শাহানশাহ্ হযরত মাওলানা সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) তিন আধ্যাত্মিক মহা মনীষীর আশীর্বাদপুষ্ট এক মহান অলি এবং মাইজভাণ্ডারী আধ্যাত্মিক সাধনার ইতিহাসে এক বিশিষ্ট নাম। তিনি সূফি মতবাদের ধারক ও বাংলাদেশের জমিনে প্রবর্তিত ‘মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকা’র প্রবর্তক গাউসুল আ’যম হযরত মাওলানা শাহ্সূফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর প্রপৌত্র, অসিয়ে গাউসুল আযম, মুর্শিদে কামেল খাদেমুল ফোক্বারা হযরত মাওলানা শাহ্সূফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর জ্যেষ্ঠপুত্র এবং গাউসুল আযম বিল বিরাসাত হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারী (ক.) এর দৌহিত্র। ১৯২৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে তাঁর জন্ম ১৯৮৮ সালের ১২ অক্টোবর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।
শাহানশাহ্ হযরত মাওলানা সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর মহান অলির মর্যাদা প্রাপ্তির পশ্চাতে রয়েছে কঠোর রিয়াজত–সাধনা।
সুফি সাধনায় রিয়াজত শুধু দৈহিক কষ্ট সহ্য করার নাম নয়; এর উদ্দেশ্য নফসকে সংযত করা, প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আত্মাকে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের উপযোগী করে তোলা। শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর জীবনেও এই সাধনার কঠোর প্রকাশ ঘটেছিল।
তাঁর রিয়াজত সম্পর্কে তাঁর অনুসারীদের প্রচলিত স্মৃতিকথা ও বর্ণনায় জানা যায়, প্রচণ্ড শীতের রাতে তিনি পুকুরের ঠাণ্ডা পানিতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতেন। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা একাগ্র সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন, কখনো কয়েক দিন নির্জনে অবস্থান করতেন। খালি পায়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা, স্বাভাবিক আরাম–আয়েশ পরিহার করা এবং ক্ষুধা–নিদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার মতো কঠোর অনুশীলনও তাঁর সাধনজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এসব ঘটনা তাঁর আত্মসংযম, দৃঢ়তা ও সাধনার প্রতি গভীর নিষ্ঠার পরিচয় বহন করে।
তবে তাঁর রিয়াজতের আসল তাৎপর্য বাহ্যিক কষ্টে নয়, অন্তরের পরিবর্তনে। নামায, জিকির, হালাল রুজি, সত্যবাদিতা, কর্মনিষ্ঠা, জ্ঞানচর্চা ও মানবপ্রেম এসব ছিল তাঁর সাধনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর বহুল উদ্ধৃত বাণী, ‘হালাল খাও, নামায পড়, আল্লাহ্ আল্লাহ্ জিকির কর, সব সমস্যা মিটে যাবে’ তাঁর জীবনদর্শনের সারকথারই যেন সংক্ষিপ্ত প্রকাশ।
নামাযের প্রতি তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। কেউ রোগমুক্তি বা বিপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য তাঁর কাছে দোয়া চাইলে তিনি অনেক সময় নামাযের প্রতি মনোযোগী হতে বলতেন। তাঁর কাছে আধ্যাত্মিকতা ছিল শুধু অলৌকিক প্রত্যাশা নয়; বরং ইবাদত ও সৎ জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে নিজেকে সংশোধনের প্রয়াস। পার্থিব ভোগ–বিলাস থেকেও তিনি নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। অর্থ–সম্পদকে প্রয়োজনের চাহিদা হিসেবে দেখলেও তাকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করতেন না। অসৎ উপায়ে অর্জিত সম্পদকে তিনি অপবিত্র মনে করতেন এবং হালাল রুজির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। একইভাবে অলসতার পরিবর্তে কর্ম, অজ্ঞতার পরিবর্তে জ্ঞান এবং সংকীর্ণতার পরিবর্তে মানবপ্রেমকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল তাঁর সাধনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ধনী–দরিদ্র বা উচ্চ–নিচের ভেদাভেদ তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ‘আল্লাহ্র অলির দরবারে আমির–ফকিরের কোনো তফাৎ নেই’ এই বাণীর মধ্যে তাঁর সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর দরদ তাঁর আধ্যাত্মিকতার মানবিক দিকটিকে আরও উজ্জ্বল করে।
