মৌসুমি ফল উৎপাদনে তিন পার্বত্য জেলার সুখ্যাতি দীর্ঘদিনের। দেশে উৎপাদিত মৌসুমি ফলের মধ্যে পাহাড়ি জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে কাঁঠাল, লিচু ও আনারসের পাশাপাশি আম উৎপাদন ক্রমবর্ধমান। বর্তমানে পাহাড়ে বিভিন্ন জাতের আম বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে রাংগুই, আম্রপালি, বারি আম–৪’সহ বিভিন্ন বিদেশি জাতের আমের বাণিজ্যিক বাগান বাড়ছে। তবে সবচেয়ে সুস্বাদু হিসেবে পরিচিত আম্রপালি আম বাজার সয়লাব হয় মৌসুমের শেষ দিকে।
বাগান মালিক ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, রাঙামাটি জেলায় দেশীয় জাতের আম ছাড়াও রাংগুই, আম্রপালি, বারি আম–৪, মিয়া জাকি, ব্যানানা, ম্যাঙ্গো ব্রুনাই কিং, রেড পালমার, কাটিমন, চিয়াং মাই, কিং অব চাকাপাত, নাম ডক মাইসহ প্রভৃতি বিদেশি জাতের আমের বাণিজ্যিক বাগান হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়ে থাকে মিয়ানমারের জাত রাংগুই ও ভারতের আম্রপালি। স্থানীয় কৃষি বিভাগ বাগানীদের আমে পোকামাকড় ও ছত্রাকমুক্ত রাখতে পরিচর্যা, বিভিন্ন বালাইনাশক ব্যবহার ও হরমোন প্রয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন কারিগরি পরামর্শ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করে থাকে। তবে পাহাড়ের আমে বালাইনাশক ব্যবহার করলেও হরমোন প্রয়োগ সীমিত।
রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নে প্রায় এক দশক ধরে আমের বাণিজ্যিক বাগান করছেন বাগান মালিক সুমেত চাকমা। মগবান ইউনিয়নে ৫০–৬০ একর ভূমিজুড়ে আমসহ অন্যান্য ফলের বাগানও রয়েছে তার। চলতি বছরে আমের ফলন ভালো হলেও দাম কম বলছেন এই বাগানী।
বাগান মালিক সুমেত চাকমা আজাদীকে বলেন, আমার মোট ৫০–৬০ একর জায়গাজুড়ে আমের বাগান রয়েছে। আশা করি চলতি মৌসুমে ১০ লাখ টাকার মতো আম বিক্রি করতে পারব। আমার বাগানে রাংগুই ও রূপালী জাতের আম গাছ রয়েছে, তবে রাংগুই বেশি। বাজারজাতকরণ ঝামেলা এড়াতে পাইকার ব্যবসায়ীদের কাছে বাগান বিক্রি করে নিই।
রাঙামাটির মৌসুমে ফলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বনরূপা সমতাঘাট। গত বুধবার সকালে বনরূপা সমতাঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বুধবার সাপ্তাহিক হাট বারে কাঁঠাল, আনারস, লিচুসহ বাজারে মৌসুমি ফল আম আসতে শুরু করেছে। বর্তমানে বাজারে রাংগুই ও আম্রপালি জাতের আম আসছে বেশি। এরমধ্যে রাংগুই জাতের আম এক ক্রেট ২০০–২৫০ টাকা, আম্রপালি আম এক ক্রেট ৫০০–৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি ক্রেটে ১৫–২০ কেজি আম বহন করা যায়।
সমতাঘাটে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া থেকে আসা পাইকার আম ব্যবসায়ী মো. সাগর ও জালাল হোসেন জানিয়েছেন, তিন বছর ধরে তারা দুজন রাঙামাটি থেকে পাইকারিতে আম কিনে নোয়াখালী অঞ্চলে বিক্রি করছেন। চলতি বছরে রাঙামাটি থেকে পর্যন্ত ৩০ মণ আম কিনেছেন।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙামাটি কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) অরুন চন্দ্র রায় আজাদীকে বলেন, কৃষি বিভাগ বাগান পরিদর্শন–পরিচর্যা, বালাইনাশক ও হরমোন ব্যবহার, বারি আম–৪, দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচলিত জাতসমূহ যেমন হিম সাগর, হাঁড়ি ভাঙা, ব্যানানাসহ বিভিন্ন দেশীয় আমের বাগান সমপ্রসারণ, প্রকল্পের মাধ্যমে বাগান চাষিদের সহায়তা, বালাইনাশকের ব্যবহার কমিয়ে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির সমপ্রসারণসহ অন্যান্য কারিগরি পরামর্শ দেয়। এছাড়াও কৃষি বিভাগ চাহিদা অনুযায়ী বাগান চাষিদের নতুন বাগান সমপ্রসারণের ক্ষেত্রে চারা সংগ্রহে সহযোগিতা করে থাকে।
তিনি বলেন, সাধারণত পাহাড়ে আম চাষে হরমোন ব্যবহার খুবই সীমিত পরিমাণে হয়ে থাকে। আমের মুকুল আসার পর মুকুল যেন ঝরে না পড়ে সেজন্য প্রয়োজনক্ষেত্রে হরমোনের সীমিত ব্যবহার হয়। এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অন্যান্য কারণে ফলন বিপর্যয় না হওয়ায় জেলায় আমের ফলন ভালো হয়েছে। এখন ফলন সংগ্রহ চলছে।
ডিএই রাঙামাটি কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান আজাদীকে বলেন, চলতি মৌসুমে রাঙামাটি জেলায় আমের ফলন ভালো হয়েছে। আমি লংগদু উপজেলাসহ বেশ কিছু বড় বাগান পরিদর্শন করেছি। তবে ফলন ভালো হলেও বাগান চাষিরা বেশি দাম পাওয়ার সুযোগ কম। এখানে কিছু জাতের আমে পোকা হয়, আবার বাজারজাতকরণে কিছুটা অসুবিধার কারণে খরচ বেশি পড়ে। কৃষি বিভাগ জেলার তিনটি উপজেলায় প্রকল্পের মাধ্যমে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির সমপ্রসারণ করছে। এছাড়া অন্যান্য উপজেলার চাষিদের ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে আমে পোকামাকড় ও ছত্রাক আক্রমণ হয় না। কিন্তু এটি কিছুটা ব্যয়বহুল, একটি ব্যাগের দাম ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা পড়ে যায়। যে কারণে চাষিরা অনেকেই অর্থাভাবে ব্যবহার করতে পারছেন না।












