নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে খাল পুনরুদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণে পৃথক দুটি প্রকল্প নিচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। প্রকল্প দুটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। ‘আওয়ার পালস’ নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প দুটির উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে চসিক।
বর্তমানে নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩৬ খাল নিয়ে মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পের কাজ শেষে প্রকল্পভুক্ত খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণে বুঝিয়ে দেয়া হবে চসিককে। কিন্তু খাল রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় ইক্যুপমেন্টের ঘাটতি আছে চসিকের। একইসঙ্গে আর্থিক সক্ষমতাও নেই সংস্থাটির। তাই ৩৬ খাল রক্ষণাবেক্ষণে একটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মেগা প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১ খাল পুনরুদ্ধার ও সংস্কারে নেয়া হবে অপর প্রকল্পটি।
জানা গেছে, দুটি প্রকল্পের মধ্যে ৩৬ খাল রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২২ কোটি টাকা। ২১ খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। ‘আওয়ার পালস’ নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিটি মেয়রের কাছে গতকাল সম্ভাব্য প্রকল্পের নানা দিক উপস্থাপন করেছেন।
এ বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, তারা (আওয়ার পালস) যে উপস্থাপনা দিয়েছে সেখানে কিছু বিষয় যোগ করতে হবে। যেমন মেগা প্রকল্পভুক্ত ৩৬ খালের বাইরে শুধু ২১টি নয়, আরো অনেক খাল আছে। এ সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০টি হবে। কয়েকদিন আগে চান্দগাঁওয়ে একটি মরা খাল দেখলাম, ওই খালের উপর অনেক প্লট হয়ে গেছে। এ ধরনের আরো অনেক খাল আছে। সেগুলোও ২১ খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হবে। সেক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে।
৩৬ খাল রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে মেয়র বলেন, বর্তমানে সেনাবাহিনী খালগুলোতে কাজ করছে। প্রকল্প শেষে এগুলো সিটি কর্পোরেশনকে বুঝিয়ে দেবে। তখন প্রতিবছর খালগুলো খননসহ অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণ সিটি কর্পোরেশনকে করতে হবে। এ জন্য অর্থ প্রয়োজন। ইক্যুপমেন্ট দরকার। ইক্যুপমেন্টের বিষয়টি আওয়ার পালস এর প্রতিবেদনে সেভাবে আসেনি। সেটা যোগ করতে বলেছি। তাছাড়া খালগুলোকে আমরা পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। অর্থমন্ত্রীরও এমন প্রত্যাশা। ৩৬ খাল রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে বিষয়গুলোও থাকবে।
২১ খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প : ২০২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের গৃহীত কার্যক্রমের পর্যালোচনা সভায় ২১ খাল নিয়ে চসিকের প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর ২১টি খালের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে কনসালটেন্ট ফার্ম নিয়োগে ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট দরপত্র আহবান করে চসিক। এতে ১০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর এক বছর পর ওয়াশো ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে নিয়োগ দেয়া হয়। ৩৪ লাখ টাকায় নিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের শুরুতে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা সিইজিআইএসও কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
কথা ছিল, নির্বাচিত কনসালটেন্ট ফার্ম নতুন করে জরিপ করে খাল শনাক্ত করবে। আরএস–বিএস শীট এর আলোকে খালের সীমানা নির্ধারণ করবে। খালের উপর থাকা অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করার পাশাপাশি এর পরিমাণও নির্ণয় করবে। খালের পাড়ে রাস্তা নির্মাণে কি পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হবে এবং এর মূল্য নির্ধারণ করবে। খালের পাড়ে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণে প্রাথমিক নকশা এবং এর ব্যয় প্রাক্কলন প্রস্তুত করবে। পানির প্রবাহ, ঝড় এবং অন্যান্য আবহাওয়া সংক্রান্ত ডেটা বিশ্লেষণ করে প্রকল্পের প্রাক সম্ভাব্যতাও যাচাই করবে প্রতিষ্ঠানটি।
জানা গেছে, সিইজিআইএসও কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর গত গত বছর (২০২৫) প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) এবং প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করতে ‘পাওয়ার চায়না’র সহযোগিতা চায় চসিক। এর অংশ হিসেবে একইবছরের ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে চীনের প্রতিষ্ঠানটির কান্ট্রি ম্যানেজার রেন হাও–এর সাথে বৈঠকও করেছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সর্বশেষ ২১ খাল নিয়ে ‘আওয়ার পালস’ আগ্রহ দেখায়।
এদিকে মেগা প্রকল্পের বাইরে থাকা উল্লেখযোগ্য খালগুলোর মধ্যে রয়েছে– কাটা খাল, কৃষ্ণ খাল, কুয়াইশ খাল, যুগীর খোলা খাল, ফরেস্ট খাল, বাইজ্জা খাল, চট্টেশ্বরী খাল, ১৫ নং ঘাট এয়ারর্পোট খাল, রামপুর খাল, বালুখালী খাল, কৃষ্ণখালী খাল, কুয়াইশ খাল, ফরেস্ট খাল, উত্তর সলিমপুরের বারিঙ্গাছাড়া খাল এবং ভাটিয়ারির ধামাইর খাল। এছাড়া নেভাল একাডেমি, চরপাড়া, হোসাইন আহমেদ পাড়া, সিইপিজেড আনন্দবাজার, সিইপিজেড নতুন পাড়া, উত্তর হালিশহর, উত্তর কাট্টলী, লতিপফুর এবং সলিমপুরের স্লইস গেইটের ১১ টি সংযুক্ত খালও রয়েছে।
খাল রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প : সিডিএর গৃহীত জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের কাজ করছে সেনাবাহিনী। ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথ। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৩৬ খাল। প্রকল্প শেষে খালগুলো বুঝিয়ে দেয়া চসিককে।
খালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে সম্ভাব্য প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৩২২ কোটি টাকা। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘আওয়ার পালস’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ৩৬টি খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা নিরূপণ করা হবে। পরিকল্পনাটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম ধাপে (১–৬ মাস) জরুরি ভিত্তিতে খাল থেকে পলি ও বর্জ্য অপসারণ এবং খালসমূহের ডিজিটাল ইনভেন্টরি প্রস্তুত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে (৬–২৪ মাস) খালের কাঠামোগত উন্নয়ন, ইউ–ওয়াল নির্মাণ এবং নাগরিক অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। তৃতীয় ধাপে ((২–৫ বছর) আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা, বন্যা পূর্বাভাস এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।











