আশুরা: আত্মত্যাগ, ন্যায় ও মানবতার অনন্য শিক্ষা

| শুক্রবার , ২৬ জুন, ২০২৬ at ৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ

মহররম মাসের ১০ তারিখ, পবিত্র আশুরা, মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক জীবনে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনটি মুসলমানদের কাছে গভীর শ্রদ্ধা, ভাবগাম্ভীর্য ও আত্মসমালোচনার উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আশুরা শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়; এটি এমন এক চেতনার প্রতীক, যা মানুষকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এবং নৈতিক আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করে। বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা, সংঘাত ও মূল্যবোধের সংকটের প্রেক্ষাপটে আশুরার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

ইসলামি ঐতিহ্যে আশুরার গুরুত্ব বহুমাত্রিক। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুসারে, এ দিন মহান আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (.) ও তাঁর অনুসারীদের ফিরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ দিনের রোজা পালনের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন এবং এটিকে মর্যাদাপূর্ণ আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলে আশুরা মুসলমানদের জন্য কৃতজ্ঞতা, ইবাদত, আত্মসংযম ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

তবে আশুরার ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অধ্যায় নিঃসন্দেহে কারবালার ঘটনা। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররমে ইরাকের কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত এই ঘটনা শুধু মুসলিম ইতিহাসের নয়, সমগ্র মানবসভ্যতার ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) ক্ষমতা ও অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ না করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজও বিশ্বমানবতার জন্য প্রেরণার উৎস। তিনি জানতেন, তাঁর অবস্থানের মূল্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। তবুও তিনি নৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। পরিবারপরিজন ও অল্পসংখ্যক সঙ্গী নিয়ে তিনি যে আত্মত্যাগের ইতিহাস রচনা করেছেন, তা যুগে যুগে মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়ে আসছে।

কারবালার শিক্ষা মূলত নৈতিকতার শিক্ষা। এটি আমাদের শেখায় যে সত্যের প্রশ্নে আপস করা যায় না, ন্যায়ের প্রশ্নে নীরব থাকা যায় না এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাময়িকভাবে শক্তিশালী মনে হলেও অন্যায় ও জুলুম কখনো স্থায়ী বিজয় অর্জন করতে পারে না। বরং ত্যাগ, আদর্শ ও নৈতিক সাহসই শেষ পর্যন্ত মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। কারবালার ঘটনা সেই চিরন্তন সত্যেরই প্রতীক।

আজকের বিশ্বে এই শিক্ষা নতুন তাৎপর্য নিয়ে সামনে আসে। যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন আমাদের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা সাফল্যের মধ্যেও বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের সংকট স্পষ্ট। এমন বাস্তবতায় আশুরা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নাম নয়; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা ন্যায়, মানবিকতা এবং জবাবদিহির ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও আশুরার শিক্ষা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য সততা, দায়িত্বশীলতা এবং আইনের শাসনের কোনো বিকল্প নেই। সমাজে যখন অসহিষ্ণুতা, দুর্নীতি কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের প্রাধান্য দেখা যায়, তখন কারবালার আদর্শ আমাদের নতুন করে আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সব পর্যায়ে নৈতিকতার চর্চা জোরদার না হলে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। আশুরা সেই নৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়।

আশুরা আমাদের সমপ্রীতি ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এ দিন নানা আচারঅনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হলেও এর কেন্দ্রীয় বার্তা একটিই সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান এবং মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ। বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতাই হওয়া উচিত এ দিনের চেতনা।

নতুন প্রজন্মের কাছে আশুরার প্রকৃত ইতিহাস ও শিক্ষা তুলে ধরা সময়ের দাবি। কারণ আদর্শ, নৈতিক সাহস এবং দায়িত্ববোধ ছাড়া কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে উন্নতির পথে এগোতে পারে না। কারবালার ঘটনা তরুণদের শেখায় যে জনপ্রিয়তা বা ক্ষমতার চেয়ে নৈতিক অবস্থান অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং সত্যের পথে অবিচল থাকাই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

পবিত্র আশুরা তাই কেবল অতীতের একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক শক্তিশালী দিকনির্দেশনা। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে যদি আমরা আশুরার চেতনাকে ধারণ করতে পারি, তবে ন্যায়, মানবতা ও সহমর্মিতাভিত্তিক একটি উন্নত সমাজ গঠন সম্ভব হবে। কারবালার আত্মত্যাগ আমাদের সেই শিক্ষা দেয় যে সত্যের পথ কখনো সহজ নয়, কিন্তু সেই পথই শেষ পর্যন্ত মানুষের মর্যাদা ও ইতিহাসের সম্মান নিশ্চিত করে। আশুরার মূল বার্তা তাই আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা এবং মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে