দেশব্যাপী প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক সরকার। এরই অংশ হিসেবে দেশের সব হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোকে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সমপ্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে। এর পরে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আসে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা খালি করতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্ল্যাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। তবে ঢামেক কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শয্যা সংখ্যা আরো বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কুর্মিটোলা মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতালকে রাজধানীর বাইরে থেকে আসা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এক দিনে এটাই সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এ নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে মোট ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে এক হাজার ৯৯৬ জন গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৯০ হাজার ৩৫৬ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের মাসে অর্থাৎ আগস্টে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছিল ৪৩ জনের।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে দেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ দেখা দিলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের রোগতত্ত্ববিদ ড. কে কৃষ্ণমূর্তিকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে ওই রোগতত্ত্ববিদ ২২ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা দলিল তৈরি করে দিয়ে যান। ‘মিড–টার্ম প্ল্যান ফর কন্ট্রোলিং অ্যান্ড প্রিভেন্টিং এডিস–বর্ন ডেঙ্গু অ্যান্ড চিকুনগুনিয়া ইন বাংলাদেশ (বাংলাদেশে এডিসবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা)’ শীর্ষক এই পরিকল্পনায় দুটি উদ্দেশ্যের কথা বলা ছিল। প্রথমত, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের হার কমানো। দ্বিতীয়ত, ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানো। ওই দলিলে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা ছিল: ১. ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ণয় এবং রোগপ্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি মূল্যায়ন। ২. রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য–শিক্ষা–যোগাযোগবিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে ‘র্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠন করা জরুরি। ৩. ১২টি মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ২০১৯ সালের মধ্যে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু তখনকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ওই দলিল খুলেই দেখেননি। ২০১৯ সালে দেশে বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায়। ওই বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপালকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল সরকারকে এডিস মশা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। ওই কীটতত্ত্ববিদ একাধিক মন্ত্রণালয়ে ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে এডিস মশার চরিত্র এবং কীভাবে এই মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তা নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন ও পরামর্শ দেন।
নাগপাল বলেছিলেন, এডিস মশা ডিম পাড়ার পর এক বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। কোনো পাত্রে ডিম থাকলে এক বছরের মাথায় পানির স্পর্শ পেলে ডিম থেকে আবার মশা হয়। এডিস মশা কখনোই নর্দমায় ডিম পাড়ে না। তারা ছোট ছোট পানির আধারে ডিম পাড়তে পছন্দ করে। নাগপাল একাধিক অনুষ্ঠানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মীদের দিয়ে এডিস মশা কমানো সম্ভব না। কর্মীরা সব মানুষের বাড়ির মধ্যে ঢোকার অনুমতি পাবেন না। অথচ এই মশা বিশ্রাম নেয় টেবিল–চেয়ার–সোফা–বিছানার নিচে, পর্দা–আলমারির পেছনে–অর্থাৎ যেখানে অন্ধকার থাকে। এই মশা হাইড্রোফিলিক, এই মশা আর্দ্রতা পছন্দ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলার সময়ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। অভিযান শেষ হলেও ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। তাই ডেঙ্গুর বিষয়ে সচেতনতা ও সতর্কতা খুবই জরুরি।






