাটিয়েছে সবার সাথে, ব্লা, ব্লা, ব্লা

সেদিন রুমকি কোনো কারণ ছাড়াই নাস্তার টেবিলে জিজ্ঞেস করে উঠলো, তুমি কি বিশাখা নামে কাউকে চেনো?

শাহরিয়ার খুব স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলো, কোন বিশাখা?

রুমকি ক্ষেপে গিয়ে বললো, তুমি ক’জন বিশাখাকে চেনো?

রুমকির প্রশ্নের ধরন দেখেই সে বুঝতে পেরেছিল আজ চুলার আগুনটা রুমকির মুখে উঠে গেছে।

রুমকি আদার ঝাঁঝ গলায় রেখেই বললো, ব্লগার বিশাখার কথা বলছি।

বিশাখা উঠতি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। ফেসবুক খুললেই “বিশাখার পৃথিবী” নামক ব্লগটা সামনে চলে আসে। সত্যি বলতে ওর ভিডিওগুলো শাহরিয়ারের ভালোও লাগে। তাই সে খুব সরল মনে বলেছিল, হ্যাঁ, চিনি তো!

ব্যস, শাহরিয়ার শুধু এতটুকুই বলেছিল।

বাকি সব রুমকি করেছে। কান্নাকাটি, হল্লাহাটি, হাঙ্গার স্ট্রাইক করা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

শাহরিয়ার তাৎক্ষণিকভাবে কিছুতেই রুমকির কান্নার নেপথ্যের কারণ উদঘাটন করতে পারেনি। কারণ সে সারাক্ষণ অনলাইন থাকলেও ফেসবুকে তার খুব একটা আসক্তি নেই। তবে যখনই কেউ তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায় সে সঙ্গে সঙ্গে এক্সেপ্ট করে নেয়। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো সে ব্যক্তি চেনা, নাকি অচেনা, আইডি অরিজিনাল না ফেক এসব নিয়ে কোনোদিন মাথা ঘামানোর কথা মাথায় আসেনি তার। কারণ ফেসবুকে নিজে কখনো কোনো পোস্ট দেয় না সে। দিতে ইচ্ছেও করে না তার। যার মন চায় সে তাকে ট্যাগ করে। ফলে তার আইডি অন্য মানুষের পোস্টে ভরপুর থাকে। কাজের অবসরে মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে যতটুকু দেখে, যতটুকুতে চোখ আটকে যায় ততটুকুই তার সীমারেখা। বিশাখার ব্লগগুলো কিভাবে তার সামনে আসে সে নিজেও জানে না।

তো সেদিন রুমকির প্রশ্ন যে তার জীবনে এত বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে স্বাভাবিকভাবেই তা তার চিন্তার চৌহদ্দিতে কড়া নাড়েনি তখনো। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে ভয়ঙ্কর সুনামির মতো। মুহূর্তেই তার গোছানো সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙেচুরে রুমকি বের হয়ে যাওয়ার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিল। হুমকির কারণ হলো, ব্লগার বিশাখা এক সাক্ষাৎকার নাকি পডকাস্ট না কি যেন বলে, সেখানে এসে বলেছে তার প্রাক্তনের নাম শাহরিয়ার ফেরদৌস। এবং শাহরিয়ারের সাথে তার এখনো যোগাযোগ আছে। কিছুদিন আগে তারা পাতায়াতে একসাথে সময় কাটিয়েছে। বিশাখা অবশ্য বলেছে তারা কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করেছে। শাহরিয়ার পর্যন্ত মানা যায়, তাই বলে বিশাখার প্রাক্তন প্রেমিকের নাম শাহরিয়ার ফেরদৌসই হতে গেলো! তার প্রেমিক শাহরিয়ার চট্টগ্রাম শহরে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিল এইটুকু শুনেই নাকি রুমকির করোটি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঠিক যেন সেদ্ধ হওয়া গরম পানির মতো বুদবুদ তৈরি হয়েছিল মাথায়।

