একটি শহরের ইতিহাস শুধু রাজা–বাদশা, যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে থাকে না। ইতিহাস থেকে যায় তার রাস্তার নামে, পুরোনো পাড়ায়, দিঘির পাড়ে, রেলস্টেশনে, আদালতে কিংবা শত বছরের একটি বাড়ির জানালা–দরজাতেও। দ্রুত বদলে যাওয়া চট্টগ্রামে সেই স্মৃতির অনেকটাই এখন বহুতল ভবন ও নতুন নগরায়ণের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এখনও শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কিছু পুরোনো স্থাপনা মনে করিয়ে দেয়–আজকের চট্টগ্রামের নিচে আরও একটি শহর আছে, যার বয়স কয়েক শতক।
পুরোনো চট্টগ্রামের পাথরঘাটা, সদরঘাট, আন্দরকিল্লা, চকবাজার কিংবা টাইগারপাসের দিকে তাকালে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে বোঝা যায়। ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক ভবন যেমন আছে, তেমনি আছে ব্যক্তিমালিকানাধীন পুরোনো বাড়ি, রেলওয়ে স্থাপনা এবং মোগল আমলের স্থাপত্য। সবগুলো একই সময়ের নয়, স্থাপত্যরীতিও এক নয়। কিন্তু এগুলো একত্রে চট্টগ্রামের নগরবিকাশের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
এর একটি বিস্ময়কর উদাহরণ পাথরঘাটার নাজু মিয়া লেনের একটি পুরোনো ভবন। ২০২১ সালে মালিকেরা ভবনটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিলে এর ভিত্তির নিচে শতাধিক মাটির পাত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ভবনটি পরিদর্শন করেন এবং এর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার ভবনটি সংরক্ষণের জন্য অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনটির নির্মাণে ব্যবহৃত কৌশল মোগল আমলের স্থাপত্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা এই স্থাপনাটি দেখিয়ে দেয়, আধুনিক শহরের সাধারণ একটি গলির মধ্যেও কত অজানা ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে।
সদরঘাটের পি কে সেন ভবন চট্টগ্রামের পুরোনো আবাসিক স্থাপত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ভবনটির পুরোনো নাম ‘প্রসন্ন কুমার ধাম’। সাততলা এই স্থাপনাকে শহরের প্রথম দিককার বহুতল ভবনগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর স্থাপত্যে উপমহাদেশীয় হিন্দু মন্দিরের অলংকরণ, ইসলামি স্থাপত্য এবং ইউরোপীয় গথিক রীতির প্রভাবের কথা স্থাপত্যবিষয়ক আলোচনায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ একটি বাড়ির শরীরেই যেন চট্টগ্রামের বহুসাংস্কৃতিক অতীতের কিছু চিহ্ন একসঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু পি কে সেন ভবনের গল্প শুধু স্থাপত্য সৌন্দর্যের নয়, সংরক্ষণ সংকটেরও। ভবনটির জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে বহু বছর ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। একদিকে মালিকপক্ষের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার, অন্যদিকে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি–দুইয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে জটিলতা। এই একটি ভবনের ঘটনাই আসলে বাংলাদেশের পুরোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন স্থাপনা সংরক্ষণের বৃহত্তর সমস্যাটিকে সামনে আনে। একটি বাড়ি ঐতিহ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেই তার রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ কে দেবে, মালিক কীভাবে সেটি ব্যবহার করবেন, সংরক্ষণের দায়িত্ব কার–এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।
ব্যক্তিগত বাড়ির বাইরে চট্টগ্রামের ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান নিদর্শনগুলোর একটি কোর্ট বিল্ডিং। পরীর পাহাড়ের ওপর ১৮৯২ থেকে ১৮৯৮ সালের মধ্যে নির্মিত ভবনটি ইন্দো–ব্রিটিশ স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এর নকশায় ইউরোপীয় ও মোগল–দুই ধারার উপাদান রয়েছে। গথিক খিলান, ইউরোপীয় পেডিমেন্টের পাশাপাশি পদ্মের নকশাসহ স্থানীয় অলংকরণের ব্যবহার ভবনটিকে স্বতন্ত্র চরিত্র দিয়েছে। পাহাড়ের ভূপ্রকৃতিকেও নির্মাণের পরিকল্পনার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে কোর্ট বিল্ডিং শুধু প্রশাসনিক স্থাপনা নয়, ঔপনিবেশিক চট্টগ্রামের নগর পরিকল্পনারও একটি দলিল।
একই সময়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বাটালি রেল স্টেশনের পুরোনো ভবন। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের এজেন্ট ও প্রধান প্রকৌশলী ১৮৯৬ সালের ৭ নভেম্বর এর দোতলা ভবনের নকশায় স্বাক্ষর করেছিলেন। নিচতলায় ছিল স্টেশনের কার্যক্রমের জায়গা, আর ওপরতলার কেন্দ্রীয় অংশে ছিল স্টেশনমাস্টারের বাসস্থান। খিলান, টারেট, কাপোলা ও অলংকৃত প্রবেশপথের কারণে ভবনটির আলাদা স্থাপত্যমূল্য রয়েছে। পরে একাধিকবার সংস্কার ও সমপ্রসারণ হলেও পুরোনো কাঠামোটি টিকে আছে এবং এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি ঐতিহাসিক ভবনকে সম্পূর্ণ জাদুঘরে পরিণত না করেও কীভাবে কার্যকর রাখা যায়, বাটালি স্টেশন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
আন্দরকিল্লার পুরোনো জেনারেল হাসপাতালও শহরের স্মৃতির আরেক স্তর খুলে দেয়। ১৮৪০ সালে একটি ডিসপেনসারি হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়; পরে রংমহল পাহাড়ে জেনারেল হাসপাতাল গড়ে ওঠে। জায়গাটির ইতিহাস আরও পুরোনো–এই পাহাড়েই আরাকানি দুর্গের অবস্থান ছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। হাসপাতালের ঔপনিবেশিক ভবনটির কেন্দ্রে ত্রিকোণাকৃতির টাওয়ার ও সর্পিল সিঁড়িসহ স্বতন্ত্র স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ছিল। অর্থাৎ একই জায়গায় আরাকানি শাসন, ঔপনিবেশিক চিকিৎসাব্যবস্থা এবং আধুনিক নগর–তিন সময়ের স্মৃতি এসে মিলেছে।
চট্টগ্রামের স্থাপত্য ইতিহাস অবশ্য ঔপনিবেশিক যুগে শুরু হয়নি। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ ১৬৬৭ সালে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার পর নির্মিত প্রথম দিককার স্থাপনার অন্যতম। চকবাজারের অলি খাঁ মসজিদ নির্মিত হয় আঠারো শতকের গোড়ায়। এসব স্থাপনা পরবর্তী সংস্কার ও সমপ্রসারণে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। তবু এগুলো দেখায়, বর্তমান শহরের রাস্তা ও মহল্লার বিন্যাসের নিচে মোগল চট্টগ্রামেরও একটি স্তর রয়ে গেছে।
সমস্যা হলো, পুরোনো ভবন টিকিয়ে রাখার প্রশ্নটি আমাদের সামনে প্রায়ই আসে তখন, যখন ভবনটি ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হয় কিংবা সেটি বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। তখন ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং জননিরাপত্তা মুখোমুখি দাঁড়ায়। অথচ একটি শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকা, নিয়মিত অবস্থা পর্যবেক্ষণ, মালিকদের জন্য সংরক্ষণে সহায়তা এবং নতুন নির্মাণের সঙ্গে পুরোনো স্থাপত্যকে সমন্বিত করার পরিকল্পনা আগে থেকেই থাকা প্রয়োজন।
আশার কথা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নতুন মহাপরিকল্পনায় শহর ও আশপাশের ৭৬টি ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ ও তুলে ধরার পরিকল্পনার কথা ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঐতিহ্যকে শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ভবন হিসেবে না দেখে নগরের সামগ্রিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একটি পুরোনো বাড়ি সংরক্ষণ মানে শুধু ইট, চুন–সুরকি বা কাঠের দরজা রক্ষা করা নয়। তার সঙ্গে রক্ষা পায় একটি সময়ের নির্মাণপ্রযুক্তি, জীবনযাপন, সামাজিক সম্পর্ক এবং শহরের স্মৃতি। চট্টগ্রাম যত দ্রুত আধুনিক হচ্ছে, এই স্মৃতিগুলোর গুরুত্ব ততই বাড়ছে। কারণ নতুন ভবন নির্মাণ করা যায়, নতুন রাস্তা তৈরি করা যায়; কিন্তু একবার হারিয়ে যাওয়া তিনশ বছরের একটি বাড়ি কিংবা শতবর্ষী স্থাপত্য আর নতুন করে নির্মাণ করা যায় না। তার অনুকৃতি বানানো সম্ভব, ইতিহাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।











