২৯ মে বরাবরই বিশ্ব শান্তি রক্ষা দিবস পালিত হয়। আমাদের দেশে এবার পালিত হল ১০ জুন। এর কারণই ঈদুল আজহার ছুটি। পৃথিবীর দেশে দেশে শান্তিরক্ষায় আত্মউৎসর্গকারী আমাদের অকুতোভয় সৈনিকদের কথা মনে রেখে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে আমার জীবনের ঝুঁকি নেওয়া অধ্যায়ের খণ্ডাংশ পাঠকদের জন্য নিবেদন করছি।
স্রষ্টা তার শ্রেষ্ঠ এবং মহত্তম সৃষ্টি মানুষকে জীবন যাপনের জন্য একবারই দান করেন। যাপিত জীবনে মানুষ তথা মানবজাতি একদিকে মানব জীবনকে সুস্থ সুন্দর এবং আনন্দ মুখর করার জন্য খরা, পীড়া, ক্ষুধা তথা দারিদ্রের বিরুদ্ধে যেমন নিয়তই সৃষ্টিশীল উৎপাদনমুখী তেমনি অন্যদিকে জাতিতে–জাতিতে, গোত্রে–গোত্রে হানাহানির ছদ্মাবরণে দাসত্ব প্রথা–তারপর সাম্রাজ্য বিস্তার আর বর্তমানে বাজার দখল আর সম্পদ লুণ্ঠনের অভীপ্সায় নিত্য নতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষকে দিয়ে মানুষ হত্যার উম্মাদনায় মত্ত।
এমন এক পটভূমিতে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য হিসাবে আমার পৃথিবীর বুকে হার্ট অব ডার্কনেস খ্যাত কঙ্গো গমন। তখন ৯১টি দেশের ১৮০০০ (আঠার হাজার) শান্তি রক্ষী কঙ্গোয় বর্তমান। কঙ্গো বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় ১৮ গুণ বড়। কঙ্গো তখন পৃথিবীর ভয়াবহতম মানব হত্যায় উন্মত্ত একটি অঞ্চল। এই সংঘাত–খুনাখুনির পিছনে অন্যতম কারণ হিসাবে দেখা হয় কঙ্গোতে পৃথিবীর বৃহত্তম স্বর্ণ খনি মংবালুর মত অজস্র খনি আর খনিজ সম্পদের উপস্থিতি। এই সম্পদ লুণ্ঠনে বহুজাতিক কোম্পানীগুলির লোলুপ দৃষ্টিও সংঘাতের লেলিহানে ইন্ধন যোগায়। এই অঞ্চলের ইন্দোকিতে আমার কঙ্গো পৌঁছার পূর্বে লেন্দুরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে আমাদের একটি টহল দলের ৯ (নয়) জন সদস্যকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। আমার উপস্থিতিতে লেইক আলবার্ট সন্নিহিত পৃথিবীর অন্যতম জীব বৈচিত্র্যে ভরা গারাম্বা পার্কে উরুগুয়ে প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের একটি প্লাটুনকে লর্ডস রেসিস্টেন্স আর্মি’র যোগ সাজসে লেন্দুরা শুধু হত্যাই করেনি ঐ সব হতভাগ্য সৈন্যদের দেহাবশেষ দেখার দুর্ভাগ্য আমাদের যাদের হয়েছিল তাদের জীবনে ঐ লোমহর্ষকতার দুঃসহ স্মৃতি কখনো মুছে যাওয়ার নয়।
এমন এক প্রেক্ষাপটে ২৭ মে ২০০৬ গোধুলি সন্ধ্যায় ইথুরির (পূর্ব ওরিয়েন্টাল প্রদেশের রাজধানী) উপকণ্ঠে তৎকালীন ইথুরী ব্রিগেড কমান্ডারের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাতের একান্তে তিনি আমাকে জানান কিসাঙ্গানী (ডিভিশন সদর দপ্তর) থেকে ইস্টার্ন ডিভিশন কমান্ডার জেনারেল ক্যামার্ট (জাতিসংঘে নিযুক্ত নেদারল্যান্ড সেনাবাহিনীর জেনারেল) দক্ষিণ আফ্রিকীয় গোয়েন্দা সূত্র থেকে জানতে পেরেছেন পিটার করিম রাত যাপনের জন্য লানার কলিবা নামক একটি জায়গায় আসবেন, এবং তাকে আদেশ দিয়েছেন ঐ রাতেই পিটার করিমকে পাকড়াও করতে হবে।
