সাগরপাড়ে শুঁটকিতে সোনালি দিনের স্বপ্ন

আনোয়ারায় মৌসুমের শুরুতে ব্যস্ত মৎস্যজীবীরা মাছের সরবরাহ কম থাকায় উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা

এম. নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা | শনিবার , ৭ নভেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে আনোয়ারার বঙ্গোপসাগর উপকূলে শুরু হয়েছে শুঁটকি তৈরির ধুম। সাগর থেকে আহরিত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৎস্যজীবীরা। উপকূলের বিভিন্ন স্থানে সারি সারি বিছিয়ে রাখা হয়েছে ছোট চিংড়িসহ নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। শীতের রোদ আর সাগরের বাতাস কাজে লাগিয়ে চলছে শুঁটকি উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ। তবে মৌসুমের শুরুতে সাগরে আশানুরূপ মাছ ধরা না পড়ায় উৎপাদন নিয়ে কিছুটা শঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর মধ্যে শুঁটকি অন্যতম। বিশেষ করে শীতকালীন সবজির সঙ্গে শুঁটকির তরকারি, ভর্তা ও ভুনা বাঙালির খাদ্যতালিকায় বেশ জনপ্রিয়। স্বাদ ও বৈচিত্র্যের কারণে চট্টগ্রামের শুঁটকির কদর রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও। ফলে শীত মৌসুম এলেই শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণনকে ঘিরে উপকূলীয় এলাকায় বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য। লাভের আশায় মৎস্যজীবীদের পাশাপাশি আড়তদার ও স্থানীয় উদ্যোক্তারাও এ ব্যবসায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

সরেজমিনে আনোয়ারার গহিরা উপকূল ঘুরে দেখা যায়, পরুয়াপাড়ার ফুলতলী এলাকায় বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বেড়িবাঁধে ছোট চিংড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ শুকানোর কাজ চলছে। কেউ কাঁচা মাছ বাছাই করছেন, কেউ রোদে বিছিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ শুকানো মাছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ব্যস্ত। একই চিত্র দেখা গেছে বার আউলিয়া, উঠান মাঝি, বাইগ্যার ঘাট, দোভাষী ঘাট ও গলাকাটা ছত্তার মাঝি ঘাটসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায়।

স্থানীয় মৎস্যজীবীদের দাবি, প্রাকৃতিক উপায়ে রোদে শুকানো এসব শুঁটকি তৈরিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা বিষাক্ত দ্রব্য ব্যবহার করা হয় না। ফলে স্বাদ ও মানের কারণে স্থানীয় বাজারে এসব শুঁটকির চাহিদা বেশি।

এদিকে, বঙ্গোপসাগরে টানা ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষে গত ২৯ অক্টোবর থেকে আবারও সাগরে নেমেছেন জেলেরা। তবে নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরা শুরু হলেও প্রথম দিকে প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বলে বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার জেলেদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। এর প্রভাব শুঁটকি উৎপাদনেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আনোয়ারার গহিরা উপকূলীয় বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মৎস্যজীবী মো. ইদ্রীস বলেন, ‘আনোয়ারায় সাত হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ জন উপকূলে শুঁটকি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া পূর্ব গহিরা, ঘাটকূল ও ফকিরহাট এলাকার কয়েকশ জেলে মাছ ধরার ট্রলারেই ছুরি, লইট্যা, পোপা ও পাইস্যাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকিয়ে থাকেন।’

তিনি আরও জানান, অনেক জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে রাঙ্গাবালী ও সোনাদিয়া এলাকায় ট্রলারেই শুঁটকি তৈরি করেন। তাঁর দাবি, স্থানীয় জেলেদের উৎপাদিত শুঁটকিতে লবণ বা বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। এ কারণে এসব শুঁটকি সুস্বাদু ও ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়।

গহিরার বাসিন্দা মৎস্যজীবী হেমন্ত জলদাশ বলেন, ‘বর্তমানে উপকূলে মূলত ছোট চিংড়ির শুঁটকি, যা স্থানীয়ভাবে ইছা শুঁটকি নামে পরিচিত, তৈরি হচ্ছে। এ বছর এখনো ছুরি ও অন্যান্য প্রজাতির মাছ আশানুরূপ ধরা পড়ছে না। সাগরে মাছের পরিমাণ কম। তবে শীতের মৌসুম শুরু হয়েছে। আশা করছি, সামনের জোয়ারগুলোতে মাছের পরিমাণ বাড়বে।’

মৎস্যজীবী কালু মিয়া বলেন, ‘অধিকাংশ জেলে পাইকারি বাজার থেকে কাঁচা মাছ কিনে ইছা শুঁটকি তৈরি করেন। এটি শুকাতে তুলনামূলক কম সময় লাগে। ফলে দ্রুত বাজারজাত করা যায় এবং লাভের সম্ভাবনাও বেশি থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গহিরায় উৎপাদিত শুঁটকির স্থানীয় বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে। এলাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় এসব শুঁটকি দিয়ে নানা ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রামের চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারেও আমাদের শুঁটকি সরবরাহ করা হয়।’

আনোয়ারার মৎস্যজীবীদের মতে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং সাগরে মাছের সরবরাহ বাড়ার ওপর চলতি মৌসুমের শুঁটকি উৎপাদন অনেকটাই নির্ভর করছে। মাছের আহরণ বাড়লে আগামী দিনগুলোতে উপকূলজুড়ে শুঁটকি তৈরির ব্যস্ততা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তাঁরা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসেন্টমার্টিনে পর্যটকদের নিরাপত্তায় কোস্ট গার্ডের নজরদারি