রোল নাম্বার সাত : পিতৃস্নেহমাখা মেঘমেদুর জীবনের প্রতিচ্ছবি

আবুল কালাম বেলাল | রবিবার , ১৪ জুন, ২০২৬ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

ছোটদের জন্যে ছড়াকবিতাগল্পউপন্যাস রচনা করা একটি দুরূহ ব্যাপার। এদের জন্য বই লিখতে হলে নিজেকেও শিশু হতে হয়। শিশুদের মন বুঝতে হয়। শিশুদের মনের জগৎ অদ্ভুত। উদ্ভট সব কল্পনা করে এরা। এদের কল্পনার সাথে পাল্লা দেওয়া সহজ কাজ নয়। যারা শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝেন, সাহসী তারাই কলম ধরেন। বই লেখেন ছোটদের জন্যে। তেমনি এক সাহসী ও মেধাবী লেখক কাসেম আলী রানা। যিনি একাধারে কবি। ছড়াকার। গল্পকার। ঔপন্যাসিক। নাট্যকার। গীতিকার এবং ‘ছড়াশৈলী’ পত্রিকা সম্পাদনার সুবাধে সম্পাদক। তবে তাঁকে আমি গদ্যশিল্পী হিসেবে দেখতে চাই। কেন? তিনি ছন্দোবদ্ধ রচনার চেয়ে গদ্য রচনায় অধিক পারঙ্গম। তাঁর গদ্য লেখার হাত অনন্য। ইতিমধ্যে তার পরিচয় এবং প্রমাণ আমরা পেয়েছি। তিনি ২৪টির বেশি গ্রন্থের জনক। এর মধ্যে তঁাঁর পাঁচটি উপন্যাস বেরিয়েছে। তাঁর ‘কাজল পাখি’ উপন্যাসটি স্বকাল শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছে। এটি অসম্ভব ভাল একটি উপন্যাস।

আলোচ্য কাসেম আলী রানার ছয় নাম্বার উপন্যাস ‘রোল নাম্বার সাত’। এর প্রধান চরিত্র মো. কায়সার আলী রাজ তাঁর সন্তানের নামও। তাকে নিয়েই উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহ শুরু। এই রোল নাম্বার সাতধারী রাজের আগের ক্লাসে রোল নাম্বার ছিল আঠার। অস্টম শ্রেণিতে তার রোল নাম্বার নয়। তাহলে অষ্টম শ্রেণিতে আবার তার রোল নাম্বার কীভাবে সাত হল? উত্তরটা বই থেকেই জানা যাক:

হারুণ স্যার গলা পরিষ্কার করে বললেন, : আজ থেকে তোমার রোল নাম্বার সাত। রাজ অবাক হয়ে বলল, : কী বলছেন স্যার? কীভাবে? শোনো বাবা, কম্পিউটারে নাম্বার হিসাব করতে একটু ভুল হয়েছিল। ইতিমধ্যে আমরা সেটা ঠিক করেছি। আমাদের সিনিয়র শিক্ষকরা মিলে মিটিং করেছে। তোমার পরীক্ষার খাতাসমূহ রিচেক করা হয়েছে। সব কিছু যাচাই বাছাই করে এখন ফাইনাল হল। আজ থেকে তোমার রোল নাম্বার সাত।’

এ ঘটনা থেকে আমাদের মনে পড়ে যায় এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বের হওয়ার পর বোর্ড থেকে দেওয়া হয় ফলাফল সংশোধনের নোটিশ। দেখা যায়, আবেদন করার প্রেক্ষিতে কত ফেল করা শিক্ষার্থী এ+ পেয়ে পাশ করেছে। এগজামিনারদের এসব ভুলভ্রান্তির রূপক ঘটনাই কী রোল নাম্বার সাত! হয়তো বা।

উপন্যাসের মূল চরিত্র রাজের সমার্থক চরিত্র তপন কুমার গৌড়। আর ডুপ্লিকেট চরিত্র রতন কুমার গৌড়। বৈশ্বিক মহামারী করোনা আক্রান্ত হয়ে যে মারা যায়। পুত্র (রতনের) শোকে অল্পদিনে মারা যায় তার মা। সব হারিয়ে পাগলপ্রায় তপন কুমার গৌড় যখন দিগ্বিদিক ঘুরছিলেন, তার এক বন্ধুর পরামর্শে জীবনের ঘানি টানতে হাতে তুলে নেয় রিকশা। রিকশা চালাতে গিয়েই দর্শন পায় রতনরূপী রাজের মুখ। দেখামাত্রই ছেলের জন্যে পিতার অপত্য স্নেহ উথলে ওঠে। এর পরের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এগিয়ে যায়। শেষ দিকে তপন কুমার গৌড় ব্যাকুল হয়ে ওঠে রাজের মুখ থেকে বাবা ডাক শোনার। রাজ যেই না ‘বাবা বাবা’ বলে ডাকে অমনি তপন কুমার গৌড়ের জীবনাবসান হয়। একই সাথে উপন্যাসের শেষ পরিণতিও ঘটে। তপন কুমার গৌড়ের জীবনের সাথে উপন্যাসের কী চমৎকার সমাপ্তি। উপন্যাসের সারসংক্ষেপ এইই। কিন্তু তার ভেতরে লেখক ছোট ছোট অনেক ইমেজ কায়দা করে চরিত্রের মধ্য দিয়ে বিম্বিত করেছেন। যা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ছোট ছোট সংলাপ আর যৌক্তিক বর্ণনায় ঠাসা এ উপন্যাস। বাস্তবতার নিরীখে সংলাপগুলো কী অভিনব, কী যৌক্তিক। এক পর্যায়ে সংলাপে উঠে আসে ধর্মের বিষয়টাও। তপন কুমার গৌড়ের সাথে রাজের সংলাপ :

