রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবারও একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে গেছে। তবে দুর্ঘটনার আগে প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী বাসের সব যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন বাসচালক ও তার সহকারী। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ‘এসবি সুপার ডিলাঙ’ পরিবহনের বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাসটি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে পৌঁছে ফেরি ‘কবরী’র কনভেনশন পকেট দিয়ে প্রবেশ করে। এ সময় বাসটি বিপরীত পাশের একটি র্যাম্পে সজোরে ধাক্কা দিলে র্যাম্পটি ভেঙে যায় এবং বাসটি সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দুর্ঘটনার আগে নিরাপত্তাজনিত নির্দেশনা অনুসারে বাসটির ৩৮ জন যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বাসটি নদীতে পড়ে গেলেও কোনো যাত্রী হতাহত হননি। দুর্ঘটনায় আহত বাসচালক ও তার সহকারীকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তারা বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস জানান, বাসটি ফেরিতে ওঠার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। তবে বাসে কোনো যাত্রী না থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, বিআইডব্লিউটিএ এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ এবং ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করে। পরে উদ্ধারকারী জাহাজের সহায়তায় নদীর তলদেশ থেকে বাসটি উদ্ধার করা হয়।
এদিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং দায়–দায়িত্ব নিরূপণে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রফিকুল করিমের নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটিতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সদস্য হিসেবে থাকবেন। পাশাপাশি রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন সাত সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলেও জানান তিনি।
দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা বাসটির ‘জাহাঙ্গীর’ নামে একটি ফেরিতে ওঠার কথা ছিল। ফেরিতে ওঠার সময় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের একটি ফেরির র্যাম্পে ধাক্কা দেয়। এতে র্যাম্প ভেঙে গিয়ে বাসটি সরাসরি নদীতে পড়ে ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আজ আমরা একটি বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। বাসে থাকা ৩৮ জন যাত্রী আগেই নেমে যাওয়ায় তাদের জীবন বেঁচে গেছে। চালক, হেলপার ও সুপারভাইজারকেও উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিয়েছেন এবং বাস উদ্ধারের পরও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, এর আগে একই ঘাটে ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ফেরিতে বাস ওঠা ও নামার সময় সব যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের কারণেই এবার বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ আজ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। যাত্রীরা বাসে থাকলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারত।
ঈদুল আজহার আগে এবং পরে ঘরমুখো ও কর্মস্থলমুখী মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, নৌপুলিশ এবং জেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী সবাইকে সরকারি নির্দেশনা ও নিরাপত্তা বিধি মেনে চলার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৫ মার্চ একই দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন এলাকায় কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় উদ্ধার অভিযানের পর মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।












