দুই কোটি টাকা এককালীন এবং মাসিক ১০ লাখ টাকা চাঁদার দাবি মেনে না নেওয়ায় সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের নির্দেশে চট্টগ্রামে ইন্টারনেট সেবার কোম্পানি ডিজিটাল ডটনেটে (ডিডিএন) হামলা হয়েছিল বলে জানিয়েছে র্যাব। শনিবার নগরী ও বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালকসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তারের পর র্যাব বলছে, চকবাজার, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট ও রাউজান উপজেলা থেকে লোকজন ভাড়া করে এনে এই হামলা চালানো হয়। জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হয়। র্যাবের হাতে গ্রেপ্তারদের মধ্যে রোহেন মিয়া হামলাকারীদের সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন ছিলেন বলে র্যাব নিশ্চিত হয়েছে।
র্যাব–৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার দুদিন আগে ডেভিড ইমন ডিডিএন মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। চাঁদা না পেয়ে ডেভিড ইমনের নির্দেশে এ হামলা ও লুটপাট চালানো হয়।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া মাইকেল, সানি ও রাজু নামে তিনজন বাকলিয়া, চকবাজার, বহদ্দারহাট, রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন সংগ্রহ করেছিলেন এই হামলার ঘটনা ঘটানোর জন্য। হামলাকারীরা প্রথমে বহদ্দারহাট এলাকায় জড়ো হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে অটোরিকশা নিয়ে বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় যায়।
তিনি বলেন, তাদের একটি দলকে এক্সেস রোডে রাখা হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নজর রাখার জন্য। একটি দল ডিডিএনে গিয়েছিল হামলা করতে। আর কয়েকজন ভবনের নিচে এবং আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের বেশে অবস্থান করেছিল।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ২০ জনের একটি দল ডিডিএন অফিসে প্রবেশ করে এবং ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে সিসিটিভি ভিডিও দেখে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি চারজনের মধ্যে তিনজনকে অন্যদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ধরা হয়।
মাইকেলকে আটকের পর তার মোবাইলে ঘটনার দিন সাড়ে ১০টার দিকে লোকজনকে সংগঠিত করে ব্রিফিং করার একটি ভিডিও ক্লিপস পায় র্যাব। যেখানে ব্রিফিং শুনে লোকগুলো উচ্ছ্বসিত হয়ে ভাঙচুর করতে যেতে দেখা যায়।
তিনি বলেন, ডেভিড ইমন ও রায়হান সামনে না এসে তাদের গ্রুপের অন্য কারো মাধ্যমে মাইকেল, সানি ও রাজুকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন লোকজন জড়ো করার জন্য। সে অনুযায়ী তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন জড়ো করেন এবং হামলায় অংশ নেওয়া প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়।
হামলাকারীদের আটজনের একটি দল অ্যাম্বুলেন্সে করে রাউজান থেকে চট্টগ্রামে এসেছিল বলে জানিয়েছেন চকবাজার থানার ওসি নূর হোসেন মামুন। তিনি বলেন, শনিবার রাতে রাউজানে অভিযান চালিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি জব্দ করার পাশাপাশি চালক মো. মহিউদ্দিনকে (৩১) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত সোমবার দুপুরে ডিডিএন অফিসে হামলা–ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কোম্পানির মালিক পক্ষ অভিযোগ করেন, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের অনুসারী বিদেশে পালিয়ে থাকা মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন এককালীন দুই কোটি টাকা এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মাহমুদের কাছে। সেই টাকা না দেওয়ার কারণেই হামলা হয়। বিষয়টি নিয়ে ইমনের সঙ্গে কোম্পানির মালিকের টেলিফোন আলাপের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে চকবাজার থানায় মামলা করেন ডিডিএনের এক কর্মকর্তা।
মামলায় বলা হয়, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সোমবার দুপুরে ডিডিএন অফিসে গিয়ে ভাঙচুর শুরু করে ৩০–৪০ জন সন্ত্রাসী। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, আসবাব, গ্লাস ভাঙচুর করে অন্তত ১৫ লাখ টাকা ক্ষতি করে তারা। তিনটি মোবাইল ফোন, ড্রয়ার থেকে নগদ ৪৭ হাজার এবং কোম্পানির পরিচালকের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকাভর্তি একটি ব্যাগও তারা নিয়ে যায়।
গ্রেপ্তার ৯ : ডিডিএন কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্সটি জব্দ করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে অ্যাম্বুলেন্সের চালককে। হামলার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে শনাক্ত করা আরো ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব–৭। তাদের কাছ থেকে হামলায় ব্যবহৃত চারটি দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ জনে।
গ্রেপ্তার অ্যাম্বুলেন্স চালক মো. মহিউদ্দিন রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের মৈশকরম এলাকার মৃত মো. শরিফের ছেলে। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন মো. তুহিন (২২), আকবর হোসেন (৩৮), আব্দুল মুমিন (৩০), রোহেন মিয়া ওরফে মাইকেল (৩১), মাসাদ মিয়া (২৭), দিদার মিয়া (২২), সানজাত হাসান (১৮), সৈরত হোসেন (১৮), সাইফুদ্দিন (৩২)
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে হামলার সময় ব্যবহৃত চারটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
এ ঘটনায় ইতোপূর্বে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই নিয়ে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়াল ২২ জনে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে অনেকের নামে মামলা আছে। শনিবার যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাবও আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। ভিডিও ফুটেজে চিহ্নিত সকল সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হবে।