রিয়াজত থেকে কারামত:
শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর জীবনে রিয়াজত ও কারামতকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। রিয়াজত ছিল তাঁর আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সাধনাপথ, আর কারামত ছিল সেই সাধনার সঙ্গে যুক্ত বিশেষ আধ্যাত্মিক প্রকাশ। মাইজভাণ্ডারী বিশ্বাসে এর প্রকৃত উৎস আল্লাহ্র কৃপা। অর্থাৎ কারামত তাঁর সাধনার লক্ষ্য ছিল না; বরং ইবাদত, আত্মসংযম ও আল্লাহ্র প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত বিশেষ আধ্যাত্মিক মহিমা।
তাঁর জীবনের কারামত সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, কোনো কোনো সময় তিনি হঠাৎ দীর্ঘ সময়ের জন্য নির্জনে চলে যেতেন এবং কয়েক দিন ঘরের দরজা না খুলে অবস্থান করতেন। আবার কখনো কাউকে কিছু না জানিয়ে মাইজভাণ্ডার থেকে পায়ে হেঁটে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে চলে যেতেন। তাঁর অনুসারীরা এসব ঘটনাকে তাঁর গভীর আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন।
অলিদের সঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিক যোগাযোগের কথাও ভক্তদের বর্ণনায় পাওয়া যায়। সমকালীন বিভিন্ন অলি–আল্লাহ্র সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষাৎ, ইশারা–ইঙ্গিতে কথোপকথন এবং বিভিন্ন অলির মাজার জিয়ারতের ঘটনাগুলো তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদার আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদা প্রকাশের ক্ষেত্রে সবুজ জুব্বার ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মাইজভাণ্ডারী ঐতিহ্য অনুযায়ী, সাধনার এক পর্যায়ে গাউসুল আ‘যম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর স্বপ্নাদেশে তাঁর পিতা হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর সবুজ জুব্বা তাঁকে পরিয়ে দেওয়া হয় এবং এর মাধ্যমে তিনি বেলায়তে ওজমার অধিকারী হন ও অলিদের সর্বশ্রেষ্ঠ মোকামে সমাসীন হন। মাইজভাণ্ডারী ঐতিহ্যে আরো বর্ণিত হয় যে, বিভিন্ন বুজুর্গ ও অলির স্বপ্ন দর্শনের মধ্য দিয়েও তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদার স্বীকৃতির কথা জানা যায়। ভক্তদের বিশ্বাসে, এটি তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও বেলায়তের বিশেষ প্রকাশের প্রতীক।
তাঁর কাছে অসুস্থ, বিপদগ্রস্ত মানুষও আসতেন। তাঁদের অনেককে তিনি নামায, জিকির কিংবা কোরআন তিলাওয়াতের নির্দেশ দিতেন। যেমন, হৃদরোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি দোয়া চাইলে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াতের নির্দেশ দেওয়ার কথা তাঁর অনুসারীদের বর্ণনায় পাওয়া যায়। এসব ঘটনায়ও দেখা যায়, তাঁর আধ্যাত্মিক নির্দেশনা মানুষকে ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির দিকেই ফিরিয়ে দিত।
তাঁর কিছু বাণী ও ইঙ্গিতকেও অনুসারীরা বিশেষ আধ্যাত্মিক উপলব্ধির নিদর্শন হিসেবে দেখেন। বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্য এবং মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা সম্পর্কে তাঁর বিশেষ অন্তর্দৃষ্টির কথাও প্রচলিত রয়েছে। মাইজভাণ্ডারী ভক্তসমাজে এগুলো তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের স্মৃতি ও বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) ছিলেন নিজেই একটা জীবন্ত কারামত। তিনি ছিলেন এমন এক মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব যাঁকে দেখলেই অবচেতনভাবেই ভক্তি শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়তে ইচ্ছে করতো। ভক্তসমাজে প্রচলিত তাঁর উল্লেখযোগ্য কারামতসমূহের মধ্যে ‘তেল ছাড়া গাড়ি চালানো’র ঘটনা সর্বাধিক পরিচিত ও প্রচারিত।