রুমকির মুখে পুরো ঘটনা শোনার ধৈর্য আর দেখাতে পারেনি শাহরিয়ার। কারণ দেশেই খুব বেশি জায়গায় সে যায়নি। সুযোগও পায়নি। আবার তার শখও হয়নি। আর বিদেশে গেছে হাতে গোনা দুইবার। একবার কলকাতা হয়ে দার্জিলিং, সিকিম, গ্যাঙটক আরেকবার থাইল্যান্ডের ব্যাংকক আর পাতায়া। আর এর প্রতিটা জায়গায় রুমকিও ছিল তার সাথে কাঁঠালের আঠার মতো। তাহলে রুমকি কেন সন্দেহ করবে বিশাখার প্রাক্তন প্রেমিক শাহরিয়ার ফেরদৌস আর তার স্বামী শাহরিয়ার ফেরদৌস একই ব্যক্তি! সেবার স্ত্রীর প্রতি তার বিশ্বাসের জায়গাটাও টলমল হয়ে গিয়েছিল পুরোদস্তুর। তার মনে হয়েছিল, কেউ যদি এসে বলে শাহরিয়ার কাউকে খুন করেছে রুমকি সেকথাও আমলে নিয়ে তাকে জেরা করবে। যদিও তার এই বিশ্বাস ভঙ্গের কথা সে রুমকিকে জানায়নি। রুমকি অবশ্য বলেছিল বিশাখার প্রাক্তন প্রেমিক শাহরিয়ার কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র শুনে মূলত তার মনে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছিল। তার উপর আবার চট্টগ্রামে থাকে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে অনেক স্মৃতি তাদের। তবে এসব ছাপিয়ে পাতায়া ভ্রমণের কথা শুনে তার সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছিল। কারণ কিছুদিন আগেই তো শাহরিয়ারের চিকিৎসার জন্য তারা ব্যাংককে চিকিৎসা শেষে পাতায়া ঘুরে এসেছিল। তবে কি তখনই ছিল সময়টা!

সে যাত্রায় অনেক ধকল পেরিয়ে আবার তারা সুখী দম্পতির মতো গলায় গলায় পিরিতি দেখিয়ে বেড়াতে যেতো। রেস্টুরেন্টে খেতে যেতো। বাচ্চাদের নিয়ে শপিংয়ে যেতো। সেসব আবার অন্যদের গাত্রদাহের জন্য ভিভিড মোডে স্বাভাবিকের মুখে চুনকাম ঢেলে অস্বাভাবিক সুন্দর করে ফেসবুকে আপলোড করতো রুমকি।

মানে স্বাভাবিক মানুষের স্বাভাবিক জীবন যেমন হয় আর কি!

ক্ষুন্নিবৃত্তি সামলিয়ে মাঝে মাঝে ঘরে এসে নিরবে কবিতা পাঠ শাহরিয়ারের পুরনো অভ্যাস। বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা আর আগের মতো হয় না। সবাই ব্যস্ত। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। এসব পেরিয়ে যদি কিছু সময় থাকে তবে সেসময়টা সবাই বৈষয়িক ভাবনায় ব্যয় করতে আগ্রহী। একটা জায়গা হওয়ার পর আরেকটা জায়গা, একটা ফ্ল্যাট হওয়ার পরে আরেকটু বড় আরেকটা ফ্ল্যাট, একটা গাড়ি কেনার পর আরেকটা দামি গাড়ির হিসাব মিলাতেই বাকি সময়টাও হাপিস। এখানে এসে শাহরিয়ারের সাথে একটু গ্যাপ হয়ে যায় তাদের। আর সেই শাহরিয়ারকে কি না বারেবারে চারিত্রিক স্খলনের মতো লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে নাকাল হতে হচ্ছে। বিধাতার এটা কেমন রসিকতা, হিসাব মেলাতে পারে না শাহরিয়ার।

তার বাবার খুব পছন্দের কবি ছিলেন ফেরদৌস। পারস্যের কবি ফেরদৌসের জন্য রীতিমতো ফিদা ছিল তার বাবা। সেই ফেরদৌসকে ভালোবেসে ছেলের নাম রাখলেন শাহরিয়ার ফেরদৌস। আর এখন কি না এই শাহরিয়ার ফেরদৌস নামটাই তার কাল হলো। বেইজ্জতি অবস্থা। তার মুখে অনবরত আলকাতরার কালি মেখে চলেছে এই নাম।

রুমকি সকাল থেকে গ্যাঁট হয়ে আছে। গতবারের ন্যাক্কারজনক ঘটনার মূল উৎপাটন করায় এবার আর রুমকি অবশ্য তাকে সরাসরি সন্দেহ করছে না। অবশ্য ভেতরে ভেতরে সন্দেহ করছে কি না সেটা সে নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছে না। কারণ মানুষের মন বোঝা দায়। নারীর মন বোঝা তো আরও দায়। আর সে নারী যদি হয় খোদ নিজের স্ত্রী তবে সে মনের অতলে যাওয়ার সাধ্য আছে কোন স্বামীর!

