অপারেশন জ্যাকপট ও বীর উত্তম মজাহার উল্লাহর অসামান্য বীরত্ব

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী | বৃহস্পতিবার , ৩০ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ

বীর মুক্তিযোদ্ধা মজাহার উল্লাহ বীর উত্তম বঙ্গোপাসাগরে পাকিস্তানি ও অন্যান্য জাহাজ ধ্বংসের জন্য মুক্তিবাহিনীর সুপরিকল্পিত অভিযান অপারেশন জ্যাকপটের অন্যতম কমান্ডার ছিলেন। তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কমান্ডোরা অপারেশন করেন, মজাহার উল্লাহ একটি গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন। তিনি ১৪ আগস্ট বঙ্গোপসাগরে নেমে বহির্নোঙ্গরে ‘হরমুজ’ নামে একটি জাহাজ লিমপেট মাইন বসিয়ে ধ্বংস করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ বীরত্বের জন্য তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মজাহার উল্লাহ, বীর উত্তম ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুন মিরসরাই থানার ভালুকিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আলী আজম মুক্তিযুদ্ধের একজন শহীদ, তাঁকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে হত্যা করে। তাঁর মায়ের নাম খায়রুন্নেসা বেগম। মজাহার উল্লাহর পরিবারের চারজন্য সদস্য মুক্তিযোদ্ধা, দু’জন কমান্ডার। একজন কমান্ডার তিনি নিজে; আরেকজন মোয়াজউদ্দিন আহমদ; তিনি সীতাকুণ্ড থানা মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন। মজাহার উল্লাহ তাঁর জেঠাত ভাই। পাক বাহিনী মোয়াজউদ্দিনের বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। তাঁর পিতাকে গ্রেফতার করে হয়রানি করা হয়।

মজাহার উল্লাহ এসএসসি পাস করেন ফেনী পাইলট হাইস্কুল থেকে। এরপর তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের করাচী চলে যান। সেখানে ইসলামিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাকিস্তান ইন্স্যুুরেন্স কর্পোরেশনে সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট হিসাবে চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন এবং ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে সাধারণ বিমা কর্পোরেশনে যোগ দেন। ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুন অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত বিমা প্রতিষ্ঠানে সুদীর্ঘকাল চাকরি করেন। পরে চট্টগ্রামে শহরে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার পূর্ব থেকে মজাহার উল্লাহর মনে পরাধীনতার গ্লানি কাজ করে। ধীরে ধীরে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী জনগণ যখন অবস্থান নিল তখন তিনিও সেই কাতারে সামিল হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী ও জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার প্রেরণা অনুভব করেন। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর তিনি ছুটি নিয়ে চলে আসেন দেশে, ৭১ এর মার্চে ছুটি শেষে চলে যাবার কথা। তিনি না গিযে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। মজাহার উল্লাহ ছাগলনাইয়া হয়ে ভারতের হরিণা ক্যাম্পে চলে যান। সেখানে গিয়ে শুনতে পান একটি স্পেশাল মিশনে কিছু লোক নিয়োগ হতে যাচ্ছে। তা হচ্ছে নৌবাহিনীর জন্য সুইসাইড মিশন। সেই মিশনে নির্বাচিত হয়ে তিনি চলে যান কলকাতা হয়ে পলাশির ভাগিরথী নদী তীরে নেভাল কমান্ডো ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৮ ঘণ্টা কঠোর কষ্টসাধ্য ট্রেনিং সম্পন্ন করেন।

প্রথম যুদ্ধ : তিন মাসের কঠোর পরিশ্রম শেষে বাংলাদেশের বিভিন্ন সমুদ্র নৌবন্দরে অপারেশনের নির্দেশ আসে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে অপারেশনের জন্য ষাটজন কমান্ডো বাছাই করা হয়। এ কমান্ডো দলের সার্বিক কমান্ডার ছিলেন সাবেক সাবমেরিনার এ ডব্লিউ চৌধুরী। দলটিকে তিনি তিনটি গ্রুপে ভাগ করেন তিনটি গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন ডা. শাহ আলম (পরে বীর উত্তম), আবদুর রশিদ ও মজাহার উল্লাহ। চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশনের জন্য নির্বাচিত কমান্ডোদের পলাশী থেকে কলকাতা বিমানবন্দর হয়ে আগরতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে নানা পথে ভিন্ন ভিন্নভাবে তিন গ্রুপের চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার কথা ছিল। রশিদের পৌঁছানোর কথা রামগড় হয়ে, শাহ আলমের আমলীঘাট হয়ে, আর মজাহার উল্লাহর আসার কথা ছিল ছাগলনাইয়ার ফাজিলপুর হয়ে। কিন্তু গুপ্তচরের মাধ্যমে আমলীলীঘাটের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে মিরসরাইয়ের পথ বাদ দিয়ে শাহ আলম দল নিয়ে মজাহার উল্লাহর গ্রুপের সঙ্গী হন। এ ডব্লিউ চৌধুরী এবং শাহ আলম ও মজাহার উল্লাহর দল একদিন ভোরে একত্রে ফাজিলপুর হয়ে নৌকা দিয়ে মীরসরাই পৌছে সমিতির হাটে বদিউল আলমের সহায়তায় একটি বাড়িতে উঠেন।

