পাহাড় ধসের আশঙ্কার কথা জানিয়ে গত শুক্রবার দিন থেকেই আকবরশাহ থানার বরিশাল ঘোনা এক নম্বর ঝিল এবং ফয়’স লেক বিজয় নগর পাহাড়সহ আশেপাশের পাহাড়ে মাইকিং করে জেলা প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণভাবে যারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে তাদের জেলা প্রশাসনের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ারও অনুরোধ করা হয়। এ অনুরোধে কেউ সাড়া দেয়নি। আর সাড়া না দেয়ায় কাল হলো। শুক্রবার দিবাগত রাতে আকবরশাহ থানার পৃথক দুটি স্থানে পাহাড় ধসে প্রাণ হারায় দুই পরিবারের চারজন। আহত হয়েছেন আরো ২ জন।
এর মধ্যে গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে বরিশাল ঘোনা এক নম্বর ঝিলে পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা ঘরে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়লে চাপা পড়ে একই পরিবারের ৬ জন। এরা হচ্ছেন ফজলুল হক (৭০) ও তার স্ত্রী মোবাশ্বেরা বেগম রানু (৬২) এবং তাদের দুই সন্তান মাইনুর বেগম (২৪) ও শাহীনুর আক্তার (২৬), শাহীনুরের ৭ মাস বয়সী দুই যমজ মেয়ে তাসকিয়া ইসলাম তানহা ও তাকিয়া ইয়াসমিন তিন্নী। এ সময় প্রতিবেশীরা প্রথমে তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে।
পরে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম রাত ১টা ৫৪ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে। কর্তব্যরত চিকিৎসক মাইনুর ও শাহীনুরকে মৃত ঘোষণা করে। ফজজুল হক ও মোবাশ্বেরা বেগম বর্তমানে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তানহা ও তিন্নী সুস্থ আছে। ফজলুল হকের বাড়ি লক্ষ্মীপুর। পাঁচ-ছয় বছর আগে বরিশাল ঘোনা পাহাড়ে জায়গা কিনে বাড়ি তৈরি করেন।
এছাড়া একই রাত ৩টার দিকে ফয়’স লেক সী ওয়ার্ল্ডের পাশে বিজয় নগরে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠা অপর একটি ঘরও মাটি চাপা পড়ে। এতে ঘটনাস্থলে মারা যান দুই ভাই লিটন (২৩) ও ইমন (১৪)। স্থানীয় লোকজন তাদের মরদেহ উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করে। লিটন ও ইমন ফিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার মুজিবুর রহমানের ছেলে। দুর্ঘটনার সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা পাশের আরেকটি ঘরে ছিল। তারা কেউ আহত হননি। ইমন আকবর শাহ সি ব্লক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ও লিটন একটি পোশাক তৈরি কারখানার ব্লক প্রিন্টার্স পদে কর্মরত ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন লিডার উচিন মারমা আজাদীকে বলেন, শুক্রবার রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টির সময় আকবরশাহ থানার এক নম্বর ঝিল এলাকায় পাহাড় ধসে একটি পরিবারের সদস্যরা চাপা পড়েন। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। শনিবার ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত উদ্ধার কাজ চলে।
আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়ালি উদ্দিন আকবর বলেন, বিজয় নগর দুর্ঘটনায় দুই ভাই ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়। দুটি পাহাড় ধসের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানান তিনি।
পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাদেকুর রহমান বলেন, রাতে আকবর শাহ থানার ১ নম্বর ঝিলের বরিশাল ঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে আহত ৫ জনকে চমেক হাসপাতালে আনা হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মধ্যে ২ জনকে মৃত ঘোষণা করেন। বাকিদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
এদিকে গতকাল সকালে বরিশাল ঘোনায় গিয়ে দেখা গেছে, পাহাড় ঘেঁষে ফজলুল হকের টিনশেডের ঘরটি তৈরি করা হয়েছে। পাহাড়ের মাটিতে চাপা পড়া অবস্থায় ছিল ঘরের প্রায় অর্ধেক। অক্ষত অবস্থায় ঘরের মাঝখানে একটি নারকেলগাছও দেখা গেছে।
৯ নং উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম বলেন, বৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই আমরা মাইকিং করেছি। সরে যেতে বলেছি। বার বার অনুরোধ করার পরও কেউ সরেনি। সরে গেলে আজ এ করুণ দশা হতো না।
সোহেল নামে স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এখানে যারা থাকে সবাই গরিব মানুষ। অন্য জায়গায় ভাড়া বেশি। এখানে কম ভাড়া। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েও সবাই থাকছে।
এদিকে গতকাল দুপুরে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় মেয়র পাহাড় ধসে নিহতদের পরিবারের সাথে দেখা করে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সমবেদনা জানান। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে বলে জানান তিনি। এখনো পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে যারা বসবাস করছেন তাদের নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্যানেল মেয়র মো. গিয়াস উদ্দীন, ওয়ার্ড স্থানীয় কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম, স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মনীষা মহাজন ও প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে, যেখানে আশ্রয় গ্রহণকারীদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাহাড় ধসে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পাহাড়ের ঢালুতে অবস্থিত অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে।