কারামতের এইসব বর্ণনার মধ্যেও তাঁর নিজের সাধনাদর্শের মূল শিক্ষা ছিল আত্মশুদ্ধি। তাঁর অমর বাণী ‘নিজের ভেতরে দৃষ্টি দাও, বহির্জগতের চেয়েও অপরূপ সুন্দর দৃশ্যাবলী দেখতে পাবে’ মানুষকে বাহ্যিক বিস্ময়ের চেয়ে অন্তরের জগত আবিষ্কারের আহ্বান জানায়। আত্মসমালোচনা ও আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষের অন্তর পরিশুদ্ধ হয় এই উপলব্ধি তাঁর সাধনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তাই তাঁর রিয়াজত ও কারামতের সম্পর্ককে এক বাক্যে বলা যায় রিয়াজত ছিল সাধনার ভিত্তি, আর কারামত ছিল সেই সাধনার সঙ্গে যুক্ত আধ্যাত্মিক প্রকাশ; তবে রিয়াজতের উদ্দেশ্য কারামত অর্জন নয়, বরং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা। এই উপলব্ধিই তাঁর জীবনকে কেবল অলৌকিকতার কাহিনি থেকে একটি গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষায় পরিণত করে। শাহানশাহ্ হযরত মাওলানা সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) একজন মহান মানব প্রেমিক। লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানবতার জন্য তাঁর ছিল সীমাহীন দরদ ও মমত্ববোধ।
সাধনার ধারাবাহিকতা ও মানবকল্যাণ:
শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানবকল্যাণের আদর্শ তাঁর জীবনাবসানের সঙ্গে থেমে যায়নি। মাইজভাণ্ডারী ঐতিহ্যে তা উত্তরসূরিদের মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফস্থ গাউসিয়া হক মনজিলের সাজ্জাদানশীন রাহবারে আলম হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মাঃজিঃআঃ)-এর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) তাঁকে উদ্দেশ করে বলেছেন বলে মাইজভাণ্ডারী ঐতিহ্যে বর্ণিত ‘আমার হাসান মিয়া মস্ত বড় অলি, জগতের কল্যাণের জন্য এসেছেন, সাধ্যমত সমীহ–সম্মান করবেন।’
এই বাণী অনুসারীদের কাছে তাঁর উত্তরসূরির আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও মানবকল্যাণমূলক ভূমিকার প্রতি এক বিশেষ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত। তাঁর নেতৃত্বে মাইজভাণ্ডার দরবারের আধ্যাত্মিক আদর্শের পাশাপাশি দুস্থ ও অসহায় মানুষের কল্যাণে, স্বাস্থ্য চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে ও শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্ট, মাইজভাণ্ডারী গাউসিয়া হক মনজিল এবং এর বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে মানবসেবা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার যে ধারাটি গড়ে উঠেছে, তা শাহানশাহ্র মানবপ্রেম ও কল্যাণচিন্তারই একটি সামাজিক প্রতিফলন হিসেবে অনুসারীরা দেখেন।
এভাবেই তাঁর সাধনার ধারাবাহিকতা আধ্যাত্মিকতার গণ্ডি পেরিয়ে মানবকল্যাণের কর্মক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। এই দৃষ্টিতে শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর জীবন ও সাধনা অনুসারীদের কাছে প্রেরণার উৎস। শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর জীবন তাই শুধু কঠোর সাধনা ও কারামতের স্মারক নয়; এটি আত্মসংযম, ইবাদত, সত্য, হালাল রুজি, কর্ম, জ্ঞান এবং মানবপ্রেমেরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর সাধনার আলো বাহ্যিক বিস্ময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের অন্তর ও জীবনকে আলোকিত করুক এই হোক তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কবি ও গীতিকার।