পিটার করিম– বয়স ৩৫ থেকে ৪০– হালকা পাতলা গড়নের। আসল নাম ‘করিম উদাগা’ বিখ্যাত রাশিয়ান জেনারেল ‘পিটার দ্যা গ্রেট’ এর নাম থেকে করিম তার নামের আগে পিটার শব্দটি বসিয়ে নেন। এই পিটার করিম এক কথায় সমগ্র পূর্বাঞ্চলীয় কঙ্গো এবং তৎসন্নিহিত অঞ্চল সমূহে এক মূর্তিমান ত্রাসের নাম।
তার তৎকালীন গেরিলা যোদ্ধাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ছয় হাজারের উপর। পিটারের অনুগত সৈন্যরা যেমন বিশ্বাসী তেমনি দুর্ধর্ষ, যেমন হিংস্র তেমনি মরণজয়ী। তখন ও পর্যন্ত না জাতিসংঘ না কঙ্গোলীজ সেনাবাহিনী কারো কাছে পিটার করিমের কোন ছবি পর্যন্ত ছিল না। পিটার করিম এমনই ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। পিটার করিম সারা আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে তখন এক লিজেন্ড আবার অনেকটা গ্রীক মিথের মত।
পূর্বের ঘটনায় ফিরে আসি, ডিভিশন কমান্ডারের আদেশ অনুযায়ী ইথুরি ব্রিগেড কমান্ডার তার অধীনস্থ নেপালিজ ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে পিটার করিম কে গ্রেপ্তার অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। লানা এলাকাটি নেপালিজ শান্তি রক্ষীদের দায়িত্বাধীন এলাকা। আদেশ অনুযায়ী কর্নেল ঝংকার লক্ষ্যবস্তুর গুরুত্ব বুঝে তার সদর দপ্তর মাহাগী থেকে একটি কোম্পানী ফাতাকি এবং কোয়ান্ডোরোমা থেকে যথাক্রমে অপর দুটি কোম্পানীকে লানার কলিবায় ২৭ মে’র দিন গতরাত তথা ২৮ মে’র ভোরে ষাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে পিটার করিমকে গ্রেফতারের নির্দেশ প্রদান করেন। নেপালিজ ব্যাটালিয়নের সৈন্যরা যখন রাতের আঁধারে গভীর অরণ্যের পথ পাড়ি দিয়ে ভোর রাতের দিকে লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছে তখন অতর্কিতে তারা লেন্দু গেরিলাদের প্রচণ্ড প্রতি আক্রমণের মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। লেন্দুদের হাত থেকে নেপালিজ সৈন্যদের নিরাপদ পশ্চাদপসারণ এ সাহায্যার্থে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় হেলিকপ্টার গানশীপ প্রেরণ করা হয়। হেলিকপ্টার গানশীপের প্রচণ্ড গোলা বর্ষণের এক পর্যায়ে লেন্দুরা তিনজন নেপালিজ সৈন্যের লাশ ফেলে রেখে সাতজনকে জীবিত ধরে নিয়ে যায়।
এ ঘটনা শুধু কঙ্গোর শান্তিরক্ষা মিশনের ১৮০০০ সৈন্যের মধ্যে কালো মেঘের গভীর রেখাপাতই করেনি বরং জাতিসংঘের সমগ্র শান্তিরক্ষা মিশনকেও বিপর্যস্ত করে তোলে।
২৮ মে প্রত্যুষে আমি নেপালিজ শান্তি রক্ষীদের এই বিপর্যয়ের খরর শুনে স্তম্বিত হয়ে পড়ি। পরমুহূর্তে এক অজানা আশঙ্কার প্রেতাত্মা আমাকে প্রবলভাবে আশঙ্কিত করে। লেন্দুরাত মানুষ খেকো। ওদের প্রচলিত বিশ্বাস শত্রুকে খেতে পারলে তার বাকী বয়স এবং শক্তি খেকোদের শরীরে প্রবিষ্ট হবে। এই ধারণায় যদি ঐ সাতজন নেপালীজকে লেন্দুরা খেয়ে ফেলে!
আমার মানস পটে কেন জানি বার বার আমার অবুজ সন্তানদের ছবি ভাসতে থাকে। ৩০ মে আমার বড় মেয়ের জন্ম দিন। অবচেতনে আমি একজন অপহৃত নেপালিজ হয়ে যাই। আমার আদরের সন্তান – তার জন্মদিনে যদি জানে তার বাবা লেন্দুদের হাতে পড়ে আছে কি নাই হয়ে গেছে, তবে তার কী অবস্থা হত! আমার স্ত্রী আত্মীয় পরিজন সবারই বা কী অবস্থা হত!
