মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দুইদিনের সফর শেষে চীন ছাড়ার সময় এমন কিছু বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে গর্ব করেছেন, যা বিনিয়োগকারীদের খুব একটা খুশি করতে পারেনি। এদিকে একই সফরে বেইজিং ওয়াশিংটনকে তাইওয়ান নিয়ে ‘ভুল করার’ ব্যাপারে সতর্কবার্তা যেমন দিয়েছে, তেমনি ইরানে যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু করাই ঠিক হয়নি তাও বুঝিয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের মাটিতে প্রায় এক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পা পড়ল। এর আগে সর্বশেষ ২০১৭ সালে ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট হিসেবে এশিয়ার দেশটিতে গিয়েছিলেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পড়তে থাকা জনসমর্থন কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প এবারের চীন সফরে যান। জাঁকজমকে ভরা তার এ সফরে চীনা সেনাদের কুশলী পদচারণায় মুখরিত উষ্ণ অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে বিলাবহুল ভোজসভা, গোপন বাগান ঘুরে দেখাসহ সবই হয়েছে। ট্রাম্পও তার মন্তব্যে বারবারই আয়োজকদের ভূয়সী প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। ঝোংনানহাই কমপ্লেঙে বৈঠক শেষে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ট্রাম্প বলেন, এটা এক অসাধারণ সফর। এটা থেকে ভালো কিছু বেরিয়ে এসেছে বলে আমি মনে করি। খবর বিডিনিউজের।
ঝোংনানহাইয়ের এ কমপ্লেঙ একসময় রাজকীয় বাগান ছিল, এখন সেটি চীনা নেতাদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ বাগানে বিদেশি অতিথিদের নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশ বিরল। বৈঠক শেষে দুই প্রেসিডেন্ট লবস্টার বল ও কুং পাও স্ক্যালপসসহ নানান খাবারে আহার সারেন।
গতকালের এ বৈঠকের আগে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বিবৃতিটি দিয়েছিল তাতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে সুস্পষ্ট হতাশা প্রকাশ পেয়েছিল। তারা বলেছে, কখনোই হওয়া উচিত ছিল না যে সংঘাত, তা অব্যাহত রাখার কোনো কারণ থাকতে পারে না। সঙ্গে এও বলেছে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এ যুদ্ধ বন্ধে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টায় চীন সহায়তা করছে। ঝোংনানহাইয়ে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ও শি ইরান নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এ প্রসঙ্গে তাদের অনুভূতি ‘খুব কাছাকাছি’ ধরনের। তবে শি এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেননি।
এবারের সফরে ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে চীনের সহায়তা চাইতে পারেন বলে বিশ্লেষকরা আগেই ধারণা দিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্পের এ আহ্বানেও যে খুব একটা কাজ হবে না সে বিষয়েও প্রায় নিশ্চিত ছিলেন তারা। তাদের মতে, মার্কিন আধিপত্যবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান বিবেচনায় তেহরানকে চাপ দিতে বেইজিংয়ের খুব বেশি আগ্রহ থাকার কথা নয়। যদিও ট্রাম্প শি–র সঙ্গে প্রথমদিনের বৈঠক শেষে ফঙ নিউজের শন হ্যানিটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চীন ইরানে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ বন্ধে রাজি হয়েছে বলে দাবি করেছেন। বেইজিংয়ের দিক থেকে এখনও এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
গত বৃহস্পতিবারের আলোচনা নিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সংক্ষিপ্ত ভাষ্য বলছে, ইরানলাগোয়া হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে ট্রাম্প ও শি ‘যৌথ আকাঙ্ক্ষা’ ব্যক্ত করেছেন। সঙ্কীর্ণ ওই জলপথ দিয়েই যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস গন্তব্যে যেত। পশ্চিম এশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে শি যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন তাও ওই ভাষ্যে উঠে এসেছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতি বিষয়ক ফেলো প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, ইরান বিষয়ে কিছু করার বিষয়ে চীনের কাছ থেকে সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি।
চীনে কৃষিপণ্য বিক্রির ব্যাপারে চুক্তি এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া ঠিক করার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। দুই দেশ শিগগিরই তিন হাজার কোটি ডলারের অ–সংবেদনশীল পণ্য ঠিক করবে বলেও আশা করা হচ্ছে। এসব চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। এনভিডিয়া’র প্রধান নির্বাহী জেনসেন হোয়াং শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হলেও চীনে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির অত্যাধুনিক এইচ২০০ এআই চিপ বিক্রির ব্যাপারে কোনো সমঝোতার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
ট্রাম্প ফঙ নিউজকে বলেছেন, চীন ২০০টি বোয়িং জেট কিনতে রাজি হয়েছে। সেটা হলে প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবার বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বাণিজ্যিক বিমান কিনতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ সফরে চীন ৫০০–র মতো বোয়িং জেট কিনবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। সে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ট্রাম্পের ঘোষণার পর বোয়িংয়ের শেয়ারমূল্য ৪% পড়ে যায় বলে জানিয়েছে রয়টার্স।













