১.
গ্রামের নাম চৌধুরীপাড়া। আলাউদ্দিন চৌধুরী এই গ্রামে স্হায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি এই গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার বাড়ি হলো চৌধুরীপাড়া গ্রামের সবচেয়ে আলিশান বাড়ি। তবে এই বাড়ির মূল আকর্ষণ হলো, বাড়িতে প্রবেশের মুখে বিশাল আকৃতির একটা গেট। সেই গেটের দুই পাশে দুটো বড় বড় বরই গাছ। গাছ দুইটি একই রকম।
বরই গাছ দুটি একই মা গাছের সন্তান। চৌধুরী সাব নিজের হাতে গাছ দুটোর চারা লাগিয়েছেন। অনেক যত্ন আর ভালোবাসায় গাছ দুটো বড় করেছেন। গাছ দুটো এখন অনেক বড় হয়েছে। শীত মৌসুমে ফুলে ফলে ভরে যায়। গাছ দুটোতে নানা পাখি– পাখালির বসবাস। নানা ধরণের পোকা – মাকড়সা, প্রজাপতি আর মৌমাছির বসতবাড়ি।
২.
বরই গাছ দুটো আপন বোন। জন্ম থেকে পাশাপাশি বাস করছে। একটার সাথে একটার খুব ভাব। এরা প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে একটার ডাল আরেকটার ডালকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। শুভ সকাল বলে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানায়। প্রার্থণা করে । অনুনয়– বিনুনয় করে খোদার কাছে আরজি করে বলে, “হে আল্লাহ , আজ সূর্যটা উঠবে তো? আমরা আলো খেয়ে বাঁচতে চাই।”
এরপর ওদের লালন – পালনকারী চৌধুরী সাবের জন্য দোয়া করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ডাল দুলিয়ে দুলিয়ে প্রকৃতি থেকে ঠান্ডা বাতাস এনে দেয়। যাতে চৌধুরী সাব আসা যাওয়ার সময় শীতল পরশে মন শান্ত করতে পারে।
কখনো ওরা পাখি, প্রজাপতির আর ফুলের সাথে কথা বলে। আশেপাশের ছোট ছোট নানা জাতের গাছের সাথে কথা বলে। কুশল বিনিময় করে।
রাস্তার ওপাড়ে বিশাল একটা বট গাছ আছে। বট গাছ হলো বৃক্ষসমাজের রাজা।
দুই বোন রাজাকে সালাম জানায়। এভাবেই ওদের সকাল শুরু হয়।
৩.
বরই গাছ দুটির দুটি নাম আছে। ফুলপরি গুণবতী ওদের দুই বোনকে দুটি নাম দিয়েছিল। নাম রাখার দিন রীতিমত ফুল, ফল, মধু দিয়ে আকিকা করা হয়েছিল। বটরাজার জন্য প্রচুর পরিমানে ক্লোরােফিল, সূর্যের আলো, আর পাতালপুরীর মিষ্ট পানি পাঠানো হয়েছিল। এরপর থেকে বৃক্ষসমাজে সবাই ওদের নাম জানে। গেটের বাম পাশের গাছটার নাম মিনু । ডান পাশের গাছটার নাম বিনু। এত সুন্দর দুটো নাম পেয়ে ওরা খুব খুশি।
সেই থেকে ফুলপরির সঙ্গে ওদের খুব ভাব হয়। ফুলপরি রাত গভীরে ওদের কাছে আসে। মিনু বিনুর সাথে হৃদয় উজাড় করে গল্প করে। দুইজনকে মায়ের মত মায়া করে। ভালোবাসা দেয়। গুণবতী কখনও মিনুর ডালে বসে গল্প করে, আবার কখনও বিনুর ডালে বসে গল্প করে। তবে বেশির ভাগ সময় মিনুর ডালে বসে সময় কাটায়। গল্পে গল্পে রাত বেশী হয় গেলে গুণবতী মিনুর ডালে ঘুমিয়ে পড়ে। মিনুর ডালে বসতে ফুলপরির খুব ভালো লাগে।
এতে বিনু রাগ করে। ওর হিংসা হয়। অভিমান হয়। তার ধারণা জন্মে গেছে যে , ফুলপরি তাকে কম ভালোবাসে। তাকে সহ্য করতে পারে না। গুণবতী যত আদর, ভালোবাসা সব মিনুর জন্য। এটা বিনু কোনভাবে মেনে নিতে পারে না। সে ভাবে, আমি কি ওর চেয়ে কম আছি নাকি? বরং ওর চাইতে আমার রূপ বেশি। মিনুর চাইতে আমি অনেক সুন্দর।
এসব ভাবনায় বিনু মন হিংসায় ভরে উঠে। আশেপাশে বসবাসকারী ছোটদের সাথে খারাপ ব্যাবহার করে। ওর ডালে বাস করা পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছিদের কাঁটা ফুটিয়ে কষ্ট দেয়। সে রীতিমতো ভয়ংকর অহংকারী হয়ে উঠেছে।
৪.
