দেশের সবচেয়ে বড় আয়ের খাত পোশাকশিল্প অতিক্রম করছে সংকটকাল। যদিও দেশের পোশাকশিল্পকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয়। কেননা ৪ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন–জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ। সাম্প্রতিককালে এই খাত তীব্র অস্থিরতা ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দি ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ আপাতত থামলেও তার অভিঘাত টের পাচ্ছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতিতে দেশের শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প চাপে পড়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্পিনিং, নিটিং ও ডাইং মিলগুলো ব্যাপকভাবে গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যালনির্ভর। বাস্তবতা হলো, এই তেল ও গ্যাসের প্রায় ৯৫ শতাংশই আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় গেছে বেড়ে। এর মধ্যে গত ৬ জুন বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল–মুসলিম গ্রুপ তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানার প্রায় ১ হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাঁদের বেশির ভাগই নারী। পশ্চিমা ব্র্যান্ড যেমন জারা ও এইচঅ্যান্ডএমের জন্য পোশাক তৈরি করেন তাঁরা। এই শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ৪ কোটি মানুষ। সংখ্যাটির তাৎপর্য হলো, এটি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক–চতুর্থাংশ। গত বছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের পাঁচ ভাগের চার ভাগই এসেছে পোশাক খাত থেকে, জিডিপিতেও তার অবদান ১৩ শতাংশ। পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের ওপরে আছে শুধু চীন। তবে এই খাত আগে থেকেই সংকটে আছে। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন গণ–অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় ধাক্কা লাগে বলে মন্তব্য করেন শিল্প বিশ্লেষক মেহেদী মাহবুব। সেই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, পাঁচটি কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের কারাবন্দী বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতারও পোশাক কারখানা ছিল। গত তিন বছরে ৪০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে। গত মে মাসে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকত। চট্টগ্রামের কোথাও কোথাও দিনে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। উৎপাদন চালিয়ে যেতে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে; বছরওয়ারি হিসাবে তা কমেছে ৮ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করছে। যেমন বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা: ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বিভাজন সরবরাহ চেইন ও ভোক্তা আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে; আছে অর্থনৈতিক চাপ: ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ সুদহার ও মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তারা পোশাকের মতো পণ্যে ব্যয় কমাচ্ছেন। এছাড়া আছে অর্ডার রি–শাফলিং: ক্রেতারা কম দামে, কম ঝুঁকির উৎস খুঁজছেন; ভিয়েতনাম, ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। সর্বোপরি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: জ্বালানি, কাঁচামাল ও লজিস্টিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ কঠিন হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্ববাজারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাময়িকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি মন্দা দেখা দিয়েছে। তবে বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং নতুন বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারে চাহিদা বাড়াতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। রপ্তানি খাতের জন্য সরবরাহ চেইন, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনশীল চাহিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে পোশাকশিল্প দুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে কারখানায় ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ছে। আবার দীর্ঘ সময় ধরে চালু থাকার কারণে জেনারেটর বিকল হচ্ছে। এতে পোশাক উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী দিনে আরও বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়; এটি কোটি মানুষের জীবিকার উৎস। তাই এই সংকট মোকাবেলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।