সকাল থেকে রুমকির মোবাইলে বেশ কিছু ফোন এসেছে। ফোনের কথাবার্তা শুনে শাহরিয়ার নিশ্চিত হয়ে গেছে সব ফোনই তার নাম বিভ্রাট নিয়ে কৌতূহলী জনতারই ছিল।

দুমড়ানো মোচড়ানো কাগজের মতো রুমকির চেহারাটা দেখে তখন শাহরিয়ারের খুব মায়া হলো। শাহরিয়ার নিজের বুকের সিসিফাসের পাথরকে একপাশে ঠেলে রুমকিকে সান্ত্বনা দিতে রুমকির পাশে গিয়ে বসে। রুমকি নাক টানছিল। নাকে সর্দি ছিল না। কিন্তু সর্দিও ফোঁত ফোঁত আঁচটা ছিল।

দু’জনে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর রুমকি প্রস্তাব দেয়, তোমার নামটা চেঞ্জ করে ফেলো। রুমকির প্রস্তাব শুনে ইলেক্ট্রিক শক খাওয়ার মতো লাফিয়ে ওঠে শাহরিয়ার।

পাগল নাকি! এই বয়সে কেউ নাম চেঞ্জ করে! আর আমার বাবা গরু জবাই করে আকিকা দিয়ে আমার নাম রেখেছে। বললেই কি আকিকা দেওয়া নাম হুট করে চেঞ্জ করা যায়!

রুমকি বলে বাবার তো পারস্যের সব কবিই পছন্দ ছিল। তাহলে নিশ্চয়ই খৈয়ামও বাবার পছন্দের কবি ছিল। খৈয়ামের রুবাইয়াত বাবার অপছন্দ করার কথা না। রুবাইয়াত নামটাও অনেক সুন্দর। রুবাইয়াত ফেরদৌস নামে তোমাকে মানাবেও খুব!

রুমকির কথা শুনে রীতিমতো রাগ লাগে শাহরিয়ারের। ‘ফালতু আলাপ’ করবে না বলে রাগ করে রুম থেকে বেরিয়ে যায় সে।

আর এতে করেই বুকের ভেতর চেপে রাখা ক্ষোভের পাহাড় কান্নার বিলাপ হয়ে বের হয়ে আসে রুমকির মুখে। সবাই তার জামাইকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলে। প্রতিবারই সব আকামকুকামের সাথে তার জামাইর নামই বা কেন জড়াবে! কথায় আছে না, যা কিছু রটে তার কিছু না কিছু বটে!

বসার ঘর থেকে রুমকির মনের ভেতর চাপা থাকা গোপন কথা শুনে শাহরিয়ারের মাথায় যেন দ্বিতীয়বারের মতো ঠাডা পড়ে। কারণ রুমকির বলা শেষ বাক্যটা দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় রুমকির মনে পুরোপুরি সন্দেহ না হলেও সন্দেহের দানা এখনো বহাল তবিয়তে তার মনে নড়াচড়া করছে।

অধিক শোকে পাথর হয়ে যাওয়া মানুষের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় শাহরিয়ার।

অফিসে তার সহকর্মীরা এসে সহমর্মিতার নামে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করছে, ব্যাপার কি ভাই? এর আগেও এরকম একটা কেস খেয়েছেন মনে হয়। অন্য একজন বলে ওঠে, দেশটা রসাতলে গেলো। মানুষের মান সম্মান কথায় কথায় যেভাবে নালার ময়লা পানিতে ধুয়ে দিচ্ছে মানুষ, মাঝে মাঝে নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না। তবে বারবার একই নামের গ্যাঁড়াকল কেন, সেটাই বোঝে না মন। বুঝলেন ভাই, জীবন আর জীবন নাই। জীবন হলো বেইজ্জতির কারখানা।

সহকর্মীদের কথা শুনে তার ব্রম্মতালু আবার উত্তপ্ত হওয়ার অবস্থা হলে দ্রুত সে অফিস থেকে বেরিয়ে আসে রাস্তায়। ঠিক তখনই অফিসের নিচে মিষ্টির দোকানের বিক্রয়কর্মীটা তার সামনে এসে বলে, স্যার,

আপনার খালি একটা ছবিই দেখতেছি ফেসবুকে। আর ছবি নাই স্যার?

শাহরিয়ারের ইচ্ছে করে ঠাস করে একটা চড় লাগিয়ে দোকানদার ছেলেটার দাঁত ফেলে দিতে। কিন্তু নিজেকে সংযত করে এই ভেবে যে, কত হাজার চড় মারলে আর কত হাজার দাঁত ফেললে ইতরগুলো মানুষের পরিচয়টাকে মহিমান্বিত করার নূন্যতম ভূমিকা রাখবে! মনের দুঃখ মনেই চেপে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে সর্ষেফুল দেখে সে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শাহরিয়ার বুঝতে পারছিল না এখন দিন না রাত। ঠিক তখনই রুমকি আপেল টুকরো সামনে বাড়িয়ে ধরে বল, কার শোকে মরতে গেলা? আর অটো রিকশার নিচে পড়ে কেউ মরে! মান সম্মান আর রাখলে না!

রুমকির টিপ্পনী শুনে শাহরিয়ারের মনে হলো সে যেন জীবন্ত মমি হয়ে গেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) মাহফিল