শীতের মৌসুম। দুই গাছ ফুলে ফুলে ভরে গেল। ফল ধরল। ফল বড় হলো। দুই বোনের ডালে ডালে বড়ই পেকে টইটম্বুর হয়ে গেল।
পথচারী শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই গাছ থেকে পাকা বরই পাড়ে। কেউ ঢিল মারে, কেউ গাছে উঠে, কেউ টেটা দিয়ে পাড়ে। পকেটে , কোচায়, থলেতে ভরে নিয়ে যায়। মুখ ভরে ভরে খায় । তৃপ্তিতে চোখে মুখে আনন্দ ফুটে ওঠে । কী যে মিষ্ট িআর রসালো বরই। মানুষের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখে মিনুর বৃক্ষজীবন সার্থক মনে হয়।
কিন্তু বিনুর গাছের বড়ই কেউ খায় না। গাছ থেকে পাড়ে না। ঢিল ছুঁড়ে না। গাছে উঠে না। বড়ই মুখে দেয় না। এমন কি ওর দিকে ফিরেও তাকায় না। একসময় এরকম ছিল না। ওর বড়ই মানুষ খেতে চাইতো। গাছ থেকে পেড়ে নিয়ে মুখে দিতইে থু থু করে ফেলে দিত। কষ, তিতা, বিস্বাদ। এর পর থেকে বিনুর দিকে কেউ আর তাকায় না।
এদিকে মিনুর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলছে। তার ফলানো ফল মানুষ উৎসব করে খেয়ে ফেলে । মিনু আবার ফুল ফুটায়। আবার ফল ফলায়।
বিনুর খুব মন খারাপ করে দিনকাল যাপন করছে। রাগক্ষোভে সে আরও হিংসুটে হয়ে উঠে। ওর যত রাগ সব মিনুর উপর। ওকে মানুষ এত ভালোবাসে কেন? কি জাদু আছে ওর মধ্যে? ও আপন বোন হয়ে এমন শত্রুতা করতে পারলো? বিনু খুবই রাগে মাটির নিচ দিয়ে বড় শিকড় বাড়িয়ে মিনুর নরম শিকড়ে জোরে জোরে আঘাত করলো। মিনু ব্যথায় কেঁদে ফেলল। মিনু বুঝতে পারলো না ওর কি অপরাধ?
ওদের এইসব ঝগড়ার কথা পুরো বৃক্ষসমাজে ছড়িয়ে পড়লো। বটরাজা সব দেখল। সব শুনলো। মিনু আর বিনুকে রাজদরবারে ডাকল। বিচারে বটরাজা সব ঘটনা ওদের দুই বোনের কাছ থেকে শুনলো। তারপর বিনুকে বলল,
“তুমি বিনয়ী হও। সদয় হও । সমাজকে ভালোবাসো। অহংকার পরিহার করো। প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখ। তবেই তোমার পৃথিবী রঙিন হবে।”
বিনু অনুতাপে কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলে ভাসতে লাগলো। মিনু ডাল দিয়ে বিনুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলো।








