বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরের এবার যৌথ আয়োজক তিন দেশ। এবারই প্রথম ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় চলবে এই আসর। ১১ জুন মেক্সিকোর আইকনিক স্টেডিয়াম এস্তাদিও আজতেকায় শুরু হবে উদ্বোধনী ম্যাচ। তিন দেশেই হবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। মেক্সিকোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান গাইবেন গ্র্যামিজয়ী জনপ্রিয় মেক্সিকান পপ ব্যান্ড ‘মানা’। তাদের পাশাপাশি পারফর্ম করবেন মেক্সিকান ফোক ও পপ গায়ক আলেজান্দ্রো ফার্নান্দেজ ও বেলিন্ডা। মেক্সিকো সিটির কনসার্টে দেশটির সংস্কৃতিকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে। সেখানকার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেক্সিকোর আদিবাসী শিল্পী ও আধুনিক লোকসংগীতের পারফরমাররা অংশ নেবেন। এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে মেক্সিকো তিনবার বিশ্বকাপ আয়োজনের অনন্য কীর্তি গড়বে। এটি মেক্সিকোর ১৮ তম বিশ্বকাপ। এখন পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালই তাদের সেরা অর্জন।
মেক্সিকো আর আজতেক শব্দ দুটি শুনলে মনে ভাসে ‘অ্যাপোক্যালিপ্টো’ সিনেমাটির কথা। নরবলির কি বীভৎসতা। মেক্সিকো ছিল ওলমেক, মায়া, তেওতিহুয়াকান, তোলতেক এবং আজতেক সভ্যতার দেশ। যেগুলোকে একত্রে বলে মেসো–আমেরিকান সভ্যতা। মিসরের বাইরে এই মেসো–আমেরিকান সভ্যতার অঞ্চলগুলোতে, বিশেষ করে মেক্সিকোতে আছে প্রাচীন পিরামিড। সেসব গল্প আমরা জানি।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে এই এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে ব্রাজিল ইতালিকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জয় করে। সেই ম্যাচে ফুটবলের রাজা পেলে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ জয় উদযাপন করেছিলেন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপেও ইতিহাস রচিত হয় এই মাঠে। সেইবার ফাইনালে আর্জেন্টিনা তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়। একই টুর্নামেন্টে কোয়ার্টার ফাইনালে কিংবদন্তি ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র দুটি ঘটনাই ঘটে এই স্টেডিয়ামে।
ফলে এস্তাদিও আজতেকা শুধু একটি মাঠ নয়, এটি ফুটবল ইতিহাসের জীবন্ত জাদুঘর। ১৯৬৮ সালে অলিম্পিকের ফুটবল ভেনু ছিল এটি। জাতীয় ফুটবল দল ও ক্লাব আমেরিকার স্টেডিয়াম আজতেকা। ১১ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ২০২৬ বিশ্বকাপ। বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচসহ মোট পাঁচটি খেলা অনুষ্ঠিত হবে।
শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি বিশ্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আবেগেরও মিলনমেলা। এই স্টেডিয়াম শুধু ফুটবলের ইতিহাসের অংশ নয়, এটি এমন এক ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে হাজার বছরের পুরোনো মেসো–আমেরিকান সভ্যতা। আজও সেই ভূখণ্ডে সেসব সভ্যতার স্মৃতি জীবন্ত।
মেক্সিকো যখন ১৯৭০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক মানের একটি স্টেডিয়ামের প্রয়োজন দেখা দেয়। আর সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয় এস্তাদিও আজতেকা। স্টেডিয়ামটির নকশা করেন মেক্সিকান স্থপতি পেদ্রো রামিরেস ভাসকেস এবং রাফায়েল মিজরাহি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ করা, যা শুধু দর্শক ধারণক্ষমতার দিক থেকে নয়, স্থাপত্যগত দিক থেকেও বিশ্বের উল্লেখযোগ্য স্টেডিয়ামগুলোর একটি হবে। নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬২ সালে। আগ্নেয়গিরির পাথরসমৃদ্ধ মাটির ওপর বিশাল কাঠামো নির্মাণ ছিল বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। হাজার হাজার শ্রমিক ও প্রকৌশলীর নিরলস পরিশ্রমে চার বছরের মধ্যে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ১৯৬৬ সালের ২৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করা হয়।
অ্যাজতেকদের স্মরণে স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয় আজতেকা। স্প্যানিশ উপনিবেশ স্থাপনের আগে মধ্য মেক্সিকো অঞ্চলে অ্যাজতেক সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল সর্বাধিক। নামটি শুধু একটি ঐতিহাসিক জাতিগোষ্ঠীকে স্মরণ করে না, এটি মেক্সিকোর জাতীয় পরিচয়, গর্ব, একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতীকও।
যখন দর্শকেরা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে খেলা উপভোগ করেন, তখন তাঁরা এমন এক ভূমিতে অবস্থান করেন, যেখানে শত শত বছর আগে অ্যাজতেকযোদ্ধারা তাদের সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখেছিল। এস্তাদিও আজতেকাকে অনেকে ‘ফুটবলের ক্যাথেড্রাল’ হিসেবে অভিহিত করেন। এর অন্যতম কারণ, বিশ্বের আর কোনো স্টেডিয়াম দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ আয়োজনের গৌরব অর্জন করতে পারেনি। এর মধ্য দিয়ে এস্তাদিও আজতেকা বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম হিসেবে তিনটি পৃথক বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজনের বিরল রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে স্টেডিয়ামে ব্যাপক সংস্কারকাজ করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত দর্শকসেবা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এতে যোগ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক চরিত্রকে অক্ষুণ্ন রেখে এই স্টেডিয়ামের সংস্কার করা হয়েছে। ৮৩ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন স্টেডিয়ামটি।
মেক্সিকোকে অনেকে বলে থাকেন আমেরিকার প্রাচীন সভ্যতার জন্মভূমি। খ্রিস্টপূর্ব যুগে ওলমেকরা এখানে প্রথম বড় আকারে নগর সভ্যতার ভিত্তি গড়ে তোলে। পরে মায়ারা জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত ও স্থাপত্যে বিস্ময়কর উন্নতি ঘটায়। তেওতিহুয়াকান নগরী একসময় ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগর কেন্দ্র। এরপর তোলতেকরা সামরিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির উত্থান ঘটায়। সবশেষে অ্যাজতেকা মেক্সিকো উপত্যকায় প্রতিষ্ঠা করে শক্তিশালী সাম্রাজ্য, যার রাজধানী টেনোচটিটলান ছিল বর্তমান মেক্সিকো সিটির পূর্বসূরি। এই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দাঁড়িয়ে এস্তাদিও আজতেকা যেন আধুনিক যুগের এক নতুন পিরামিড, যেখানে ধর্মীয় আচার নয়, মানবসমাজের বড় ক্রীড়া উৎসবের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে।







