রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় উড়োজাহাজের কারিগরি কোনো ত্রুটি পায়নি সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় পাইলটের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, গ্রাউন্ড বা কমান্ডিং সুপারভাইজারের তত্ত্বাবধানের অভাব এবং ভবন নির্মাণের ত্রুটিকে মোটা দাগে দায়ী করা হয়েছে কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে।
গত বছর ৪ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ওই প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিক পর্যালোচনায় এই বিমান বিধ্বস্তের দুর্ঘটনাটির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় মনুষ্য–ত্রুটি, যা পরিবেশগত প্রভাবক দ্বারা ত্বরান্বিত হয়েছে। খবর বিডিনিউজের।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর একটি এফ–৭বিজিআই যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয়। তাতে পাইলটসহ ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক এবং একজন স্কুলকর্মী ছিলেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উড়োজাহাজটি হঠাৎ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কাত হয়ে নিশ্চল (স্টল) অবস্থা তৈরি হয় এবং সেটি মাইলস্টোনের ওই স্কুল ভবনের সিঁড়ির সামনে আছড়ে পড়ে। এরপর উড়োজাহাজের জ্বালানি ট্যাংক চুরমার হয়ে অবশিষ্ট প্রায় ২১শ লিটার জ্বালানি তেল প্রচণ্ড তাপে বিস্ফোরণ ঘটায় এবং জ্বলতে থাকে। ১৯টি শ্রেণিকক্ষের ওই ভবনে ৭৩৭ জন শিক্ষার্থী ও অর্ধশতাধিক শিক্ষকের জন্য মাত্র একটি সিঁড়ি থাকায় ভেতরে আটকা পড়া শিশু ও শিক্ষকরা সে সময় বের হতে পারেননি। ২০০৬ সালে নির্মিত তিনতলা ভবনটির নিচতলা মাটি ভরাটের কারণে মাটির নিচে চলে গিয়েছিল, বাকি দুটি তলায় ক্লাস চলছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ এই ভবন নির্মাণের কোনো অনুমোদনও দেখাতে পারেনি।
তদন্ত কমিশনের সদস্য নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রিপোর্টটা নিয়ে কথা বলা দরকার। সেখানে কী আছে না আছে সেগুলো জনগণের সামনে উন্মোচিত হওয়া দরকার। সেখানে জননিরাপত্তা বিষয়ক যে প্রশ্নগুলো আছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার, যেন ভবিষ্যতে এ রকম দুর্ঘটনা না হয়। অদক্ষতা, গাফিলতি : দুর্ঘটনায় বিমানটি হঠাৎ নিশ্চল হয়ে আছড়ে পড়ার কারণ হিসেবে পাইলটের অদক্ষতার পাশাপাশি গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা কমান্ডিং অফিসারের গাফিলতি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। সেদিন বিমান বাহিনীর একটি মোবাইল ভ্যান থেকে রেডিওতে পাইলট তৌকিরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন তার কমান্ডিং অফিসার, যিনি একজন উইং কমান্ডার। এটি ছিল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকিরের প্রথম সলো ফ্লাইট। তার সঙ্গে যোগাযোগের পুরো রেকর্ডিংও বিশ্লেষণ করেছে তদন্ত কমিশন।
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কথোপকথন ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত কমিশন বলেছে, কমান্ডিং অফিসার মোবাইল ভ্যান থেকে পাইলটকে পুনরায় ইনিশিয়ালে আসার নির্দেশনা দেন, যা প্রথম সলো ফ্লাইটের মিশন প্রোফাইলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে সরকারের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাইলস্টোন স্কুলের সিসি ক্যামেরার ভিডিও থেকে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে বিমানের উইন্ডশিল্ডে একটি কালো দাগ দেখা যায়। এই কালো দাগ পাখি বা উড্ডীয়মান কোনো বস্তুর আঘাতে হতে পারে। এই আঘাত পরিহার করার জন্যই হয়তো পাইলট তৎক্ষণাৎ কন্ট্রোল স্টিকটি টেনে বিমানের গতিপথ পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন। যার ফলে হঠাৎ ব্যাংকিং অ্যাঙ্গেল অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। এ থেকে ধারণা করা যায় যে, উক্ত ঘটনায় পারিপার্শ্বিক নিয়ামকেরও ভূমিকা থাকতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত পাইলটরা ককপিট থেকে ‘বার্ড হিট’ বা এই ধরনের কিছু বলে কন্ট্রোল টাওয়ারকে জানান দেন। তবে পাইলট তৌকিরের তেমন কিছু বলার প্রমাণ এটিসি রেকর্ডে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাইলট তৌকির ইসলামের প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিল, যা তার গতি দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে ঋণাত্মক ভূমিকা পালন করেছে। ফলশ্রুতিতে পাইলট তৌকিরের এই উড্ডয়নে সংশ্লিষ্ট প্যারামিটারগুলো বজায় রাখতে কর্মদক্ষতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। একই সাথে পরিস্থিতিগত অসচেতনার কারণে নিশ্চল অবস্থা থেকে উত্তরণের (স্টল রিকোাভারি) ক্ষেত্রে পাইলটের অনুপযুক্ত তৎপরতা ও চাপযুক্ত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ধীর সাড়া (স্লো রিঅ্যাকশন) লক্ষ্য করা গেছে।
তদন্ত কমিশন বলেছে, সার্বিক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, পাইলটের পর্যাপ্ত ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের অভাব, পরিস্থিতিগত অসচেতনতা ও অফিসার কমান্ডিংয়ের পর্যাপ্ত সুপারভিশনের অভাবে পাইলট উড্ডয়নের সময় যথাযথ উড্ডয়ন প্যারামিটারসমূহ বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে সংকটাপন্ন অবস্থায় পাইলটের যথোপযুক্ত প্রতিক্রিয়ার অভাবে বিমানটি হঠাৎ স্টলিং কন্ডিশনে চলে যায়, যেখান থেকে পাইলট পুনরায় চেষ্টা করেও বিমানটির স্বাভাবিক অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারেননি। পাশাপাশি পরিবেশগত নিয়ামক হিসেবে পাখি বা অন্য কোনো উড্ডীয়মান বস্তুর বিমানের উইন্ডশিল্ডে আঘাত করার ঘটনা পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছে তদন্ত কমিশন।
প্রতিবেদনের সুপারিশ : মাইলস্টোন দুর্ঘটনার পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সাবেক সচিব এ কে এম জাফর উল্লা খানকে প্রধান করে নয় সদস্যের এই তদন্ত কমিশন গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। কমিশনকে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত, কারণ, দায়দায়িত্ব ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং ঘটনাসংশ্লিষ্ট অপরাপর বিষয় চিহ্নিত করতে বলা হয়েছিল। কমিশন গত বছরের ৪ নভেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ৩০টি সুপারিশ করা হয় সেখানে।
এর মধ্যে বিমান বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করাসহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সকল ধরনের পদ্ধতিগত সংস্কার ও সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ, ওই পাইলটের সুপারভাইজার অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাইরে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ, বিমান বাহিনীর জন্য নতুন বিমান বহর এবং প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকার বাইরে ঘাঁটি করার কথা এসেছে সুপারিশ মালায়।












