টোকাই বাসায় বাসায় এবং দোকানে পানি বিক্রি করে। সামনে চালা কলোনীতে থাকে।
পানির ভার কাঁধে নিয়ে রাস্তায় হাটছে টোকাই। এমন সময় দুজন মাস্তান গাড়ি থামিয়ে তার কাছ থেকে বোতল নিয়ে পানি খেয়ে টাকা না দিয়ে চলে যেতেই সে বলে, স্যার –স্যার পানির টাকা দিয়ে যান।
মাস্তানগুলো তাকে বলে, কিসের টাকা? আমাদের চিনিস? আমরা এই এলাকার বড় ভাই। আমরা টাকা দিই না। টাকা নিই। কান্না করে দেয় টোকাই।
ও স্যার, আমি গরিব মানুষ, আমার পেটে লাথি মাইরেন না। সারাদিন না খেয়ে আছি। আমার টাকার খুব দরকার। ঝড়ে ভিজি,রোদে পুড়ি দু’মুঠো ভাতের জন্য কত কষ্ট করি। সেটা আপনি বুঝবেন না। আমার টাকা দেন..!
মাস্তানগুলো টোকাইকে থাপ্পড় দেয়ার সময় পান চিবিয়ে চিবিয়ে বাবর সাহেব আসলেন। তিনি বুঝতে পেরে বলছেন, অকারণে ঝামেলা করছেন কেন? সে তো অতিরিক্ত টাকা পয়সা চায়নি। পানি খাবেন, অথচ টাকা দিবেন না।
বাচ্চা ছেলের সাথে এমন আচারণ করতে লজ্জা লাগে না। সমাজ আপনাদের শিখাতে পারে নাই মানবতা। বাবর সাহেব অনেক বকাবকি করে তাদের থেকে টাকা নিয়ে টোকাইকে দিলো। টোকাইকে দেখে বাবর সাহেবের মায়া হল,আবার কাছেও টেনে বলে, তুমি কে? আমি টোকাই।
– তোমার ভালো নাম নেই?
– আছে স্যার, জীবনের সাথে নামটাও বদলে গেছে।
–তোমার ভালো নাম কী? মা ‘শখ করে নাম রাখছিলেন প্রদীপ, যাতে অন্যদের জীবনে আলো ছড়াতে পারি। নামটার সাথে আমার কোন মিল নেই। জানি না তো কোথায় আলো সবটা অন্ধকার। স্যার, আপনার মত ভালা মানুষ হয় না। আপনার জন্য আজ টাকাটা পেলাম।
– বাবর সাহেব– তুমি লেখাপড়া না করে পানি বিক্রি করছো ক্যান.?
স্যা– কী করুম কন,
মা ‘ খুব অসুস্থ হাসপাতালে জীবনের সাথে যুদ্ধ করছে। হাত পা অচল। স্যার,আমার গল্পজুড়ে শুধু মা ।
– বাবর সাহেব চিন্তিত স্বরে বলে– বাড়ি কই?
–স্যার, আমার বাড়ি নেই। বাড়ি হারিয়ে সামনে চালা কলোনীতে গাছের নিচে রাত কেটে যায় বেশ।
বাবর সাহেব– হায়রে জীবন! সব কথা শুনে টোকাইয়ের কাঁধে হাত রাখেন, আরে তুমি তো, সত্যিইকারের প্রদীপ। তোমাকে দেখে তো আমি গর্ববোধ করছি। এটুকু ছেলে মায়ের জন্য যা করছো। এই সমাজে ভদ্রলোকর তা করে না।
আমার আলিশান ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি সব আছে। কিন্তু আমার মা নেই। তোমার কাছে তো মা আছে। প্রদীপ তুমি বড় সম্পদের মালিক।
তুমি ছোট হলেও তোমার বড় একটা মন আছে। তোমার মত সবার মন থাকলে গ্রাম,শহর গরীব থাকতো না।
– বাবর সাহেবের মুখে প্রদীপ নামটা শুনে টোকাই চমকে গেল। মুখে অতুল সুখ। স্যার, মা’ছাড়া এই নামে আমাকে কেউ ডাকেনি। আদর সোহাগ ভালোবাসা আমার ভাগ্যে নেই।
–বাবর সাহেব, প্রদীপ এভাবে বলে না। পরাজয়ের জন্য মানুষের জন্ম হয় না। আমি তো তোমাকে একটু সাহায্য করতে পারি।
আমার তো মা নেই, তোমার মায়ের আর তোমার দায়িত্ব আমি নেবো । তুমি আবার ইশকুলে যাবে হাসবে , খেলবে। হঠাৎ স্বপ্নের মত আঁতকে ওঠে টোকাইর আহত ছোট্ট বুকটা থিরথির করে কাঁপছে। বাবর সাহেবের মুখের সম্মুখে প্রার্থনার স্বরে, প্রদীপ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।







