শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতে হবে

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের সেমিনারে জেলা প্রশাসক

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ২৯ জুলাই, ২০২৬ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, একটি সুস্থ সমাজ গঠনের চিন্তা শুরু হওয়া উচিত পরিবার থেকেই। একজন মাকে গর্ভধারণের সময় থেকে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার ও সমাজের অবহেলার কারণেই অনেক তরুণ ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এই সামাজিক অবক্ষয় শুধু অপরাধই বাড়াচ্ছে না, বিভিন্ন জটিল রোগের বিস্তারেও ভূমিকা রাখছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। লিভার কেয়ার সোসাইটি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এর আগে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়।

জেলা প্রশাসক বলেন, মানুষ যখন নিজের ব্যথা বোঝে, তখন সে জীবিত। আর যখন অন্যের ব্যথা বোঝে, তখন সে প্রকৃত মানুষ। সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি যদি নিজের দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্বও পালন করেন, তাহলে অপরাধ, মাদকাসক্তি ও সামাজিক সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি আরো বলেন, পৃথিবীতে মানুষের প্রয়োজন মেটানোর মতো সম্পদ রয়েছে, কিন্তু মানুষের লোভ মেটানোর মতো সম্পদ নেই। তাই দায়িত্বশীলতা, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার কোনো বিকল্প নেই।

উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক বড় বড় ডিগ্রি আছে। কিন্তু যদি সেই শিক্ষার প্রভাব সমাজে না পড়ে, যদি অপরাধ, মাদকাসক্তি কিংবা রোগীর সংখ্যা না কমে, তাহলে সেই ডিগ্রির মূল্য কোথায়?’ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে।

স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রসঙ্গ তুলে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রতিদিন লিভার, কিডনিসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষ তার কাছে সহায়তার জন্য আসেন। আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ কিডনি রোগে আক্রান্ত। খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

সাম্প্রতিক জেলা প্রশাসনের পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, গত শনিবার চট্টগ্রাম জেলায় ৬ হাজার ২০০ সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীর অংশগ্রহণে পরিচালিত অভিযানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ থেকে ১৩৫ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এসব বর্জ্য জমে ছিল। শুধু বাইরের পরিবেশ নয়, মানুষের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

জেলা প্রশাসক আরো বলেন, আমরা প্রায়ই অন্যের ভুল নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালন করছি কি না, তা নিয়ে আত্মসমালোচনা করি না। বাইরে আলোকিত করলেই হবে না, ভেতরটাও আলোকিত হতে হবে। রাষ্ট্রের সব সুযোগসুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, মানবিক ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্বও বর্তমান প্রজন্মের। প্রয়োজনে প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে কাজ করতে হবে। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

লিভার কেয়ার সোসাইটির কার্যক্রমের প্রশংসা করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে হেপাটাইটিস ও লিভারের বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের প্রধান ও লিভার কেয়ার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। তিনি বলেন, দেশে আনুমানিক ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতিবছর ২০ হাজারের বেশি মানুষ এ রোগে মারা যান। আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই নিজেদের রোগ সম্পর্কে জানেন না। অথচ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসই প্রধান কারণ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত রোগীদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়ে চিকিৎসকেরা হেপাটাইটিস বি ও সি শনাক্তে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন। সঞ্চালনা করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লিভার কেয়ার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. তারেক শামস।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসিমেন্ট ভিত্তিক রিটেইল ব্যবসায়ীদের নিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল উপভোগ
পরবর্তী নিবন্ধঘর-ফসল হারানো মানুষের পাশে থাকবে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