বাস্তবে ফিরে আমি সোজা ইথুরিতে আমার অফিসের পাশেই জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধি চার্লস গোমেজের অফিসে যাই। ঘটনার পূর্বাপর আলোচনান্তে আমি চালর্স গোমেজকে লেন্দুদের হাতে বন্দী সাত নেপালিজকে মুক্ত করতে আমার সংকল্পের কথা ব্যক্ত করি।
তিনি বার বার এ কাজে বিপদ এবং এমনকি জীবনের ঝুঁকি সম্বন্ধে সতর্ক করে প্রকারান্তরে এ কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকার জন্য আমাকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেন। আমি সবিনয়ে তাকে জানাই ইনসার্জেন্ট তথা গেরিলাদের সাথে আলাপ আলোচনা এবং প্রয়োজনে তাদের সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার ইতিপূর্বের সামরিক জীবনে রয়েছে।
উল্লেখ্য আমি ১৯৯৭ সালে আমাদের পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদনে ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টিলিজেন্ট হেড কোয়ার্টারস থেকে চীফ সিকিউরিটি নেগোশিয়েটিং অফিসার হিসাবে এবং দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিযুক্তির কারণে শান্তি বাহিনীর সাথে ব্যাপক যোগাযোগ–আলোচনা সূত্রে ইনসার্জেন্টদের মনোজগত সম্বন্ধে সম্যক অবহিত ছিলাম।
সব শুনে অবশেষে সদা হাসিমুখ গোমেজ সমস্ত মুখাবয়বে একটা শঙ্কার ছায়া নিয়ে আমাকে এগিয়ে যাওয়ার সম্মতি প্রদান করেন। চালর্স গোমেজ প্রায় আট বছর জাতিসংঘে সিয়েরা লিওনের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন এবং কিছুদিন সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। আমার চার বছরের কূটনৈতিক মিশনে দায়িত্ব পালনের কারণে হয়ত বা তার একটা স্নেহ দৃষ্টি আমার প্রতি বরাবরই ছিল। এ কারণেই হয়ত তিনি আমাকে অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ এই মিশনে দুঃসাহসিক পদক্ষেপ গ্রহণে নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা করেছিলেন। আমার অন্তর্নিহিত অনুর্ভুতির তাড়না আমাকে মানুষ খেকো দুর্ধর্ষ লেন্দু গেরিলাদের হাত থেকে সাত অসহায় শান্তিরক্ষী নেপালিজকে উদ্ধার অভিযানে ঠেলে নিয়ে যায়।
২৯ মে ২০০৬ সকাল বেলা বিশেষ হেলিকপ্টার আমাকে নিয়ে গহীন অরণ্যে ঢাকা কোয়ান্ডোরামার উদ্দেশ্যে আকাশে উড়ে। হেলিকপ্টারে আমার সঙ্গী চার্লজ গোমেজ। হেলিকপ্টারের চালক বাংলাদেশী উইং কমান্ডার সাইফুল এবং অন্যজন ফ্লাইট লেফটেনেন্ট। দেড় ঘণ্টার উড়াল সময়। নিচে গহীন গভীর অরণ্য। মাঝে মাঝে অজানা ভয়, শঙ্কা আমাকে ভর করেছে। কী জানি কী হয়। সত্যিই কি আমি বর্বর অচেনা হিংস্র লেন্দুদের হাত থেকে নেপালীজদের মুক্ত করে আনতে পারব? না কি নিজের জীবন নিয়ে জুয়া খেলতে চলেছি? উড়ন্ত হেলিকপ্টারের জানালায় উঁকি দিয়ে উপরে নীলাকাশ আর নিচে অরণ্যের পানে চেয়ে চেয়ে এ ভাবনাও আমাকে পেয়ে বসে। এক সময় কোয়ান্ডোরামায় হেলিকপ্টার নেমে পড়ে। কয়েকজন নেপালিজ অফিসার আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে আসে হেলিপ্যাডে।
চালর্জ গোমেজ আমার নিরাপত্তায় আর সফলতায় তার সমস্ত অন্তরস্নাত শুভাশীষ কামনা করে হেলিকপ্টারে ফিরে যান। আমি নেপালিজ অফিসারদের সাথে কিছু দূর যাওয়ার পর বিধ্বস্ত– বিপন্ন, বিষণ্ন নেপালিজ সৈন্যদের মাঝে হাজির হই। কর্ণেল ঝংকার – নেপালিজ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কিছুটা ভাবাবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন। আমি উনাকে আশ্বস্ত করি অসম্ভবকে সম্ভব করার। এরপর শুরু হয় সাত নেপালিজকে মুক্ত করার আমার দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ দিনের আরণ্যক জীবন। (চলবে)
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












