দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে প্রবাসীদের

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল । দেশে এসে আটকা পড়েছেন অনেকে । ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে চাকরি হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম । দেশে ফিরতে না পেরে দুর্ভোগে অনেক পর্যটকও

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ

সীতাকুণ্ডের মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম ছয় মাসের ছুটিতে দেশে এসে ভেবেছিলেন পরিবারের সঙ্গে কিছুটা নিশ্চিন্ত সময় কাটাবেন। দুবাইয়ে কর্মরত এই প্রবাসীর ফেরার তারিখ ছিল ৩ মার্চ। টিকিট কাটা, ব্যাগ গোছানোসব প্রস্তুতিও ছিল শেষ। কিন্তু হঠাৎ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হতে থাকে। এখন তিনি না পারছেন দুবাই ফিরতে, না পারছেন নিশ্চিন্ত থাকতে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, চাকরি ঝুঁকির মুখে, আর প্রতিদিন বাড়ছে অনিশ্চয়তা। দূরের আকাশে বোমা, ড্রোন আর মিসাইলের শব্দ না শুনলেও সেই যুদ্ধের অভিঘাত গভীরভাবে কাঁপিয়ে দিচ্ছে কামরুলের জীবন। তিনি যুদ্ধের মাঝে হলেও নিজের কর্মস্থলে ফিরতে চান। উপরের তিক্ত ও অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা শুধু কামরুলের একা নয়। শত শত প্রবাসী, শ্রমিক ও পর্যটক একই দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। কেউ দেশে এসে আটকা পড়েছেন, কেউ আবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বন্দি হয়ে আছেন আতঙ্কের মধ্যে। কারও ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাচ্ছে, কারও চাকরি হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম। তাই যে কোনভাবেই তারা কর্মস্থলে ফিরতে চান। এক প্রশ্নের জবাবে কামরুল বলেন, যুদ্ধক্ষেত্র হলেও সমস্যা নেই। আমরা তো শহর থেকে দূরে থাকি। তাছাড়া শহরেও সাধারণ মানুষের উপর তো বোমা পড়ছে না। বোমা পড়ছে আমেরিকান ঘাঁটিতে, সুনির্দিষ্ট ও নিশ্চিত তথ্য রয়েছে এমন হোটেল ও স্থাপনায়। সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িতে কোন বোমা ফেলা হচ্ছে না বলেও কামরুল সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়েছেন। এখন বিমান চলাচল শুরু হলেই তিনি কর্মস্থলে ফিরে যাবেন। অপরদিকে দেশে ফিরতে না পেরে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন অনেক পর্যটক।

যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে গত পাঁচ দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যগামী ও আগত মোট ২১৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৭৩টি এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৪৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। শুধু গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম থেকে ১১টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ ও দোহার এয়ারফিল্ড বন্ধ থাকায় এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমীরাতের দুবাই, আবুধাবী ও শারজাহ এবং কাতারের দোহা ছাড়াও কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডানে ২৫ লাখের মতো বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস করেন। যাদের আসা যাওয়ার একমাত্র পথই হচ্ছে বিমান। ঢাকা এবং চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমে তারা যাতায়ত করেন। মধ্যপ্রাচ্যের যে সব দেশের সাথে চট্টগ্রামের সরাসরি বিমান যোগাযোগ নেই সেসব দেশের প্রবাসীরা সংযুক্ত আবর আমীরাত হয়ে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে আসা যাওয়া করেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় উপরোক্ত দেশগুলোর হাজার হাজার প্রবাসী দেশে এসে আটকা পড়েছেন। আবার বেড়াতে গিয়ে আটকা পড়েছেন হাজার হাজার পর্যটক, ব্যবসায়ী। যাদের অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়াতে গেছেন। তাদের অনেকেরই হোটেল বুকিং শেষ, পকেটের টাকাও প্রায় নিঃশেষ। জীবন বাঁচাতে দেশে ফিরতে চান তারা, কিন্তু বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় তারা ফিরতে পারছেন না। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, উক্ত দেশগুলো থেকে অন্য কোন দেশে গিয়ে স্বদেশের বিমান ধরবেন সেই সুযোগও নেই। যুদ্ধাবস্থার মাঝে আটকা পড়া পর্যটকেরা চরম অসহায় বোধ করছেন। অনেকেই অবর্ণনীয় দুর্ভোগ এবং ঝুঁকির মাঝে সময় পার করছেন। বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় উভয়দিকেই হাজার হাজার মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টে পড়ে গেছেন। প্রবাসীদের যেমন রুটি রুজি হুমকির মুখে তেমনি অসংখ্য পর্যটকের জীবনও হুমকির মুখে। কামরুল ইসলামের মতো অসংখ্য মানুষের দিন কাটছে চরম উৎকণ্ঠায়। একটি টিকিট, একটি ভিসা আর একটি চাকরির ওপর ঝুলে আছে যাদের ভবিষ্যৎ। যুদ্ধের আগুন হাজার মাইল দূরে জ্বললেও তার তাপ এসে যেনো লাগছে এই পরিবারগুলোতে।

অপরদিকে বিদেশে আটকা পড়া মানুষগুলোও চরম উদ্বেগ এবং উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। গতকাল বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একাধিক ফ্লাইট, ইউএসবাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এয়ার আরাবিয়ার বেশ কয়েকটি ফ্লাইট। তবে সীমিত আকারে কিছু ফ্লাইট চলাচল করেছেমাস্কাট থেকে সালাম এয়ারের একটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করে যাত্রী নিয়ে ফিরে গেছে। মদিনা ও মাস্কাট থেকে আসা আরও কয়েকটি ফ্লাইট ঢাকা ও চট্টগ্রামে নেমে পুনরায় ছেড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে কেবলমাত্র সৌদি আরব এবং ওমানের সাথে ফ্লাইট চালু রয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সবকিছু অনিশ্চিত রয়ে গেছে। ফ্লাইট চলাচল কবে শুরু বা স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তারা বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট সিডিউল নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ভ্রমণ পরিকল্পনা ঠিকঠাক করার পরামর্শ দিয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশের নির্বাচন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি শান্তিপূর্ণ হয়েছে
পরবর্তী নিবন্ধসাতকানিয়ার পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছরুয়ার কামাল