তিন কমান্ডো গ্রুপের মধ্যে যোগাযোগ রাখার জন্য তিনটি ট্রানজিস্টার দেওয়া হয়েছিল। তাতে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট তরঙ্গে কমান্ডোদের অনুষ্ঠান শুনতে হতো। কারণ নির্দিষ্ট সময়ে রেডিওতে নির্দিষ্ট গানের মাধ্যমে তাদের সংকেত দেওয়া হবে। যেমন – ‘আজকে আমার পুতুল যাবে শ্বশুর বাড়ি’ গানটি বাজলে বুঝাতে হবে চব্বিশ ঘন্টার জন্য অপারেশন বন্ধ। ‘ভয় কিরে তোর’ গানটি বাজলে অপারেশন শুরু করতে হবে মধ্যরাতে। সমিতির হাটে থাকার সময় প্রথম গানটি শুনতে পেয়ে চট্টগ্রাম শহরের আশ্রয়কেন্দ্রে যুদ্ধাস্ত্র (লিম্পেট মাইন, স্টেনগান ইত্যাদি) পৌঁছে দেয়ার জন্য তারা নির্দিষ্ট লোকের কাছে খবর পাঠান। সে অনুযায়ী জানে আলম নামে একজন হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স ও ওয়াপদার পিকআপে করে তাঁর সঙ্গীদের সহায়তায় নির্দিষ্ট স্থানে যুদ্ধাস্ত্রগুলো পৌঁছে দেন। দুতিনজনের গ্রুপ করে কমান্ডোদের সমিতির হাট থেকে বড় দারোগারহাট হয়ে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। নির্দিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়া তাদের অন্য কোথাও না যেতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয় । চট্টগ্রাম আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে ১৩ আগস্ট বিকেল থেকে দুইতিনজনের গ্রুপ করে বাংলাবাজার হয়ে নৌকাযোগে তারা লক্ষ্যারচরের নির্দিষ্ট খামার বাড়িতে হাজির হন। যুদ্ধাস্ত্রগুলো পাঠানো হয় নৌকায় টুকরি বোঝাই করে; সেগুলোর ওপর সবজি, মাছ ইত্যাদি বোঝাই করে। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় কর্তব্যরত বেলুচ ও পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও নৌবাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে সেগুলো লক্ষ্যস্থলে নিয়ে যাওয়া হয় । অনেকের তাঁর নামই এখন মনে নেই। কিন্তু লক্ষ্যারচরের কালা মিয়াসহ আরো কয়েকজন তাতে বড় ধরনের অবদান রেখেছিলেন।

১৪ আগস্ট তাঁরা লক্ষ্যারচর থেকে জেলে’র ছদ্মবেশে বন্দর এলাকায় রেকি করেন। বন্দরের ভেতরে বিভিন্ন টার্গেট রেকি করার বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার আজিজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী খুবই সাহায্য করেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে ১৫ আগস্ট রাত ১২টা ১ মিনিটে তাঁরা অপারেশন করার প্রস্তুতি শেষ করেন। তাদের টার্গেট ছিল ছোটবড় সব ধরনের জাহাজ। বড় জাহাজ ধ্বংসের জন্য তিনজন, মাঝারি জাহাজের জন্য দুজন এবং ছোট জাহাজের জন্য একজন করে কমান্ডো নিয়োগ করা হয়। সব কমান্ডো যাতে একই সময়ে অপারেশন করতে পারে সে কথা বিবেচনায় এনে দূরত্ব হিসাব করে তাদের কর্ণফুলী নদীতে নামানো হয় এবং সকলে লিম্পেট মাইন স্থাপন করে আশ্রয়স্থলে ফিরে আসে।

দিনটি ছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। উৎসব অনুষ্ঠানের জন্য পাকিস্তানী জাহাজগুলো রাখা হয়েছিল। সোয়াত আল আব্বাস ও হরমুজ নামের দুটি জাহাজ থেকে খালাস করা হচ্ছিল পাকিস্তান থেকে আসা যুদ্ধাস্ত্র। তাদের লিম্পেট মাইনগুলো বিস্ফোরিত হলে আক্রান্ত জাহাজগুলো থেকে হর্ন বাজানো শুরু হয়। পাকিস্তানী বিমানবাহিনী সার্চলাইট দিয়ে আক্রমণকারীদের অনুসন্ধান শুরু করে। পাশাপাশি বন্দর থেকে লক্ষ্যারচরকে উদ্দেশ্য করে আরম্ভ হয় মুহুর্মুহু গুলি। এই প্রবল আক্রমণের মধ্যে কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই কমান্ডোরা লক্ষ্যারচরের আশ্রয়স্থলে গিয়ে পৌঁছায়। তাদের আক্রমণে সোয়াত, আল আব্বাস ও হরমুজসহ প্রায় ১১টি জাহাজ ধ্বংস হয়। হরমুজ নামের জাহাজটি ধ্বংস করেন মজাহার উল্লাহ নিজে”। স্বাধীনতার পর সরকার মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মজাহার উল্যাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করে।

মজাহার উল্লাহর স্ত্রীর নাম দেল আফরোজ বেগম। এক পুত্র, চার কন্যা. জামসেদ আলমপুত্র, . তাহমিনা আফরোজকন্যা, . মর্জিনা আফরোজকন্যা, . তারজিনা আফরোজকন্যা, . তানজিনা আফরোজকন্যা।

লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, মুক্তিযোদ্ধা

পূর্ববর্তী নিবন্ধযে শিক্ষা সিলেবাসে নেই, কিন্তু জীবন গড়ে
পরবর্তী নিবন্ধদোয়েলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান