যিনি রাজা তিনিই প্রজা

রেজাউল করিম | বুধবার , ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ

রাষ্ট্র গঠনের মূল চার উপাদান হচ্ছে –জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূ–খণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব। এই চারটি উপাদান ব্যতিত রাষ্ট্র গঠন হতে পারে না। জনসমষ্টির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু যে দেশে একজন মাত্র বাসিন্দা সেটিকেও রাষ্ট্র বলা হচ্ছে। আবার ওই রাষ্ট্রের নিজস্ব পতাকা, সংবিধান, মুদ্রা, পাসপোর্ট, ডাকটিকেট–এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র সবই রয়েছে।

রাষ্ট্রটি সমুদ্রের মাঝে ছোট্ট এক দুর্গ। সত্যিই কি সিল্যান্ড একটি দেশ –এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সিল্যান্ড নিজেকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে দাবি করলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশ নয়। জাতিসংঘের সদস্যও নয় এবং বিশ্বের কোনো রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সিল্যান্ডকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রচলিত সংজ্ঞায় একে স্বাধীন রাষ্ট্রের বদলে স্বঘোষিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসত্তা বললে ভুল হবে না।

সিল্যান্ডের আয়তন এতটাই কম যে তুলনা করা হয় প্রায় দু’টি টেনিস কোর্টের সঙ্গে। একসময় যেখানে ২৭ জন বাসিন্দা ছিল, তবে বর্তমানে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকেন মাত্র একজন। সিল্যান্ড ইংল্যান্ডের উপকূল থেকে প্রায় সাত মাইল দূরে উত্তর সাগরের একটি পুরোনো সমুদ্র দুর্গের ওপর অবস্থিত। জায়গাটি দেখতে অনেকটা সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ধাতব কাঠামোর মতো। তবে এটি কোনো দ্বীপ বা প্রাকৃতিক ভূখণ্ড নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী এই দুর্গ তৈরি করেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বিমান হামলা ও সমুদ্রপথে আক্রমণ ঠেকাতে ব্রিটেন উত্তর সাগরে বেশ কয়েকটি সামুদ্রিক দুর্গ তৈরি করে। তারই একটি ছিল রাফস টাওয়ার। যুদ্ধের সময় এখানে শতাধিক নৌসেনা অবস্থান করতেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দুর্গটির সামরিক প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। ১৯৫০–এর দশকে ব্রিটিশ বাহিনী সেটি ছেড়ে দেয়। দীর্ঘদিন সমুদ্রের মধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল কাঠামোটি। পরে সেটিই হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত ‘দেশ’–এর কেন্দ্র।

১৯৬৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ নাগরিক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর প্যাডি রয় বেটস রাফস টাওয়ার দখল করেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি পাইরেট রেডিও স্টেশন চালানো। কিন্তু পরে তিনি আরও বড় সিদ্ধান্ত নেন। রয় বেটস ঘোষণা করেন, এই দুর্গ আর ব্রিটেনের অংশ নয়। তিনি এর নাম দেন প্রিন্সিপালিটি অব সিল্যান্ড এবং নিজেকে এর শাসক ঘোষণা করেন।

সিল্যান্ডের জনসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংখ্যা প্রচলিত হয়েছে। পুরনো কিছু তথ্যসূত্রে একসময় সেখানে ২৭ জন বাসিন্দা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই সংখ্যা থেকেই সিল্যান্ডকে ‘২৭ জনের দেশ’ হিসেবেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। সিল্যান্ডে স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র একজন। অর্থাৎ একসময় ২৭ জনের কথা বলা হলেও এখন নিয়মিতভাবে সেখানে বসবাস করেন একজনই। একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে সিল্যান্ডের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজও করতে দেখা গেছে।

বেটস পরিবার বংশানুক্রমিকভাবে সিল্যান্ডের রাজপরিবারের ভূমিকা পালন করে আসছে। রয় বেটসের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাইকেল বেটস শাসনভার গ্রহণ করেন। সিল্যান্ডের সরকারি ওয়েবসাইটেও নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং সেখানে পতাকা, সংবিধান, মুদ্রা, পাসপোর্ট ও রাজপরিবারসহ একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে।

১৯৬৮ সালে সিল্যান্ডের কাছাকাছি একটি ঘটনায় ব্রিটিশ আদালত দুর্গটির ওপর নিজেদের এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেনি। সিল্যান্ডের সমর্থকেরা ঘটনাটিকে তাদের দাবির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তবে এটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ধরা হয় না।

সিল্যান্ডের ইতিহাসে ১৯৭৮ সালের ঘটনাটিও বেশ নাটকীয়। একদল জার্মান ও ডাচ ভাড়াটে যোদ্ধা দুর্গটি দখল করে নেয় এবং মাইকেল বেটসকে জিম্মি করে। পরে রয় বেটসের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে দুর্গটি পুনর্দখল করা হয়। অদ্ভুত ও আজব দেশ সিল্যান্ড।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদুরন্ত ছেলেবেলা
পরবর্তী নিবন্ধবোয়ালখালীর শ্রীপুরে বিনামূল্যে চক্ষু ও হেলথ ক্যাম্প