আপনার নাম যেন কি বললেন? : তপন কুমার গৌড়। : আপনি হিন্দু? : জ্বি সাহেব। : আমরা মুসলমান। : তাতে কী? আমরা সবাই মানুষ। : এটা ঠিক বলেছেন। : আমাদের ক্লাস টিচার হারুণ স্যার বলেন, ধর্ম কোন বড় কথা নয়। বড় কথা হল আমরা সবাই মানুষ। সবার উপরে মানুষ সত্য।” এ দুই প্রসঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে অসাম্প্রদায়িকতার চিত্র। দুই সম্প্রদায়ের দুজনকে কেন্দ্র করে নির্মিত এ উপন্যাস লেখকের বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা বৈকি! তাঁর মুন্সিয়ানা এখানেইপিতার চরিত্রে একজন হিন্দুকে প্রতিভাত করেছেন। এসব সংলাপের পাশাপাশি প্রতিটি ইমেজে লেখকের টু দ্য পয়েন্ট বর্ণনাও রয়েছে।

তপন কুমার কবির সাহেব আর রাজের মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় নেমে গেল। ফুটপাত ধরে উল্টো পথে হাঁটতে লাগল। ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ফর্সা হয়ে গেছে। তপন কুমার কোথায় যাবে। কার কাছে যাবে? পথের তো শেষ নেই।” এখানে শেষ করতে পারতেন বর্ণনা। কিন্তু লেখক তা না করে পাঠকের মনে অন্য এক ভাবনার প্রক্ষেপণ ছড়িয়েছেন। কীভাবে?

কত দিকে কত পথ চলে যায়। যার ইচ্ছে যেদিকে, সেদিকে যায়। কিন্তু শেষ যাত্রায় পথ একটাই। সে পথ ধরে সবাই যায়। আর ফিরে আসে না।” এ দর্শনটাই শেষ পর্যন্ত উপন্যাসের সমাপ্তিতে বলিষ্ঠ চরিত্র তপন কুমার গৌড়ের জীবনে ফলেছে।

এভাবেই লেখক যথার্থ শব্দচয়ন, ছোট ছোট বাক্যগঠন, যুক্তিযুক্ত সংলাপ আর বহুবিধ ইমেজ চিত্রণে নির্মাণ করেছেন রোল নাম্বার সাত। নেই দীর্ঘ বাক্যের রেলগাড়ি, অতিকথনের কচকচানি। কাহিনির ধারাবাহিকতায় আছে টান টান একটা ব্যাপার। মোটা দাগে বললে এ উপন্যাস পিতৃস্নেহমাখা মেঘমেদুর জীবনের প্রতিচ্ছবি। কাহিনির পরতে পরতে প্রাসঙ্গিকভাবে চিত্রিত করেছেন ধর্মজাতের উর্ধে ওঠা ছেলের প্রতি পিতার অপত্য স্নেহ, বাবা ডাক শোনার হাহাকার, অসাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞানের রহস্যময়তা, ধর্মের আবহ আর ক্লোন বাস্তবতা, মায়ের যৌক্তিক উদ্বেগ আর সন্দেহ প্রবণতা, বাবার কর্তব্যপরায়ণতা, কম্পিউটারের অজুহাতে শিক্ষকদের ভ্রান্তি, সর্বোপরি মানবতা প্রভৃতি।

উপন্যাসটি পড়া শুরু করলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়তে চায় না মন। এমনই আকর্ষণীয় মজার। এধরনের বই শিশুকিশোরদের মন ছুঁয়ে যাবে, মুগ্ধ আর আবিষ্ঠ করবে হলফ করে বলাই যায়। তাদের মনোরঞ্জনে, শিক্ষায়, বুদ্ধির ধার শাণিত করতে এ রকম উপন্যাস উপাদেয়। উপন্যাসের ভাষা প্রাঞ্জল ও ঝরঝরে। ছাপাও ঝকমকে। শিল্পী মোমিন উদ্দীন খালেদের দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ আর নাটু বিকাশ বড়ুয়ার অলংকরণ বইটির সৌকর্য বৃদ্ধি করেছে। সুন্দর বোর্ড বাঁধাই বইটিকে করেছে অভিজাততুল্য। বইটির দাম মাত্র ২৬০ টাকা। আইকোর মুদ্রণে শৈলী প্রকাশন বইটি প্রকাশ করেছে। আমরা বইটির বহুল প্রচার প্রসার কামনা করি। একই সাথে লেখকের কাছ থেকে এমন চমৎকার উপন্যাস আরও প্রত্যাশা করি।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও গণমাধ্যমকর্মী

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